প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রাজশাহীতে ৩৯.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস

ডেস্ক রিপোর্ট : সারাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তাপ প্রবাহ। বাড়তে শুরু করেছে তাপমাত্রা। অসহ্য গরমে নাভিশ্বাস উঠছে দেশের সাধারণ মানুষের। আজ রবিবার (২৮ এপ্রিল) বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে রাজশাহীতে। উত্তরাঞ্চলের এ শহরে আজ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল যশোরে ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিকে বঙ্গোসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ফনি’ খানিকটা উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার পর এখন একই এলাকায় অবস্থান করছে। এখনও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৬৯২ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করায় এটি ভারত নাকি বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসবে নাকি সাগরেই দুর্বল হয়ে যাবে তা নিশ্চিত করতে পারেননি আবহাওয়াবিদরা। বাংলা ট্রিবিউন ।

এদিকে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ফনি‘ যদি বাংলাদেশের উপকূলের দিকে অগ্রসর হয় তাহলে বৃষ্টি হতে পারে। সেক্ষেত্রে কমে যেতে পারে তাপমাত্রা।

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, তাপমাত্রা নানা কারণে বেড়ে যেতে পারে। গতকাল রাজশাহীতে তাপমাত্রা কিন্তু কম ছিল। আজ হঠাৎ বেড়ে গেছে চার/পাঁচ ডিগ্রি। আগে থেকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পূর্বাভাস বলা কঠিন। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারাবিশ্বের জন্যেই প্রযোজ্য। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, রাজশাহী ও রংপুরের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়, অথচ আজ ‍দুই অঞ্চলের মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আজ অন্যান্য বিভাগের মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৭, চট্টগ্রামে ৩৪, সিলেট ৩১ দশমিক ৮, রংপুরে ২৯ দশমিক ৯, খুলনায় ৩৭ দশমিক ২ এবং বরিশালে ৩৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়, এপ্রিল-মে মাসে এক থেকে দুইটা নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এরমধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এ মাসেই উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত ২ থেকে ৩টি মাঝারি বা তীব্র বজ্রঝড় বা কালবৈশাখী ও দেশের অন্য এলাকায় ৫ থেকে ৬টি হালকা বা মাঝারি ধরনের বজ্রঝড় বা কালবৈশাখী হতে পারে। এছাড়া উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি তীব্র তাপপ্রবাহ (প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং অন্য এলাকায় এক থেকে দুটি মৃদু ( ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) অথবা মাঝারি (৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।

রাজশাহীতে বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস

রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, এবছর এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা আজ রেকর্ড হয়েছে রাজশাহীতে। রবিবার (২৮ এপ্রিল) এখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৩৯.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সকালে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৫ শতাংশ ও সন্ধ্যায় ৬টায় ছিল ৫৩ শতাংশ।

রবিবার রাত সাড়ে ৮টায় রাজশাহীর আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক দেবল কুমার মৈত্র এ তথ্য নিশ্চিত করে আরও জানান, ২৭ এপ্রিল তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল সর্বোচ্চ ৩৫.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২৬ এপ্রিল সর্বোচ্চ ৩৬.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ২৫.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর ২৫ এপ্রিল রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

রাজশাহী আবহাওয়া অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, রাজশাহী অঞ্চলের ওপর দিয়ে গত কয়েকদিন মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছিল। আজ (রবিবার) তা মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহে রূপ নিয়েছে।

এদিকে বৈশাখ মাস শুরু হওয়ার পর পর থেকেই রাজশাহী জেলার প্রকৃতি রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। প্রখর রৌদ্রতপ্ত আবহাওয়ায় নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষদের। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাপমাত্রা কমছে না। সঙ্গে বইছে লু হাওয়া। আগুন ঝরানো তাপমাত্রায় প্রকৃতিও হয়ে উঠেছে আগুন গরম। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। সবমিলিয়ে ভ্যাপসা গরমে ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে রাজশাহীর প্রাণ ও প্রকৃতি। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তি আবহাওয়ায় শরীরের চামড়া পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রখর রৌদ্রে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। গ্রাম ও শহরের শ্রমজীবী মানুষরাই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। এদিকে, গরমের কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চাপ পড়ায় প্রায়ই ঘটছে লোডশেডিং। দিনরাতে বেশ কয়েকবার বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে গরমে আরও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রাজশাহীবাসীকে।

রাজশাহীর বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অত্যধিক গরম পড়ায় এসি, ফ্যান, এয়ারকুলারের ব্যবহার বেড়ে গেছে। ফলে বিদ্যুতের ওপর চাপ পড়ছে বেশি। অত্যধিক চাপ পড়ার কারণে বৈদ্যুতিক তারগুলো লোড টানতে পারছে না। ফলে বিভিন্নস্থানে প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। ট্রান্সফরমার পুড়ে যাচ্ছে। তখন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আর এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্যও বিভিন্ন এলাকায় মাঝে মাঝে লাইন বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। তাই মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি লোডশেডিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। তাদের দাবি, প্রয়োজন মতোই বিদ্যুৎ সরবরাহ রাজশাহীতে পাওয়া যায় বলে জানান কর্মকর্তারা।

রাজশাহী নগরীর সাগরপাড়া মহল্লার বাসিন্দা নাদিয়া ইব্রাহিম জানান, প্রখর রৌদ্রের কারণে বাড়ির বাইরে বের হওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। গরমে বাসাতেও টেকা যাচ্ছে না। গত কয়েকদিনে আবহাওয়ার এই পরিস্থিতির কারণে কাহিল হয়ে পড়েছি। বৃষ্টিও হচ্ছে না। বৃষ্টি হওয়া খুব জরুরি।

নগরীর বড়কুঠি এলাকা সংলগ্ন পদ্মার ধারে চটপটি ও চা বিক্রেতা জনি ইসলাম জানান, গরমের কারণে ক্রেতা নেই বললেই চলে। কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড রোদ পড়ে পদ্মার বালু উত্তপ্ত হওয়ায় চরে ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। ফলে ব্যবসাও হচ্ছে না।

নগরীর আলুপট্টি মোড় এলাকার চা বিক্রেতা সোহেল খান জানান, গরমের কারণে চা বিক্রি কমে গেছে। আবার মোড়ে মানুষজনের আড্ডা দিনের বেলায় নেই বললেই চলে। সন্ধ্যার পর একটু বেশি হয়। গরমের কারণে বাড়ির ভেতরেও তেমন শান্তি নেই।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ জানায়, তীব্র গরমের কারণে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। হাসপাতালে ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশি, হৃদরোগ ও স্ট্রোকসহ বিভিন্ন উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে রোগীরা ইনডোরে চিকিৎসা নিতে আসছেন। এসব রোগে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের সংখ্যাও বাড়ছে।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, হঠাৎ করে আবারও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘরে ঘরে ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। এ সময় বৃদ্ধ ও শিশুদের রোদে না বের হয়ে ঠাণ্ডা পরিবেশের মধ্যে থাকার জন্য বলেন। এছাড়া বিশুদ্ধ পানি, ডাব ও দেশি ফলমূল বেশি খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞ এ চিকিৎসক।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৫ সালের ১২ জুন রাজশাহীতে মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। এরপর ২০১৪ সালের ২১ মে উঠেছিল ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০১৬ সালের ২৯ এপ্রিল উঠেছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর আর সর্বোচ্চ এই তাপমাত্রা অতিক্রম করেনি বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে। এছাড়া ১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে স্মরণকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

একই অবস্থানে আছে ঘূর্ণিঝড় ‘ফনি’

এদিকে ঝড় ফনির বিষয়ে আবুল কালাম বলেন, একই অবস্থানে আছে ঝড়টি। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূল থেকে প্রায় ১৬৯২ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। তবে বাংলাদেশ নাকি ভারত কোন উপকূলের দিকে এটি অগ্রসর হবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

আবহাওয়া অধিদফতর এক সতর্কবার্তায় জানায়, দক্ষিণপূর্ব বঙ্গোপসাগর ও আশেপাশের এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘ফনি‘ আরও উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার পর এখন একই এলাকায় অবস্থান করছে।

বিকেলের দিকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৬৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৬২০ কিলোমিটার দক্ষিণে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৬৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ১ হাজার ৬৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ‘ফনি’ ঝড়টি অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝড়ের কেন্দ্রের কাছে সাগর বিক্ষুব্ধ। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরগুলোকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত