প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বইহীন আমি মানে সভ্যতার বাইরের মানুষ

রাফি হক : খুব স্প্রতি একসঙ্গে অনেকগুলো বই কিনেছি । শঙ্খ ঘোষের ‘পুরোনো চিঠির ঝাঁপি’ ছাড়া আর যে সমস্ত বই কিনেছি তার লেখকদের একজনকেও চিনি না। প্রেম যেমন হুটহাট করে হয় না। বইয়ের প্রতি প্রেম, ভালোবাসাও চট জলদি হয় না। আর পড়ার অভ্যোস হলো একটা প্যাশন, ভালো লাগা, ঘোর, আচ্ছন্নতার মতো। অনেক রকমের বইয়ের স্পর্শ এলে ভালোলাগা-মন্দ লাগা তৈরি হয়। বইয়ের গন্ধ আমার খুব প্রিয় একটি গন্ধ। ছোটবেলার নতুন বইয়ের গন্ধ বা সৌরভ আমি এখনো পাই। ছোটবেলা থেকেই আমি স্কুলের বইয়ের বাইরে বহু রকমের বইয়ের স্পর্শে এসেছি । আমার বাবার পাবলিকেশন হাউজ ছিলো । আমি বড় হয়েছি বইয়ের ভেতর শুয়ে বসে। বইয়ের গন্ধ গায়ে মেখে ।

বই সংগ্রহে মন দিই ক্লাস নাইন থেকে । যখন সংগ্রহে আগ্রহ তৈরি হলো তখন আমার আব্বা নেই । আব্বার পাবলিকেশন হাউজও নেই । তখন আমাদের ঘোর দুর্দিন। যারা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জানেন চেনেন তারা জানেন কী-সব রাত ও দিনের ভেতর দিয়ে গিয়েছি । আমাদের খাওয়ারও জুটতো না ঠিক মতো। রেশনের জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম সকাল থেকে রেশন শপের সামনে। পচা গম, নিকৃষ্ট মানের চাল, বাটারওয়েল, কালচে চিনি (ওরকমের কালচে চিনি আমি জীবনে দেখিনি), কেরোসিন তেল। এই সবকিছু নিয়ে আমি বস্তা-টস্তা মাথায় করে কী করে অমন বাচ্চাকালে রেশন শপ থেকে বাড়ি ফিরতাম তা আমার কাছে আজও বিস্ময় লাগে!

রেশনশপ থেকে বাড়ি বেশ দূরে ছিলো। রেশন তোলা ছাড়াও আম্মার অনেক কাজ করে দিতাম। মাথায় করে গম, ধান, ডাল এসব পিষতে নিয়ে যেতাম জব্বার স্যারের আটা কলে। জব্বার স্যার মুসলিম স্কুলের শিক্ষক ছিলেন । আমি তার ছাত্র ছিলাম । তার বাম চোখ অন্ধ ছিলো। বেতফলের মতো ঘোলা ছিলো । মনে পড়ে, খড়ি (জ¦ালানি কাঠ)মাথায় করে আনতাম। একমণ খড়ি দুই তিনবারে আনতাম। রিকশা ভাড়া বাঁচাতাম। সেই বাঁচানো সামান্য টাকা দিয়ে আম্মা আমাকে আনন্দমেলা কিনে দিতেন নিয়মিত। রবিনহুড, জিম করবেটসহ নানা ধরনের বই পড়তাম। বই কিনতে ইচ্ছে করতো, রাখতে ইচ্ছে করতো নিজের কাছে। কিন্তু সমর্থ ছিলো না ।

পাবলিক লাইব্রেরিতে যেতে শুরু করলাম। সেখানে একজনের সঙ্গে পরিচয় হলো। লোকটার নাম লালিম হক। অকাল প্রয়াত অভিনেতা রাজু আহমেদের ছোট ভাই। তিনি আমাকে লাইব্রেরির অমূল্যসব বইয়ের সন্ধান দিলেন। মনে পড়ে, লাইব্রেরির বৈদ্যুতিক পাখার হাওয়ার নিচে শীতল পরিবেশে মনোযোগ দিয়ে পড়ছি রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড়। লালিম ভাই পাশে বসে বলছেন, বাবু জানো তো মানিকবাবু নষ্টনীড় থেকে ‘চারুলতা’ বানিয়েছেন। কে মানিকবাবু, কী চারুলতা এসবও জানি না। লালিম ভাই আমাকে লাইব্রেরিতে বসেই নিচু স্বরে বুঝিয়ে দিচ্ছেন । মানিকবাবু হলেন সত্যজিৎ রায়, তার বিখ্যাত সিনেমা ‘পথের পাঁচালী’। এই লাইব্রেরিতে আমি ‘প্রবাসী’, ‘শনিবারের চিঠি’ দেখেছি । লালিম ভাই আমাকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতার বইও এই লাইব্রেরিতেই প্রথম দেখেছি ‘বনলতা সেন’। নামটা মনে ধরেছিলো, বাহ্! জীবনানন্দ দাশ বলে একজন কবি আছে জানতাম না। আমাদের সময়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পরে ছিলো সুকান্ত । এর পরে আর কোনো বড় কবির নাম শুনিনি ।

সেই ক্লাস নাইনে থাকতে একটি দুটি করে বই সংগ্রহ করতে শুরু করি । অনেক বই পুরস্কার হিসেবেও পেয়েছিলাম। স্কুলে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম । প্রতিবারই প্রথম হতাম। আর এক বান্ডিল বই উপহার পেতাম। ওই সময় জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হয়ে ঢাকা এসেছিলাম । শিশু একাডেমি থেকে অনেক বই উপহার পেয়েছিলাম। মিসেস জোবেদা খানম ছিলেন শিশু একাডেমির পরিচালক। তিনি উপহার দিয়েছিলেন। খুব ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। তিনিও কুষ্টিয়ার মেয়ে ছিলেন। তখনকার ঢাকা খুব সবুজ আর পরিচ্ছন্ন ছিলো। ঝকঝকে ঢাকা আমার মন কেড়েছিলো ।

আজ আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা খুব কম নয়। অন্যান্য বই ছাড়াও মডার্ন কনটেম্পোরারি আর্ট বা সমকালীন আধুনিক চিত্রকলার ওপর আমার ভালো সংগ্রহ আছে। বই আমার জীবনে একমাত্র সহায়। একমাত্র অর্জন। আমার জীবনধারণের বড় অবলম্বন। বই ছাড়া আমি একটি মুহূর্ত কল্পনাও করতে পারি না। আমার রোজকার ব্যাগে বই থাকবে না আমি কল্পনাও করতে পারি না। যারা বই ভালোবাসেন তাদের শোবার ঘরে, টেবিলে, মেঝেতে, সাইড টেবিলে, চেয়ারে, বুক শেলফে, এমনকি বিছানায় এবং রেস্টরুমে পর্যন্ত বই উপচে পড়ে ।

বইহীন আমি মানে সভ্যতার বাইরের মানুষ। সভ্যতার সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বই ছাড়া রেনেসাঁস সম্ভবই হতো না। কবি শামসুর রাহমান সুন্দর বলেছেন, ‘আমাদের দেশে যথার্থ রনেসাঁসের স্পর্শ লাগেনি। যদি লাগতো তাহলে আমাদের দেশের চেহারা এ রকম থাকতো না। এই ভূখ-ের অধিকাংশ মানুষ প্রশ্ন বিমুখ, বৈজ্ঞানিক বিচারবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় গোঁড়ামি আঁকড়ে ধরে থাকার ব্যাপারে পারঙ্গম, ইহজাগতিকতাবিরোধী। শহুরে শিক্ষিত মানুষও এই তমাসাচ্ছন্ন প্রবণতা থেকে মুক্ত নন। এ থেকে মুক্ত হতে হলে বইয়ের দিকে হাত বাড়াতেই হবে…’।

আর্টের বই সংগ্রহের জন্য আমি আমার বন্ধু শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মন্দিরা ভাদুরির কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। মন্দিরা নিজেও একজন শিল্পী এবং বই পাগল মানুষ। আমরা শিকাগোতে পাগলের মতো লাইব্রেরি ব্যবহার করেছি, বই কিনেছি। বই কিনলে তো হলো না! সেই বই ঢাকাতে আনতে হবে। জামা কাপড় রেখে ব্যাগ ভর্তি বই এনেছি। সব বইয়ের জায়গা দুইটা লাগেজেও হয় না! মন্দিরাই বাৎলে দিয়েছে পথ, ‘ভেবো না, এক্সট্রা লাগেজ নাও । আমি দেখবো’ । আমি বলি সে তো তিনশ ডলার !

এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখি তিনটি লাগেজেরই ওজন ঠিক নেই! কমাতে হবে। তবু বই কমাবো না। নামিয়ে রাখি বাকি জামা-কাপড়ও। নিজে পড়ে নিয়েছি তিন চারটি জামা, তিনটি ভারী সোয়েটার, চাঁদে নামা নীল আর্মস্ট্রংয়ের মতো ঘরবাড়ি মার্কা জ্যাকেট, দুটো ইয়া বড় মাফলার সব গায়ে জড়িয়েছি। হাতে যতোগুলো বই নেয়া যায়, নিয়েছি। দেখার মতো দৃশ্য। মন্দিরা হাসে, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে। পড়ুক । আমি খুব খুশি। বইগুলো নিয়ে যেতে পারছি ।

ইমিগ্রেশন অফিসার, সিকিউরিটি চেকিংয়ের নিরাপত্তা কর্মীরা চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে দেখছে আমাকে। দেখুক । আমি নির্দোষ। কিন্তু ঘামছি। শেষে একজন মহিলা এয়ারলাইনস কর্মী আমার চাঁদের জ্যাকেট খুলে দিয়ে জ্যাকেটের দুই হাতার মধ্যে দুইটি মোটা সোয়েটার ঢুকিয়ে দিলো। গায়ের জামা একটি রেখে বাকিগুলো জ্যাকেটের দুই পকেটে এবং মাফলার দুটি দিয়ে জ্যাকেটটি গোল করে বেঁধে দিলো। বললো, ‘এখন আর তোমার অসুবিধে হবে না। তাই না?’ আমি বলি, ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তুমি খুব ভালো এবং সুন্দরী’। হেসে দিয়ে মহিলা বলেন, ‘তুমি কি প্রকৃতই বলছো আমি সুন্দরী’? নিশ্চয়ই। আমাদের আর কথা হয় না। আমি নিরাপত্তা বলয় পার হয়ে যাই ।

ঢাকা এয়ারপোর্টেও কাস্টমসের বিশ্বাস হয় না যে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্তর ছাড়া আমার তিনটি লাগেজেই বই আছে। আমেরিকা থেকে এসেছে বই নিয়ে! তাও তিন লাগেজ! খুলে দেখানোর পর ওদের বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটতেই চায় না! একজন অল্পবয়সী মহিলা অফিসার এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে এসে আমাকে গাড়িতে তেিল দিতে এলেন। তার সঙ্গে দুই সেপাই ছিলো। যারা আমাকে ট্রলি বহন করতে দেয়নি। বিদায় নেবার সময় তারা দুজন আচমকা পা উঁচিয়ে মেঝেতে শব্দ তুলে এমন করে গান স্যালুটের মতো করে স্যালুট দিলো যে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম! সকলি বইয়ের জন্য। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত