প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উন্নয়নের দিকে তাকিয়ে রেলওয়ে হাসপাতালগুলো, যেন এক ভুতুড়ে বাড়ি

নিউজ ডেস্ক : গত ১০ বছরে রেলে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আমূল পরিবর্তন আনতে ৩০ বছরব্যাপী মাস্টার প্ল্যানও নেয়া হয়েছে। কিন্তু রেলওয়ে হাসপাতালগুলোর উন্নয়নে কোনো উদ্যোগই নেয়া হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল এখন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে।

রেলের ১৪টি হাসপাতাল এবং ১০টি ডিসপেনসারি কাম হাসপাতাল যেন কোমায় চলে গেছে। ‘নেই আর নেই’- এ ভরা এসব হাসপাতালের উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা ভাঁওতাবাজিতে পরিণত হয়েছে। নামমাত্র ডাক্তার, নার্স থাকলেও রোগ-নির্ণয়ের কোনো সরঞ্জামই নেই। এসব কারণে হাসপাতালগুলোতে রোগীও আসেন না।

জানা গেছে, রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ১৪টি হাসপাতাল ও ১৮টি ডিসপেনসারি কাম হাসপাতালের মধ্যে ৮টি ডিসপেনসারি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ১০টিতে কোনো ফার্মাসিস্ট নেই। মাত্র ২৫ শতাংশ ডাক্তার, নার্স ও স্টাফ দিয়ে চলছে হাসপাতালগুলো। শতাধিক সার্জনের স্থলে রয়েছেন মাত্র ১৩ জন। ৩০ জন মহিলা ডাক্তারের স্থলে মাত্র ২ জন আছেন। তিনটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সবগুলোই নষ্ট।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেলওয়ের আটটি হাসপাতালের মধ্যে দুটি বেশ বড়। ২৪ থেকে ২৬ এপ্রিল ঢাকা রেলওয়ে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ৩ জন পুরুষ ও ১ জন নারী রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। নারী রোগীটি ছিলেন মহিলা ওয়ার্ডে। তার সঙ্গে কেউ নেই, কথাও বলতে চাননি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে।

একজন নার্স বলেন, তিনি (নারী রোগী) ১২-১৩ দিন ধরে ভর্তি আছেন। তার কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না। ৮টি কেবিনের মধ্যে একটিতে রোগী আছেন। পুরুষ ওয়ার্ড দুটিতে দু’জন রোগী। গাজীপুর থেকে আসা রোগী শাহজাহান বললেন, তিনি ১০ দিন ধরে ভর্তি আছেন। অপারেশন করার কথা থাকলেও কোনো খবর নেই। শরীফ মিয়া ১২ দিন ধরে ভর্তি। বললেন, পাইলসের অপারেশন হওয়ার কথা, ডাক্তার কিছু বলছেন না।

হাসপাতালের ডাক্তার আসাদুজ্জামান বলেন, রোগী নেই। ২-৩ জন ভর্তি থাকলেও সরঞ্জামের অভাবে অপারেশন কিংবা কোনো চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রোগ নির্ণয়ের কোনো সরঞ্জামই নেই এখানে। তাছাড়া যারা ভর্তি হন তাদের ৩০০ টাকা খাবার বাবদ দিতে হয়। ফলে ১-২ জন ভর্তি থাকলেও খাবারের টাকা পরিশোধের ভয়ে চলে যান।

ডাক্তার আসাদুজ্জামান আরও বলেন, বর্তমানে ৭ জন ডাক্তার আছেন। কিন্তু রোগী না থাকায় ডাক্তারদের অলস বসে থাকতে হয়। আসলে মানুষ জানেনই না যে এখানে এত বড় একটি হাসপাতাল রয়েছে। দেখতে একটি ডাকবাংলোর মতো দেখা যায়।

জানা যায়, হাসপাতালটি কার্যকর করতে ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল এটি নতুন করে উদ্বোধন করেছিলেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও সাবেক রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক। ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, ঢাকা’র নাম পরিবর্তন করে ‘রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা’ নামকরণ করা হয়। ২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। হাসপাতালটি জেনারেল হলেও রোগীর দেখা মিলছে না। প্রায় সাড়ে ৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালটি কী করে কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে কেউ ভাবছেন না। এমনটা জানিয়েছেন হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান মেডিকেল অফিসার ডা. লুৎফুন নাহার বেগম বলেন, এ অঞ্চলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতাল দুটি অনেক বড়। কিন্তু, বড় এ দুটি হাসপাতালেই সমস্যার শেষ নেই। বাকিগুলোও নেই আর নেইয়ের মধ্যেই পড়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। লোকবলের চরম সংকট।

তিনি বলেন, ৯৫ বেডের চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালটিতে রোগী নেই বললেই চলে। রোগ নির্ণয়ের কোনো সরঞ্জামই নেই। একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও তা নষ্ট। অপারেশনের কিছুই নেই। এখানে ডাক্তাররা এলেও বিসিএসের জন্য চলে যান। ডাক্তারদের পড়াশোনা কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য এখানে কোনো ব্যবস্থাই নেই। তা ছাড়া কোনো ফার্মাসিস্ট নেই, নেই সিনিয়র কোনো নার্স।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে ৬টি হাসপাতাল এবং ৬টি ডিসপেনসারি কাম হাসপাতাল রয়েছে। এসব হাসপাতালে ৩৪ জন ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র ৭ জন। মাত্র ১৫ থেকে ২০ সহকারী সার্জন, নার্স এবং ফার্মাসিস্ট নিয়ে হাসপাতালগুলো চলছে। সৈয়দপুরে ৯০ শয্যা বিশিষ্ট রেলওয়ে হাসপাতালটি সবচেয়ে বড়। এ হাসপাতালে ৭ জন ডাক্তারের স্থলে রয়েছেন মাত্র ২ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ২০ শয্যা বিশিষ্ট, লালমনিরহাটে ৩০ শয্যা, পার্বতীপুরে ১৬ শয্যা, পাবনার পাকশীতে ৮০ শয্যা এবং সান্তাহারে ৮০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল রয়েছে। ৮০ শয্যার পাকশী রেলওয়ে হাসপাতালে ১৩ জন চিকিৎসকের স্থলে মাত্র ৩ জন রয়েছেন। আর সান্তাহারে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ২ জন। হাসপাতালগুলোতে রেলওয়ের চাকরিজীবীদের চিকিৎসা সেবা গ্রহণের কথা থাকলেও সেবা না পাওয়ায় যান না রোগীরা। তারা বাধ্য হয়ে যাচ্ছেন বাইরের হাসপাতাল বা প্রাইভেট ক্লিনিকে। এছাড়া এ অঞ্চলের ৬টি ডিসপেনসারি কাম হাসপাতালও বন্ধের উপক্রম হয়েছে।

এ বিষয়ে পশ্চিম রেলওয়ের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. শামছুল আলম মো. এমতেয়াজ বলেন, রেলওয়েতে বর্তমান সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। এখন শুধু হাসপাতালগুলোর উন্নয়ন হলেই রোগীরা যথাযথ সেবা পাবেন। এ অঞ্চলে সবক’টি হাসপাতালে লোকবলের চরম অভাব। নামে মাত্র সেবা চলছে হাসপাতালগুলোয়। কোনো সার্জন চিকিৎসক নেই। নেই রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম। এ অঞ্চলের হাসপাতালগুলোর জন্য দুটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও তা ১০ বছর ধরে নষ্ট।

বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলম বলেন, রেলওয়ে হাসপাতালগুলো আধুনিক করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা রেলওয়ে হাসপাতালকে জেনারেল হাসপাতাল করা হয়েছে। মূলত প্রচারের অভাব রয়েছে। সবক’টি হাসপাতালে লোকবল নিয়োগ এবং সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করবেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে রেলওয়ে সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে রেলওয়েতে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় নিশ্চয়ই রেলওয়ে হাসপাতালগুলোও অত্যাধুনিক হওয়ার কথা। হাসপাতালগুলোকে কী করে আরও আধুনিক করা যায় এবং এগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। যুগান্তর, ভোরের কাগজ, বণিকবার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত