প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেয়েরা যেন বঞ্চিত না হয়, উপায় খুঁজুন, বললেন প্রধানমন্ত্রী

বাংলানিউজ : শরিয়া আইনে হাত না দিয়ে বাবার অবর্তমানে, বিশেষ করে ছেলে সন্তানহীন বাবার সম্পত্তিতে স্ত্রী ও মেয়েদের অধিকার নিশ্চিত করতে আইনি সমাধান খুঁজতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, দু’টি সন্তানই যদি মেয়ে হয় তাহলে বাবার সম্পত্তির ভাগ… স্ত্রী, মেয়ে বঞ্চিত হবে, এখানে কীভাবে সুরাহা করবেন। আমি শরিয়া আইনে হাত দিতে বলবো না, সম্পত্তি আইনে এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

রোববার (২৮ এপ্রিল) হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের ধনসম্পদ যত বেড়েছে মানুষের লোভও তত বেড়েছে। এখানে মেয়েরা যে বঞ্চিত হচ্ছে- আমরা স্লোগান তুলি যে দুই সন্তানই যথেষ্ট, দু’টি সন্তানই যদি মেয়ে হয় তাহলে বাবার সম্পত্তির ভাগ… স্ত্রী, মেয়ে বঞ্চিত হবে, এখানে কীভাবে সুরাহা করবেন। আমি শরিয়া আইনে হাত দিতে বলবো না, সম্পত্তি আইনে এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

‘আমি জানি না আপনারা বিজ্ঞ সবাই আছেন, তবু বক্তব্য এইটুকু থাকবে, সেখানে যদি ছেলে মেয়ে না লিখে যদি সন্তান লিখে দেন; সে সন্তান ছেলেই হোক বা মেয়েই হোক অন্তত তার ভাগটা তো সে পাবে। এভাবে একটা উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এটা বললে অনেক হুজুররা লাফ দিয়ে এসে পড়তে পারে। কিন্তু তারপরেও এই সমস্যাটা সমাধান করা দরকার।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আমাদের অনেক ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারা কিন্তু বলেছেন যে মেয়েদের অধিকার সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটা অনেকেরই মনের কথা, বিশেষ করে যাদের দু’টি মেয়ে আছে তারাই এটাই ভাবেন যে আমার সম্পত্তি লিখে দেই, সমস্যা আরও আছে, আপনি যে সম্পত্তি লিখে দেবেন, লিখে দিলে দু’দিন পরে জামাই এসে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। তখন আপনি কোথায় যাবেন? অসহায় হয়ে যাবেন। অনেক সময় দেখা যায় মেয়েও আর বাপ মাকে চেনে না। সম্পত্তি পেয়ে গেছে আর চেনার দরকারটা কি! মা-বাবা হয়তো রাস্তায়! অথবা বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই হয়। খবরও নেয় না, সেই সমস্যাটাও আছে।’

‘কোনো একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত অন্তত আমৃত্যু যেন নিজের অধিকারটুকু থাকে, মৃত্যুর পরে সন্তানরা বা মেয়েরা যেন অধিকারটুকু পায়।’

সমাধানের পথ সবাই মিলে খুজেঁ দেখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ক্ষেত্রে আমাদের সাবেক বিচারপতি, বিচারপতি অন্য সবাই আছেন, আমি আপনাদের অনুরোধ করবো- হ্যাঁ আমাদের ইসলাম ধর্ম, মুসলিম আইন মানতে হবে এটা ঠিক। তারপরেও মেয়েদের যে অধিকারটুকু সম্পদে, বাবা করে গেছেন সম্পত্তি কিন্তু সেখানে কেন আরেকজন এসে এভাবে সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে যাবে? কিছু (লোক) এই শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে মা ও মেয়েকে বঞ্চিত করে দিয়ে যার বাবার হাতে বা স্বামীর হাতে গড়া সম্পত্তি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে দিয়ে যে সম্পদ কেড়ে নেয় এর কোনো সুরাহা করা যায় কিনা? আপনারা দয়া করে দেখবেন। এভাবেও কিন্তু অনেক সামাজিকভাবে অনাচার হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে আমি বলবো পাকিস্তানি মিলিটারি ডিকটেটর আইয়ুব খান একটা কাজ করে গেছেন। আপনারা জানেন সেটা- আগে আমাদের শরিয়া আইনে ছিল বাবার সামনে ছেলে মারা গেলে ছেলের সন্তানরা কোনো সম্পত্তির ভাগ পেতো না।

বাবার সম্পত্তিতে মেয়েদের বঞ্চিত হওয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্যায়ের শিকার অনেক সময় অর্থশালী, সম্পদশালী পরিবারও হয়। মনে হয় পৃথিবীর একটি মাত্র ধর্ম, আমাদের ইসলাম ধর্ম যেখানে মেয়েদের অধিকার দেওয়া হচ্ছে সম্পদে। অনেক সময় মেয়েরা বঞ্চিত হয় বা সেই সম্পত্তি তারা পায় না। ভাইয়েরা দিতে চায় না। এমনও ঘটনা আমরা দেখেছি।

তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করি, বস্তি এলাকায় অনেক ছোট ছোট শিশু রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো। তাদের নিয়ে এসে, কেন তারা বস্তিতে থাকে, কি কারণে তারা বস্তিতে থাকে তা ছোট ছোট শিশুদের কাছে শুনি– তখন জানতে পারি সমাজের অনেক অন্ধকারের কথা।

‘সেখানে দেখা যায় ভাই ভাইকে খুন করেছে অথবা আত্মীয়-স্বজন খুন করে সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে। ভাইয়ের ছেলেমেয়ে স্ত্রীসহ তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তাদের স্থান হয়েছে বস্তিতে, ছেলে মেয়ে হয়ে গেছে টোকাই আর নারীর ভাগ্য কি হতে পারে আপনারা নিজেরাই বুঝতে পারেন, হয় সে নিজে বাড়ি বাড়ি কাজ করে খাচ্ছে অথবা পতিতালয়ে স্থান হচ্ছে। এই যে সামাজিক অবিচারটা হয়, এগুলোর দিকেও বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবার অনেক অর্থশালী, সম্পদশালী, তাদেরও আমি দেখেছি, ভাই মারা গেছে, ভাইয়ের ছেলে নেই, মেয়েরা আছে। মেয়ে বা তার স্ত্রী হয়তো যে বাড়িটা মায়ের নামে জমি ছিল বা বাবার নামে জমি ছিল কিন্তু ওই ভাই বাড়িটা তৈরি করে দিয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও ওই সম্পদশালী ভাই ছুটে আসে ওই সম্পত্তিটা দখল করতে। ওই মেয়েদের যেটুকু আইনগত পাবে তার বেশি এক কানাকড়িও দেবে না। এগুলো কিন্তু সম্পদশালী পরিবার। কিন্তু তাদের ভেতরও এ ধরনের একটা অমানবিক আচরণ আমরা দেখতে পাই।

‘সেখানে এইটুকু তারা দেখে না যে তার নিজের ভাই, যে ভাই বাড়িটি করে গেলো সেখানে তার মেয়েরা থাকবে বা স্ত্রী থাকবে, সেখানে ভাইয়ের ওই ভাগটুকু কেন নিতে হবে। মানুষের এই নিষ্ঠুরতার শিকার কিন্তু মানুষেই হয়। এগুলো কীভাবে সমাধান করবেন জানি না। এই রকম দুই একটা কেস আমার কাছে যখন এসেছে যা হোক আমি সমঝোতা করিয়ে দিয়ে ওই মেয়েরা যেন তাদের ন্যায় ভাগটা যেন পায় বা একটু বেশি পায় সে ব্যবস্থা করে দিয়েছি। কিন্তু আমাদের উচ্চবিত্তের মধ্যেও এই প্রবণতাটা দেখা যায়।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্বাধীনতার পর আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অনেক বুদ্ধিজীবী পরিবার হয়তো বাড়িতে একটি মাত্র মেয়ে– ভাইটাকে যে এভাবে পাকিস্তানি বাহিনী, রাজাকার আল বদর এভাবে খুন করেছে সেটার দিকে নজর নাই। কিন্তু ভাইয়ের সম্পত্তিটুকু দখল করে ঐ ভাতৃবধু ও মেয়েটিকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া সেই প্রবণতা, সেরকম নিষ্ঠুরতাও আমরা দেখেছি।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত