প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশের বাহা’ই সম্প্রদায়ের সঙ্গে গোয়েন্দাদের বৈঠক, অনুষ্ঠান আয়োজনে অবহিত করতে নির্দেশনা

মো. আল-আমিন : বাংলাদেশে কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে হেফাজতে ইসলামসহ দেশের আলেম সমাজ যখন আবারো মাঠে নেমেছেন তখন নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাহা’ই ধর্মালম্বীদের যে কোন অনুষ্ঠান আয়োজনের আগে জানাতে বলেছে বাংলাদেশের জাতীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সম্প্রতি বাহা’ইদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বাহা’ইরা নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে নেই। তারপরও যে কোন অনুষ্ঠান আয়োজনের আগে জানালে নিরাপত্তা দেয়া হবে। সাউথ এশিয়ান মনিটর

বাহা’ইদেরও বিশ্বাস- নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে নেই তারা। তা তাদের ধর্মের বাণী প্রচার, অনুষ্ঠান আয়োজন কিংবা অবাধে চলাচল কোনটাতেই নয়।

বাংলাদেশে বাহা’ইরাও আরেক সংখ্যালঘু ধর্মবিশ্বাসী। এর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে- ‘তারা নিভৃতচারীও’। তাদের নামাজ আছে (বিশেষ পদ্ধতিতে), রোজা আছে, রোজার শেষে ঈদের মতো অনুষ্ঠানও আছে। কিন্তু সব আচার অনুষ্ঠান পালন ও আয়োজন সবই হয় নিভৃতে।

বাংলাদেশ অংশের প্রথম যারা এই বাহা’ই ধর্মের বাণী ধারণ করেন তারাও ছিলেন মুসলমান। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন স্থানীয় হিন্দু, উপজাতিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির মানুষ। বর্তমানে বাংলাদেশে বাহা’ইদের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৮৪৪ সালে ইরানের বা’ব এবং বাহা’উল্লাহ নিজেদেরকে ঈশ্বরীয় অবতার ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা ইরান সরকার, ধর্মীয় নেতৃবর্গ ও জনগণকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। ১৮৫০ সালে তাদের হাতে নিহত হন বা’ব। ১৮৬৩ সালে বাহা’উল্লাহ ইরাকের বাগদাদের রিজওয়ান উদ্যানে ঘোষণা করেন- তিনিই সকল যুগের ‘প্রতিশ্রুত মহাপুরুষ’, যার জন্য শত শত বছর ধরে মানুষ অপেক্ষা করছে।

পরে বাহা’উল্লাহ তার বাণী প্রচারের জন্য সুলেমান খান-তুনুকাবানিকে (জামাল এফেন্দী) ভারতে পাঠান। ১৮৭৬ সালে জামাল এফেন্দী বোম্বে পৌঁছান এবং ভারতীয় উপমহাদেশে তার মাধ্যমে বাহা’ই হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সৈয়দ মুস্তফা রুমি। যার জন্ম কারবালায়। কিন্তু তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে ভারতে আসেন এবং মাদ্রাজে কাশ্মীরী উল ও শাল ব্যবসার সঙ্গে নিজেকে জড়িত করেন। পরে তিন বার্মায় নিযুক্ত হন বাহা’ই ধর্ম প্রচারে। ওখানেই তার হাত ধরে বাহা’ই ধর্মের বাণী ধারন করেন বাংলাদেশ অংশের বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে শুরুর দিকে অর্থাৎ বিংশ শতাব্দির দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে যারা দীক্ষা নেন তারা হলেন, মোহাম্মদ ইসহাক, শেখ আলিমুদ্দিন মিস্ত্রি, মৌলভী সুলতান গাজী, আমিরুল ইসলাম, আব্দুর রহিম, কামাল মিঞা সওদাগর, আব্দুল আলিম, সফদার আহমেদ, সাফিউল ইসলাম খান এবং শাহ আলম চৌধুরী। এদের মধ্যে শুধু মোহাম্মদ ইসহাকের বাড়ি ছিল ময়মনসিংহে। বাকিরা চট্টগ্রামের বাসিন্দা। কিন্তু ব্যবসার কাজে ব্যস্ত ছিলেন বার্মায়।

বর্তমানে ঢাকায় রয়েছে বাহা’ইর জাতীয় আধ্যাত্মিক পরিষদ। এছাড়া বরিশাল, যশোর, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে রয়েছে ছয়টি আঞ্চলিক আধ্যাত্মিক পরিষদ। এর মধ্যে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে অধিক সংখ্যক বাহা’ইদের বসবাস।

স¤প্রতি কথা হচ্ছিল বাহা’ইর জাতীয় আধ্যাত্মিক পরিষদের সদস্য টিউলিপ চৌধুরীর সঙ্গে। যিনি রংপুরের বাসিন্দা এবং ১৯৯২ সালে হিন্দু ধর্ম থেকে বাহা’ই ধর্মের দীক্ষা গ্রহণ করেন। বর্তমানে তার গ্রাম এবং আশপাশের গ্রামগুলোতেও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছেন বাহা’ইর অনুসারিরা। টিউলিপ চৌধুরী জানান, পাঁচ ভাই এবং পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি এবং তার ছোট ভাই বাহা’ইর দিক্ষা নিয়েছেন, বাকিরা সবাই হিন্দু ধর্মই পালন করছেন। কিন্তু পরিবার কিংবা সমাজ বা গ্রাম কোন দিক থেকেই তারা বাধার সম্মুখীন হননি।

কিন্তু বর্তমানে বাহা’ইর বাণী প্রচার শ্লথ গতিতে চলছে। আশি বা নব্বইয়ের দশকের মতো আসছেন না ট্রাভেল টিচাররা। কার্যক্রমও অনেকটা সীমিত ঘরোয়া কেন্দ্রীক শিশুক্লাস, কিশোর ক্লাস ও প্রাপ্তবয়স্কদের অধ্যায়ন চক্রের মধ্যে। যদিও একসময়ে বাংলাদেশে এসেছেন ইরাক, ইরান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া, মৌরিশাস, ফিলিপাইন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, ইটালি ও ভারত থেকে। সবচেয়ে বেশি এসেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান থেকে।

ঢাকাস্থ বাহা’ইদের বসবাস ছিল মূলত মিরপুর ও শান্তি নগরে। ১৯৭১ সালে বাহমান মোগাদ্দাস করাচি গিয়ে সিমিন নামের একজনকে বিয়ে করে ফিরে আসেন এবং ওই সময়ই শান্তিনগরের সার্কিট হাউজ রোডের বর্তমানের জাতীয় বাহাই কেন্দ্রটি কেনা হয়। ১৯৭২ সালে গঠিত হয় জাতীয় আধ্যাত্মিক পরিষদ।

প্রসঙ্গত, ইসরায়েলের আক্কায় বাহা’উল্লাহর কবরকে ভিত্তি ধরে বাহা’ইদের কেবলা ঠিক করা হয়। তারা মাস গুনছেন ১৯ দিনে। তাতে ১৯ মাসে বছর। বাহা’ই ক্যালেন্ডারের বছর শুরু ২১ মার্চ। প্রতি বছর ২ মার্চ থেকে ২০ মার্চ স‚র্যোদয় থেকে স‚র্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালন করে। ২১ মার্চ ঈদ ও নববর্ষ। যাকে বলা হচ্ছে ‘নওরোজ’। ওই দিন ৩টা থেকে ৩.১৫টার মধ্যে ঈদের ও নওরোজের প্রার্থনা করা হয়।

সাভারের কমলাতে উপাসনালয়ের জন্য নির্ধারিত জমির পাশেই ৩১ শতাংশ জমি কেনা আছে কবরস্থানর জন্য। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে মোহাম্মদপুরে নবনির্মিত কবরস্থানের পাশে এক খÐ জমি চাওয়া হয়েছে বলে জানান টিউলিপ চৌধুরী। তিনি বলেন, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত