প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লেডিস সুয়েটার

আশীফ এন্তাজ রবি : আচ্ছা, আপনাদের বাসায় কি একটু জায়গা হবে? একটা লেডিস সুয়েটার রাখতে পারবেন? অল্প কয়েকদিনের জন্য? বড় বিপদে আছি। কাহিনীটা খুলেই বলি। আমি তিন ধরনের উপহার পেতে পছন্দ করি।

১. বই, ২. পাঞ্জাবি, ৩. চুমু। ইদানীং দিনকাল খুবই খারাপ যাচ্ছে। কাজেই উপহার হিসেবে চুমু আর পাওয়াই হয় না। একসময় ভক্তকুল মমতা করে চুমুটুমু খেতো। ইদানীং তারা স্বাস্থ্য এবং ইজ্জত সচেতন হয়েছেন। ফলে আমার জীবন হয়েছে চুম্বনবিহীন। কাজেই লিস্টি থেকে ৩ নম্বর উপহার বাদ দিলে হাতে থাকে দুটি উপহার। ১. বই এবং ২. পাঞ্জাবি।

গত তিন বছরে আমাকে কেউ বই উপহার দেননি। একমাত্র তানিম ভাই ছাড়া। আমি হিসাব করে দেখেছি, গত দুই বছরে তানিম ভাই আমাকে ৮২টি বই দিয়েছেন। সমস্যা একটাই, সবক’টি বই উনার নিজের লেখা। না ৮২টি গ্রন্থ উনি লেখেননি। সব মিলিয়ে উনার বইয়ের সংখ্যা গোটা দশেক। কিন্তু উনার স্মৃতিশক্তি বেশ খারাপ। উনি একই বই বারবার আমাকে উপহার দিয়েই যাচ্ছেন। ভদ্রতার খাতিরে তাকে কিছু বলতে পারছি না। এমনিতেই কবিরা স্পর্শকাতর হন। তানিম ভাই তো কবি বটেই, তদুপরি সায়েন্স ফিকশন লেখক। কাজেই উনাকে ঘাঁটাতে সাহস পাচ্ছি না। এবার আসি পাঞ্জাবি বিষয়ক কথায়। কেউ আমাকে পাঞ্জাবি উপহার দিলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়।

এর প্রধান কারণ পাঞ্জাবি অতি বেকায়দার পোশাক। এটা কখনো সাইজে হয় না। কিছুদিন আগে আমার শাশুড়ি দশটি পাঞ্জাবি পাঠিয়েছেন। দশটি পাঞ্জাবি দশ রকম সাইজের। আমি খুব সাবধানে সবচেয়ে ছোট সাইজের পাঞ্জাবি গায়ে দিলাম। পাঞ্জাবির গলা দিয়ে মাথা ঢোকালাম, সেটা পিছলে কোমর বেয়ে নেমে গেলো। এতোই বড়। সাহস করে বাকি পাঞ্জাবিগুলো আর পরলাম না। গত বছর এক ফিরিঙ্গি আমাদের বাসায় সস্ত্রীক বেড়াতে এসেছিলো। সে হেভিওয়েট বক্সিং করে। বিশাল সাইজ। অন্ধকারে তাকে কেওক্রারাডং পর্বতের মতো লাগে। তাকে একটা পাঞ্জাবি উপহার দিলাম। কিম আর্শ্চয। সেই পাঞ্জাবি তারও ঢিলা হলো। সে করুণ গলায় বললো, জিনিসটা ভালোই।

তবে আরও দুই সাইজ কম হলে ভালো হতো। শাশুড়ির পাঞ্জাবি ব্যর্থ হবার সংবাদ পারিবারিক চ্যানেলে প্রচারিত হওয়া মাত্র আমার কানাডা প্রবাসী শ্যালিকা তিনটি পাঞ্জাবি পাঠিয়ে দিলো। আল্লাহর অশেষ রহমতে এবারেরগুলো সাইজে ছোট। কিন্তু একটু বেশি ছোট। তবু আমার জেদ চেপে গেলো। কী আছে জীবনে। শালীর পাঞ্জাবি যদি গায়েই না দিতে না পারি, তাহলে এই জীবন রেখে কী লাভ। সেই আপ্ত বাক্য মাথায় নিলাম…‘ণবংঃবৎফধু ও ধিং পষবাবৎ, ংড় ও ধিহঃবফ ঃড় পযধহমব ঃযব ড়িৎষফ. ঞড়ফধু ও ধস রিংব, ংড় ও ধস পযধহমরহম সুংবষভ.।

কাজেই শপথ নিলাম, সাইজে ছোট হতে হবে। সকাল-বিকাল জিমে যাওয়া শুরু করলাম। ভাত ছেড়ে দিলাম। সাঁতারও কাটতে লাগলাম। টানা ছয়মাস কঠোর পরিশ্রমের পর আমার ওজন কমলো। শুকিয়ে সজনে ডাটার মতো হয়ে গেলাম। তারপর এক সুন্দর সকালে পাঞ্জাবি পরার চেষ্টা করলাম। অনেক কষ্টে একটা হাত ঢুকলো, বডির বাকি অংশ আর ঢোকে না। মিতু বললো, এই পাঞ্জাবিগুলো রেখে দাও। ভবিষ্যতে কোনোদিন তোমার ছেলেপুলে হলে ওরা পরবে। এই কথাটা বলে সে একটা রহস্যময় হাসি দিলো। বুদ্ধিমান পাঠকমাত্র বুঝতে পারছেন… আমার যাবতীয় মনোযোগ এখন পুত্র সন্তানের বাবা হবার দিকে। দেখা যাক। এরই মধ্যে আরও দুই মহান তরুণ আমাকে দুটি পাঞ্জাবি উপহার দিলেন। এদের একজন কচি ভাই এবং আরেকজন মনির ভাই। কচি ভাই যে পাঞ্জাবি দিয়েছেন সেটা মনির ভাইয়ের গায়ে ফিট হয়।

বিপরীতক্রমে মনির ভাই যে পাঞ্জাবি দিয়েছেন সেটা কচি ভাইয়ের শরীরে দারুণ লাগে। কিন্তু দুটি পাঞ্জাবির কোনোটিই আমার কপালে মানে গায়ে সইলো না। এই পাঞ্জাবি আতঙ্কের মধ্যে এক কা- ঘটলো। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের একটা সামিটে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন হাফ বিখ্যাত সাংবাদিক মুন্নী। অতি পরিচিত মুন্নী সাহা হচ্ছেন ফুল বিখ্যাত সাংবাদিক। আর আমাদের নাজনিন মুন্নী হাফ বিখ্যাত সাংবাদিক। অতি অল্প দিনের মধ্যে তিনি বিখ্যাত সাংবাদিকে পরিণত হবেন এই আমার দোয়া। যাই হোক, মুন্নীর সঙ্গে দেখা করার অভিপ্রায়ে আমি তার হোটেলে গেলাম। সেখানে ঢাকার অনেক তারকা সাংবাদিক ছিলেন। কফিটফি খেয়ে বিদায় নিচ্ছি… এমন সময় মুন্নী বললো, একটু কষ্ট করে এক মিনিট দাঁড়াবেন? আমি করুণ গলায় বললাম, তুমি বললে এক মিনিট কেন এক কোটি বছর দাঁড়িয়ে থাকবো। শুধু বলো… এক পায়ে, না দুই পায়ে, কীভাবে দাঁড়াবো।

মুন্নী চোখ পাকিয়ে বললো, এসব ঢঙের কথা আমাকে বলবেন না, অন্য মেয়েদের বইলেন। তারপর তার সুটকেস খুলে একটা আড়ংয়ের প্যাকেট বের করলেন। সেই প্যাকেট দেখে আমার জ্বর আসলো। তোতলাতে তোলতাতে বললাম, মুন্নী, বাই এনি চান্স, তুমি পাঞ্জাবি আনোনি তো। মুন্নী খুব কড়া গলায় বললো, হ্যাঁ পাঞ্জাবি। তো কি হয়েছে? এই বলে পাঞ্জাবির ব্যাগ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে শহর ছেড়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। বাসায় এসে নিতান্তই কৌতূহলেব বশে প্যাকেট খুললাম। সাদা ধবধবে রঙের খুব সুন্দর একটা পাঞ্জাবি। ওমা! হুবহু গায়ে ফিট করলো। দৈর্ঘ্য,ে প্রস্থে, আয়তনে একদম খাপে খাপ। কাহিনী এখানে শেষ হতে পারতো। কিন্তু হলো না। সেই আড়ংয়ের প্যাকেটের ভেতর আরেকটা কি যেন আছে । ভাবলাম, মেয়েটার মনভর্তি মায়া। অতোদূর থেকে একটা পাঞ্জাবি নিয়ে কি সে আসবে? নিশ্চয়ই আরেকটা পাঞ্জাবি। প্যাকেটের ভেতরে যা পেলাম , তাতে আমার আক্কেল গুড়ুম। একটা সুয়েটার। লেডিস সুয়েটার। সঙ্গে সঙ্গে মুন্নীকে ফোন দিলাম। মুন্নী আকাশ থেকে পড়লো।

ওমা, ভুল করে আমার সুয়েটার আপনার ব্যাগে ঢুকে গেছে। আপাতত আপনার কাছে রাখেন। আমি আবার কোনোদিন আমেরিকায় আসলে আপনার কাছ থেকে সুয়েটারটা নিয়ে নিবো। পরনারীর দেয়া পাঞ্জাবি আমার গায়ে ফিট করায় মিতুর মুখ অন্ধকার হয়েছিলো। এখন আমার ব্যাগের ভেতর লেডিস সুয়েটার পাওয়া যাওয়ায় মিতুর কালো মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে। মেয়েদের এই জিনিস তোমার ব্যাগে কি করে এলো? আমি এমনিতেই বাকপটু। বিপদের সময়ে আমি পুরো তোতলা হয়ে যাই। কাজেই পুরো ব্যাপারটা গুছিয়ে বলতে গিয়ে আরও প্যাঁচ লাগিয়ে ফেললাম। ফলে মিতু আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে (সুয়েটারসহ)। ভার্জিনিয়ায় বিপদের বন্ধু তারেক ।

তাকে ফোন দিলাম। সে এসে সুয়েটার নিয়ে গেলো, তার বাসায় নাকি প্রচুর জায়গা। দুইদিন পর মাঝরাতে তারেকের ফোন, ভাইয়া সুয়েটার নিয়ে বাসায় একটু ঝামেলা হচ্ছে। আপনি কি নিয়ে যাবেন দয়া করে? আমি যথেষ্ট মেজাজ খারাপ করে বললাম, একটা সামান্য সুয়েটার বাসায় রাখতে পারিস না। তোর বাসায় কি জায়গার এতোই অভাব? আচ্ছা কাল সকালে দেখা যাবে। তারেক আরও বিনয়ী গলায় বললো, কাল সকালে নয়। আমি সুয়েটার নিয়ে এখনই আসছি। বোঝেনই তো, বাসায় অন্য এঙ্গেলে একটু ঝামেলা হচ্ছে। মাঝরাতে তারেক বাসায় এলো। চা খেলো এবং সুয়েটার রেখে গেলো। সকালবেলায় সেই সুয়েটার দেখে… যাই হোক ফাইনালি সেই সুয়েটার রাখা হলো কাউসারের বাসায়।

দুইদিন পর কাওসারের বউ ফোন দিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ভাইয়া… কাওসার কেমন যেন বদলে গেছে। আমি গলায় সাংঘাতিক সিরিয়াসনেস এনে বললাম, কী হয়েছে খুলে বলো তো। কাওয়ারের বউ গলা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো, ভাইয়া, ও খুব খারাপ কাজ করছে। আমি মরেও গেলেও সেটা আপনাকে বলতে পারবো না। আমি অভয় দিলাম। আহা বলোই না। আমি তো তোমার বড় ভাইয়ের মতো। বলো আপু বলো। সে গলা ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, ভাইয়া ও লেডিস সুয়েটার নিয়ে রাতবিরাতে বাড়ি ফেরে।

কাওসার সুয়েটার ফেরত দিয়ে গেছে। আমার এক ভক্ত থাকে ফ্লোরিডাতে। তার বাসার ঠিকানা দিয়ে রেখেছিলো… যাতে নতুন বই বাজারে এলে তাকে পাঠিয়ে দিই। বুদ্ধি করে তার ঠিকানায় সেই লেডিস সুয়েটার মেইল করে দিলাম। ওমা দুইদিন বাদেই সেই সুয়েটার ফিরতি ডাকে চলে এসেছে। মিতু বলছে, তোমরা দু’জন মিলে কি সুয়েটার সুয়েটার খেলছো? এটা কি কোনো সাংকেতিক খেলা? তোমরা পাইছোটা কি? আমি বড়ই বিপদে আছি! ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত