প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আইলান থেকে জায়ানঃ আমাদের দায়

ডঃ  শোয়েব সাঈদ : দুবছরের আইলান কুর্দির নিথর দেহটি তুরস্কের উপকূলে উগলে দিয়েছিল সাগরের লোনা জল মধ্যপ্রাচ্যের অকর্মা শাসকদের দুষ্কর্মের আর ইসলামের নামে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মর্মস্পশী ঘটনাগুলোর প্রতীক হিসেবে।

আট বছরের মায়াবী চেহারারবাংলাদেশী শিশু জায়ানের নিথর দেহটিও  ভারত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র  শ্রীলঙ্কা থেকে ফেরত এসেছে নিজ দেশে একই ধারায় আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে ধর্মের নামে কতটা বর্বর হতে পারে পরকালের প্রাপ্তির ভ্রান্ত নেশায় উন্মত্ত দানবরূপী কিছুমানব। আরবদের বেদুঈন সংস্কৃতির চিরাচরিত রুক্ষ চিত্র থেকে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংস্কৃতিটুকু তো একটু ভিন্ন মাত্রার হবার কথা অন্তত মানবিক চেতনাবোধে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বোমা হামলায় ধর্মের নামে মানবিক চেতনাবোধযেভাবে লাঞ্ছিত হয়েছে, এতে ধর্মের মানবিক আবেদনটুকু পরাস্ত হল উগ্রবাদী কাল্টভিত্তিক চিন্তা চেতনার কাছে। কাল্ট হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট ধর্ম থেকে উৎপন্ন উগ্রপন্থী উপদল বা ধর্ম ছাড়াই কোন গ্রুপের নামে বা নিজেদের দলনেতার নামে উগ্রপন্থীতৎপরতায় নিজেদের মতবাদকে নির্মম রক্তাক্ত পন্থায় প্রচার আর প্রসার করা। জাপানে পিএইচডি করার সময় দেখেছি ওম শিনরিকিউ নামের শোকো আসাহারার নেতৃত্বাধীন কাল্টটির আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের শহর মাতসুমোতোতে আক্রমণসহ টোকিওর পাতালরেলে সারিন গ্যাস দিয়ে মানুষ হত্যার নির্মমতা।

এর উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের মতবাদ আর উপস্থিতি জানান দেওয়া। জাপান সরকার কঠোর হাতে তাদের নিশ্চিহ্ন করেছে। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত এবং জনপ্রিয় ধর্মের মাঝেও কোন নির্দিষ্টগ্রুপের উগ্রপন্থা বাস্তবায়নে এই কাল্ট কার্যক্রমের দেখা মিলে। সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বে ইসলামিক ষ্টেট বলুন, তালেবান বলুন, বকোহারাম বলুন এরা সবাই ধর্মের নামে রাজনৈতিক এজেন্ডা নির্ভর এক একটি কাল্ট, এদের জঙ্গি ধারনাগুলোরপেছনে ভৌগলিক বা স্থানীয় গোত্রভিত্তিক খেলাফত চেতনা মূল চালিকা শক্তি হলেও ওদের রয়েছে আন্তর্জাতিক পৃষ্টপোষকতা।পশ্চিমা শক্তির সুযোগ সন্ধানী রাজনীতি/ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, ক্ষমতা, অর্থ আর সেই সাথে সালাফি আর ওহাবীর মত প্রবলক্ষমতাধর কট্টর মতবাদগুলো এদের বৈশ্বিক অবস্থানের জন্যে প্রেরণার উৎস। কিন্তু কাল্ট বলি আর জঙ্গি বলি, এদের তৎপরতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিয়ে আমরা আসলে কি জায়েজ করে চাচ্ছি, নিজেরাও তা জানি না। ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় প্রচলিত ধারায় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে যার ফলে ইসলামের মৌলিক চেতনা সহমর্মিতা আর মানবিকতা কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঝরছে শিশু আইলানরা, শিশু জায়ানরা, তুরস্কের সমুদ্র উপকুল থেকেভারত মহাসাগরের শ্রীলঙ্কায় আর ইয়েমেনে একদল হিংস্র মানবরূপী দানবের হাতে; প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।

প্রার্থনারত নিরীহ মানুষদের, মায়ের কোলে আশ্রিত শিশুকে, খেতে বসা পরিবারগুলোকে বোমার আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দানবীয় উন্মত্তায় হত্যাযজ্ঞের পেছনে যে পৈচাশিক মানসিকতা কাজ করে তাতো একদিনে তৈরি হয়নি। পরিবারেরদায়িত্বজ্ঞানহীনতা, ধর্মীয় পরিবেশের দায়, যারা ধর্মীয় নেতৃত্বে আছেন তাদের শিক্ষাদানে ত্রুটিগুলো এক একটি বিল্ডিং ব্লকের মত এই দানবদের তৈরি করছে। রেফারেন্সটি এখন মনে নেই, স্কুলে মিলাদুন্নবির রচনা লিখার জন্যে একটি বই পড়ছিলাম। একজন ধার্মিকের নিষ্ঠার সাথে কোরান তেলাওয়াতের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলা হচ্ছিল যে কোরান তেলাওয়াতের সময় উনার বাচ্চাটি বারবার কাঁদছিল। একপর্যায়ে তেলাওয়াতকারী রেগে গিয়ে স্ত্রীকে বললেন বাচ্চাটির মুখে কেরোসিন দিয়ে চুপ করিয়ে দিতে। ইবাদত করতে গিয়ে উনি নিজের বাচ্চাকেও ছাড় দিচ্ছেন না, এই ধার্মিকতা প্রচার করতে গিয়ে কতটা অধার্মিকতা প্রচার হল বইয়ের লেখকের কোনধারনাই নাই। ধর্মের নামে এরকম কুশিক্ষার সমাহার চারিদিকে। অথচ ইসলামের নবীর জীবনচরিত থেকে জানা যায়, সিজদায়রত অবস্থায় নাতি পিঠে ছড়েছিল বলে নাতি না নামা পর্যন্ত উনি সেজদারতই ছিলেন, যদি বাচ্চাটি ব্যথা পায়।

আমরা জেহাদের কথা বলি কিন্তু ব্যাখ্যা দেইনা এই জেহাদ কি নিজেকে শুদ্ধ করার জেহাদ, দুর্নীতি না করার জেহাদ না অন্য কিছু। মানুষ হত্যার শাস্তির কথা বলিনা, আমরা বলিনা নিরপরাধ একজনকে হত্যা করা মানে সমগ্র মানবতাকে হত্যা করা। “তোমারজন্যে তোমার ধর্ম, আমার জন্যে আমার ধর্ম” “ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না ইতিপূর্বে একারণে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে” কোরানের এই বানীগুলি নিয়ে ওয়াজ মাহফিল আমরা শুনি না, খালি শুনি ইহুদী, নাসারাদের ষড়যন্ত্রের কথা। কোন  ধর্মীয়নেতাকে দেখিনি ইয়েমেনের শিশুদের দুর্দশায় কথা বলতে, কলেরাক্রান্ত হাজার হাজার ইয়েমেনীয় শিশুর স্মরণকালের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নিয়ে প্রতিবাদ করতে। ইসলামের ইতিহাসে ১০ জন ছেলে আর ১০ জন মেয়েকে শিক্ষা দেবার বিনিময়েযুদ্ধবন্দীর মুক্তির কাহিনী আমরা শুনি না, আমরা কেবল শুনি মেয়েদের বেশী পড়ানো ভাল নয়।

কাবা শরীফে গিয়ে সেলফি তুলি, অথচ সেলফির মত প্রযুক্তি আবিস্কারের প্রজন্মকে তৈরি করিনা। ইহুদি নাসারাদের গোষ্ঠী উদ্ধার করি, তাদের তৈরিপ্রযুক্তি ব্যবহারে লজ্জা পাই না। অবৈধ টাকায় ধার্মিক সাজি, কিন্তু টাকা ত্যাগ করিনা। মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক আর ধর্মীয় নেতৃত্ব থেকে সাধারণ মানুষের বিরাট অংশ চিন্তা চেতনায় আর কার্যকরণে হিপোক্রেটিক। হিপক্রেসীর অপরনাম মুনাফেকী।মুনাফেকীর বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে যারা গলা শুকিয়ে ফেলছে, তারা নিজেরা কতটা মুনাফেক ভেবে দেখেছেন কি? আমরা অন্যের আচরণে কিয়ামতের লক্ষন দেখি, নিজের অনৈতিক আচরণে কোন বিকার নেই। প্রবাসেও দেখছি, উচ্চতর প্রযুক্তি আরজ্ঞান-বিজ্ঞানে নিজেদের তৈরি করার চাইতে, বিবাহ বার্ষিকী  হারাম, জন্ম বার্ষিকী হারাম এরকম নানা কিসিমের ফতোয়াতে ব্যস্ত মুসলিমদের একাংশ। এর  ফলে সমাজে আত্তীকরণ, শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার সক্ষমতা হারিয়ে একটা পশ্চাদপদ,মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন গোত্রে পরিণত হচ্ছে। মাল্টিকালচারিজমের মানে এই নয় নিজের কালচার কে ত্যাগ করা। মাল্টিকালচারিজমের হচ্ছে নিজের কালচারকে রক্ষা করে অন্য কালচারের সাথে অভিযোজিত হয়ে মিশে থাকা। অভিযোজনঅক্ষমতা আর চিন্তা চেতনায় বাড়াবাড়ি পশ্চাদপদতার নামান্তর।

আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে কিছু কিছু ওয়াজ শুনা যায়, একটি উগ্রবাদী সমাজ নির্মাণে এদের ভূমিকা রীতিমত লোমহর্ষক। গ্রামে গঞ্জে ধর্মের ছোটখাট বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি, অনুগত গ্রুপ সৃষ্টি সবই ধর্মের নামেনিজেদের কাল্ট সৃষ্টির পাঁয়তারা। এদের কাছে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রগতি, বৈশ্বিক পটভূমিতে মানবতা আর সভ্যতায় নিজেদের অভিযোজিত করে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবার মত বিষয়গুলি খুব তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ব্যাপার।

একজন ধার্মিক মানুষ, যিনি সারাজীবন সৎভাবে নিষ্ঠার সাথে, সৃষ্টিকর্তার কাছে সমর্পিত জীবন যাপন করেছে, আজকে উনাকে উগ্রবাদীতার ইমেজসঙ্কটে বিব্রতকর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কিছু উগ্রবাদীর দায় পুরো সমাজে চাপানো যায় না, কিন্তুউগ্রবাদী ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে অসংলগ্ন  কথাবার্তায় আর উগ্রতায় বিদ্বেষের পুষ্টি যারা যুগিয়ে যাচ্ছেন, তাদের থামানোর দায়  তো ধর্মীয় নেতৃত্বের, সমাজপতিদের আর রাষ্ট্রের। বিবাদরত মুসলিম দেশগুলোতে মসজিদে বোমা হামলা, মাজারেরবোমা হামলা, ধর্মীয় মিছিলে আক্রমণ, বাচ্চাদের স্কুলে গিয়ে নির্বিচারে গনহত্যার সংস্কৃতি তো চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। কি প্রতিবাদে, কি শিক্ষায়, এসন অনাচারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের নীরবতা বিশাল এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলিমসমাজের ভেতর থেকে প্রবল প্রতিরোধটা তৈরি না হলে কাল্টের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি নেই।

সন্ত্রাস দমনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে একটা কমিউনিটির সৎ এবং নিবেদিত ইনারভয়েজ।  বিডিনিউজ ২৪ এ প্রকাশিত আমার একটি লিখার আমি উগ্রবাদীতা নির্মূলে এন্টিবায়োটিক, প্রোবায়োটিক এবং প্রিবায়োটিক এপ্রোচের কথাবলেছিলাম। এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে ক্ষতিকর  অনুজীব বা  জীবাণুটাকে  মেরে ফেলা হয় ঠিকই কিন্তু তাতে অনেক উপকারী অণুজীবও মারা  যায় এবং একটা সময়ে ঐ এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে  জীবাণুটার  প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েএন্টিবায়োটিকের কর্মক্ষমতাই নষ্ট হয়ে  যায়।  প্রোবায়োটিক হচ্ছে উপকারী অনুজীব যাদের উপস্থিতিতে ক্ষতিকর অনুজীবের ক্ষতি করার ক্ষমতা কমে যায়। পেটের স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্যে  প্রোবায়োটিক খাওয়া হয় যাতে পেটের ভেতর উপকারী অনুজীবের  সংখ্যা বেড়ে গিয়ে এবং ক্ষতিকর অনুজীবের  সংখ্যা  কমে গিয়ে ক্ষতি করার ক্ষমতাটা সীমিত  হয়ে  সার্বিক স্বাস্থ্যটাকে  ভাল  রাখা যায়।

প্রিবায়োটিক হচ্ছে  একপ্রকার ইনগ্রেডিয়েনট বা রসদ  যা প্রোবায়োটিক বা উপকারী অনুজীবের জন্যেউপযুক্ত পরিবেশ  তৈরি করে   ব্যাপক বংশ বিস্তারে সাহায্য করে যাতে অবশেষে  ক্ষতিকর অনুজীব বা জীবাণুর  সংখ্যাটা কমে গিয়ে ক্ষতি করার  ক্ষমতাটাই প্রতিহত হয়ে যায়। মুসলিম কমিউনিটির এই ইনারভয়েজটাকে শক্তভাবে লালন করতে হবেআস্থা দিয়ে। সুশিক্ষিত, সহনশীল  আর  মডারেট মুসলিম  কমিউনিটি হচ্ছে প্রোবায়োটিকের মত যা নিজ থেকেই  দুষ্টক্ষতগুলোকে  প্রতিহত করতে সক্ষম। ধর্মীয় নেতারা প্রিবায়োটিকের মত প্রোবায়োটিকদের লালন করবে। মনে রাখতে হবেজঙ্গিবাদের উন্মাদনায়  সবদিক থেকেই বিশ্বের আনাচে কানাচে ইয়েমেন, সিরিয়া, পাকিস্থান, রোহিংগা সর্বত্রই সবচেয়ে বড় ভিকটিম মুসলিমরাই।

মুসলিম নেতৃবৃন্দকে নির্লজ্জতা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের রিফিউজিদের জন্যে মধ্যপ্রাচ্যের কোন মুসলিম দেশ দরজা খুলেনি, দরজা খুলেছে পশ্চিমারাই। নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে বিপদাপন্ন করে কানাডা আর জার্মানির নেতৃবৃন্দ যে উদারতা দেখালেন সেটি ভুলবেন কি করে? একটি নিরাপদ  দেশ নির্মাণের কমিটমেন্টে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কি অনুকরনীয় নয়? বোমাবাজি করে অর্জনটা কি? ঘৃণাই তো? যে ডেনিশ ধনকুবের হারালেন তাঁর তিন সন্তানকে, যে মার্কিনী হারালেন স্ত্রী সন্তানদের, যে শ্রীলঙ্কানরা মারা গেলেন বিনাদোষে তাঁদের অভিসম্পাত আর ঘৃণাকে উপেক্ষা করি কি করে?

পশ্চিমা বিশ্বে বসবাসরত মুসলিমরা কতটা কঠিন সময় পার করছে, ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়। নিজ কওম থেকে পরিত্যাক্ত হয়ে, যারা আশ্রয় দিল সেখানেও শাঁখেরকরাত। পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিমদের অবস্থানের বিরুদ্ধে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের হুমকির পাশাপাশি আশ্রয়প্রাপ্ত মুসলিমদের মধ্যে যে পাতে খায় সে পাত ফুটো করার মত সম্ভাব্য উগ্রবাদীদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় একটা ভঙ্কুর সময় গ্রাস করছে মুসলিমদের বিশ্বব্যাপী।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত