প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অকার্যকর হয়ে পড়ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

কালের কণ্ঠ : প্রতিষ্ঠার ছয় মাসের মধ্যেই আস্তে আস্তে অকার্যকর হয়ে পড়ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কারণ ফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে আর কতদূর এগোনো যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ফ্রন্টের সর্ববৃহৎ দল বিএনপির পাশাপাশি শরিক অন্য দলগুলোর মধ্যেও। দলগুলোর নেতাদের অভিযোগ, ড. কামাল ‘দ্বৈত ভূমিকা’ নিয়েছেন।

গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে গত বছরের ১৩ অক্টোবর গড়ে উঠেছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু প্রধান নেতা হয়েও গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় বিএনপির সিনিয়র নেতারা ইদানীং তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। সে কারণে তাঁরা এখন আর ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন না। ফলে জোটের গুরুত্ব কমতে শুরু করেছে দিন দিন।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে যোগদানকারী নেতা মো. মুকাব্বির খানকে নিয়ে ড. কামাল গতকাল শুক্রবার এক মঞ্চে বসে অনুষ্ঠান করায় ক্ষুব্ধ হয়েছে বিএনপিসহ ফ্রন্টের শরিক বিভিন্ন দল। শুধু তা-ই নয়, খোদ গণফোরামের মধ্যেই এ নিয়ে ‘বিদ্রোহ’ দেখা দিয়েছে। মুকাব্বির খানকে মঞ্চে দেখে পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলের প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পথিক। তিনি বলেছেন, ‘কামাল হোসেনের দ্বৈত নীতির কারণে আমি দল ছাড়লাম।’ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে গত ২ এপ্রিল শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন গণফোরাম নেতা মো. মুকাব্বির খান। তাঁকে বহিষ্কার করার বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি সিদ্ধান্ত নিলেও ড. কামাল হোসেনের নির্দেশনা না থাকায় তা বাস্তবায়িত করা যায়নি।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুকাব্বির খানকে কেউ ডাকেনি। সে নিজ থেকে এসেছে। এখন আমরা পারতাম তাকে বের করে দিতে। কিন্তু সেটি তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ মুকাব্বির খানকে ড. কামাল হোসেন অনুমতি দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘এটি তিনিই (কামাল) ভালো জানেন। তবে মুকাব্বিরকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গণফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে।’

মুকাব্বিরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গণফোরামের সাধারণ মোস্তফা মহসিন মন্টু গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুকাব্বিরের ঘটনায় জনগণের কাছে মাফ চাওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘মুকাব্বির খান সংসদে যোগদান করার পর থেকে আমরা তাঁকে বহিষ্কার করার জন্য দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে বলেছি। তিনিও জানেন যে গণফোরামের শতকরা ৯৫ ভাগ নেতাকর্মী তাঁকে বহিষ্কারের পক্ষে। অথচ শুক্রবার তাঁকে এক মঞ্চে বসিয়ে সভাপতি মিটিং করলেন। এটাকে দুঃখজনক ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে!’

একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ায় এমনিতেই কয়েক মাস ধরে ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে ফ্রন্টের শরিক অন্যান্য দলের মধ্যে সংশয় কাজ করছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল মুকাব্বির খানকে মঞ্চে বসতে দেওয়ায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে বিএনপি, জেএসডি এবং নাগরিক ঐক্য।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমদুর রহমান মান্না গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুকাব্বির খানের ঘটনায় আমি বিস্মিত হয়েছি। কারণ ড. কামাল হোসেন নাকি তাঁকে আগে গেট আউট বলে বের করে দিয়েছেন। এখন কী বুঝে আবার ডেকে পাশে বসালেন? এর তো হিসাব বোঝা মুশকিল!’

জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, ‘শরিক দল হিসেবে আমরা এত দিন শুনে আসছিলাম মুকাব্বির খানকে বহিষ্কার করা হবে। এখন তাঁকে পাশে বসিয়ে মিটিং করলে এটা তো ভালো কথা নয়। তা ছাড়া এটা জোটের রাজনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ জোটগতভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তো শপথ নেওয়ার বিপক্ষে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বহিষ্কারের বদলে মুকাব্বির খানকে নিয়ে মিটিং করার ঘটনা অনভিপ্রেত। কারণ জোটগতভাবে ঐক্যফন্টের অবস্থান শপথ নেওয়ার বিপক্ষে। এখন তাঁকে নিয়ে পাশে বসলে জনগণের মনে সন্দেহের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক যে আমাদের রাজনীতি আসলে কী!’ তিনি আরো বলেন, ‘এ জাতীয় দ্বৈতনীতির ঘটনা অব্যাহত থাকলে ফ্রন্টের রাজনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।’

বিএনপির নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিচিত আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন রাজনীতির গেম নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এ ঘটনা তিনি নির্বাচনে না যাওয়ার সময়ই বিএনপির কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন আস্তে আস্তে জনগণের সামনে আরো পরিষ্কার হবে।’

তবে মুকাব্বির খান ক্ষোভের সঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি চাকরি করি না যে কারো আমন্ত্রণে কাউন্সিলে যেতে হবে। ওই কাউন্সিলের অর্থবিষয়ক কমিটির আমি আহ্বায়ক। যাঁরা আমাকে নিয়ে কথা বলেন তাঁদের কোনো অধিকার নেই।’

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের আগে একটি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও ড. কামাল হোসেন নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হননি। সে ঘটনার সূত্র ধরে ওই বৈঠকে বাগিবতণ্ডার পর বিএনপির সিনিয়র দুই নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ জোটের বৈঠকে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। এদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ইদানীং পারতপক্ষে ফ্রন্টের বৈঠকে যাচ্ছেন না। এতে জোটের গুরুত্ব কমে গেছে।

তা ছাড়া আদর্শিক ও নীতিগত দিক দিয়েও বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে সম্প্রতি। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’ বলে সম্বোধন করছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ড. কামালের বক্তৃতার সময় ‘জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন’ এমন কথা বলার দাবি তোলেন বিএনপির উপস্থিত নেতাকর্মীরা। কিন্তু জিয়াউর রহমানের নাম ড. কামাল আগেও নিতেন না, এখনো নিচ্ছেন না। এতে বিএনপির বড় অংশ তাঁর ওপরে ক্ষুব্ধ। বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর মতে, পরস্পরবিরোধী এই রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বেশি দূর এগোনো যাবে না। আগে রাজনীতি ঠিক করতে হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত