প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘টুপি হেলমেটে’ ভয়ংকর ফাঁকি

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের পর মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে আছে ট্রাফিক পুলিশ। চালকের সঙ্গে যাত্রীরও হেলমেট না থাকলে মামলা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেল চালকরাও যাত্রা শুরুর সময় যাত্রীর জন্যও হেলমেট রাখছেন। তবে মামলা এড়াতে ব্যবহার করা যাত্রীর জন্য দেওয়া এ হেলমেট দুর্ঘটনা ঝুঁকি সামান্য মাত্রায়ও এড়াতে পারছে না। এ ধরনের ‘নামকা ওয়াস্তে’ দেওয়া হেলমেটের কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। সব শেষ গত বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাহমিদা হক লাবণ্য। তিনি উবারের মোটরসাইকেলে সেই ‘ছুতামিছা’ ধরনের হেলমেট পরেই যাচ্ছিলেন। হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় গত এক বছরে এমন হেলমেটধারী আরো ৩৩ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছে।

শহর ঘুরে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের টুপির মতোই পাতলা কম দামি হেলমেট যাত্রীদের দিয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিচ্ছেন চালকরা। মূলত নির্মাণ শ্রমিক এবং প্রকৌশলীরা এ ধরনের হেলমেট ব্যবহার করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের ফলে ৪০ শতাংশ আরোহীর নিহত হওয়া থেকে এবং ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আরোহীর মারাত্মক আহত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের হেলমেটে ওপর থেকে কোনো বস্তু পড়লে সুরক্ষা দিতে সক্ষম হলেও পাশ দিকে পড়ে গেলে মাথার কোনো নিরাপত্তা দিতে পারে না। মোটরসাইকেলে ব্যবহারের হেলমেটের গঠন এবং মান আলাদা। দেশে কোনো প্রতিষ্ঠান হেলমেটের এই মান যাচাই করছে না। বংশাল, বাংলামটরসহ বিভিন্ন এলাকার দোকানে দেদার বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন হেলমেট। পুলিশেরও এ ব্যাপারে নজর নেই।

গত বৃহস্পতিবার সকালে মিরপুর রোডে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লাবণ্যকে বহনকারী মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায় একটি কাভার্ড ভ্যান। ঘটনাস্থলের কিছুটা দূরে অনুরাগ রেস্টুরেন্টের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, যাত্রী লাবণ্যের মাথায় একটি হেলমেট ছিল। চালকের মাথায়ও একটি হেলমেট ছিল। লাবণ্যর সহপাঠী লাবিব সাদ ওয়াহিদ বলেন, ‘হালকা একটি হেলমেট ছিল। এটি পড়ে গিয়েই ভেঙে যায়।’ চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে লাবণ্যর খালাতো ভাই ফেরদৌস রাকিব বলেন, ‘মাথায় আঘাত লাগার কারণেই লাবণ্য মারা গেছে।’

লাবণ্যর সঙ্গে রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেলের চালক সুমন হোসেন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই পালিয়ে যান। গত বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ তাঁকে খুঁজে বের করে ফের সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছে। মোটরসাইকেল থেকে পড়ে তাঁর দুই পা ও মুখে জখম হয়েছে। হাসপাতালের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন সুমন কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্যামলী থেকে লাবণ্যকে নিয়ে তিনি খিলগাঁওয়ে যাচ্ছিলেন। সুমন উবার ও পাঠাও কম্পানির অ্যাপে রাইড শেয়ার করছেন গত ছয় মাস। মোটরসাইকেলে তোলার সময়ই লাবণ্যকে তিনি হালকা ধরনের হেলমেটটি দেন। আর নিজে পরেন ভারী (বাইকারদের উপযোগী) হেলমেট।

তিনি আরো বলেন, একজন পথচারীকে রাস্তা পার হতে দেখে তিনি মোটরসাইলের গতি কমান। পেছনে থাকা কাভার্ড ভ্যানটি গতি না কমিয়ে তাঁর মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। এতে সুমন ও লাবণ্য দুজনই পড়ে গেলে কাভার্ড ভ্যানের চাকা লাবণ্যর মাথার এক পাশে চাপা দিয়ে চলে যায়। লাবণ্যর হেলমেটটি ভেঙে গেলেও সুমনের হেলমেটটি ভাঙেনি।

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর রাতে মতিঝিলে ট্রাকচাপায় পাঠাওর মোটরসাইকেলের চালক রিপন সিকদার এবং তাঁর যাত্রী নবাবপুরের ইলেকট্রিক পণ্য ব্যবসায়ী জানে আলম গাজী নিহত হন। মতিঝিল থানার ওসি ওমর ফারুক তখন বলেছিলেন, মোটরসাইকেলটির সামনে থেকে ‘পাঠাও’ লেখা ভাঙা হেলমেট পাওয়া যায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, যাত্রী গাজীর মৃত্যু হয়েছিল মাথায় গুরুতর আঘাতে।

গত বছরের ৪ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে টেলিকম কম্পানির কর্মকর্তা নাজমুল হাসান ফুয়াদ পাঠাও রাইডে যাওয়ার পথে বিআরটিসি বাসের চাপায় নিহত হন। তাঁর মাথাও রাস্তায় পিষ্ট হয়েছিল।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম ওয়ারীর বাসা থেকে গুলশানের অফিসে যাতায়াতের জন্য রাইড শেয়ারের মোটারসাইকেলে নির্ভর করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো চালকই আজ পর্যন্ত ভালো হেলমেট দেয়নি। এরা যেটা দেয় সেটা তো ক্যাপ। এখন আমি চালকের সঙ্গে হেলমেট বদলে নিই। যারা আপত্তি করে তাদের রাইড বাতিল করে দিই।’

মোক্তার হোসেন রুবেল নামে এক মোটরসাইকেলের রাইডার বলেন, ‘আমি উবার, পাঠাও আর সহজ চালাই। তাই বাইরে থেকেই হেলমেট কিনে নিয়েছি। ৩০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়। এগুলো হারিয়ে যায়। আর কম দামি দিয়েই কাজ হয়। পুলিশ ধরে না, তাই কিনলাম।’ একই ধরনের বক্তব্য দেন কয়েকজন রাইডার।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে মোট ছয় লাখ ১৬ হাজার ৬৪১টি। গত বছরই হয়েছে এক লাখ চার হাজার ৫৪টি। সংশ্লিষ্টদের মতে, অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের কারণেই মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ছে। এখন ঢাকায় উবার মটো, পাঠাও, ওভাই, ওবোন, সহজ, স্যাম, চলো, ইজিয়ার, পিকমি, আমার বাইক, সহজ রাইডার্স, বাহন, আমার রাইড, ঢাকা রাইডার্স, ঢাকা মটোসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারের সুবিধা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য মতে, গত ১৫ বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ শতাংশ হয়েছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ৮৮ শতাংশেরই কোনো হেলমেট থাকে না। ২০১৭ সালে রাজধানীতে ৪৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৫৩ জন নিহত হয়। গত বছরের আট মাসে ৪২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৪৭ জনের প্রাণ যায়।

ইউনাইটেড ন্যাশনস ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপের (ইউএনইসিই) করা মোটরসাইকেলের হেলমেট সমীক্ষা শীর্ষক এক গবেষণার তথ্য বলছে, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারে মোটরবাইক দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা ৪২ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ২০২০ সালের মধ্যে নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহারের কারণে মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে এক লাখ ৬৩ হাজার থেকে দুই লাখ ১৪ হাজারে। আর শুধু সঠিক মানের হেলমেট ব্যবহার করেই বাঁচানো সম্ভব ৬৯ থেকে ৯০ হাজার আরোহীকে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ভালো মানের হেলমেট দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া থেকে ৪০ শতাংশ যাত্রী-চালককে রক্ষা করে, আর মারাত্মক আহত হওয়ার সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। এখন নামমাত্র হেলমেট ব্যবহারের কারণে হেলমেট ছাড়া যে ঝুঁকি থাকে সেই ঝুঁকিই থেকে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে পুলিশকে এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে যাঁরা এই অ্যাপভিত্তিক সার্ভিস পরিচালনা করেন তাঁদেরও যাত্রী ও চালকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা জানান, ভারতে মোটরসাইকেল আরোহীদের আইএসআই মানের হেলমেট পরতে হয়। ইউরোপীয় দেশগুলোয় ‘ইসিই’ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডট’ মানের হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। মোটরযান আইনে যাত্রীদের জন্য হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক হলেও সেটার মান কী হবে, তা নিয়ে কিছু বলা নেই। জননিরাপত্তার বিষয় থাকায় ২০১৮-২১ মেয়াদের আমদানি নীতিতে বন্দরে বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষার ৭৯টি পণ্যের একটি হচ্ছে হেলমেট। এ ছাড়া বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষার তালিকায় ১২০ নম্বর পণ্য হিসেবে আছে মোটরসাইকেল ও স্কুটারের চালক ও আরোহীর হেলমেট। তবে বাজারে কারা, কি ধরনের হেলমেট বিক্রি এবং ব্যবহার কারছে তা দেখছে না কেউ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম বলেন, ‘চালকরা হেলমেট হিসেবে যেটা দেয় সেটা তো হেলমেট না, একটা খেলনা। আমরাও বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছি। তবে এখনো আমরা পুরোপুরি কঠোর হইনি। হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা গেছে। এখন মান নিয়ে কথা বলা যাবে।’

হেলমেট নিয়ে বিতর্কের মুখে পাঠাও ও উবার কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছে, তাদের হেলমেটগুলো বেশ ভালো মানের।

তবে লাবণ্যকে দেওয়া নিম্নমানের হেলমেটের প্রসঙ্গ তুলে জানতে চাইলে উবারের (বেঞ্চ মার্ক) জনসংযোগ কর্মকর্তা এ এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কথা বলতে পারব না। আপনি ইমেইল করেন পরে অফিশিয়ালি বক্তব্য দেওয়া হবে।’
সূত্র : কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত