প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নীরবে উত্তরণের পথে প্রতিবন্ধী চলচ্চিত্র নির্মাতা জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী

কাজী নুসরাত শরমীন : ঝিনুক নিরবে সহো….ঝিনুক ক্ষরণ সয়ে সয়ে মুক্তো ফলায়, যিনি ঝিনুকের মতো নীরবে ক্ষরণ সয়ে সমাজ বিনির্মাণে অবদান রেখে চলেছেন, নিজে ঋদ্ধ হয়েছেন, দেশ তথা আমাদের সংস্কৃতিকে দেশের গ-ি ছাড়িয়ে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছেন, তিনি জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী।
লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সমাজকর্মী এমন বহুগুণে আলোকিত একজন। নিভৃতে কাজ করে চলেছেন স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে। আরও একটি বিশেষ পরিচয়, এনজিও ভয়েজ অ্যান্ড ভিউজের পরিচালক তিনি। কাজ করেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থাৎ সমাজে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে। তাদের অধিকার রক্ষা আন্দোলনের তিনি একজন সক্রিয় কর্মী। অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রতিবন্ধিত্ব বরণ করা জান্নাতুল দুঃস্বপ্নকে ভুলে জীবনে ফিরেছেন সাড়ম্বরে। একটু একটু করে পৌঁছে গেছেন কাক্সিক্ষত আলোর দিকে।

সম্প্রতি জান্নাতুল ফেরদৌস আইভীর প্রস্তাবনা,প্রযোজনা ও পরিচালনায় নাসরিন মুস্তাফার শিশুকিশোর উপযোগী গল্প ‘খিজির পুরের মেসি’ বাংলাদেশ সরকারের অনুদানের জন্য মনোনীত হয়েছে। এই গল্পকে বাস্তবের তুলিতে আঁকতে চান তিনি। এই গুণী মানুষটি অতিথি হয়ে এসেছেন আমাদের নতুন সময় কার্যালয়ে, নানা বিষয়ে কথা হয় তাঁর সাথে। আগুনে পোড়া চেহারাটা মেনে নিতে সময় লেগেছে। চেহারার বিকৃতি সহ্য করতে পারবেন না বলে ছবি তোলেননি, আয়না দেখেননি বহুদিন। বই আর সিনেমায় আবদ্ধ রেখেছেন নিজেকে। সিনেমার চরিত্রগুলোই তার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠতো, তাদেরকে ফ্রেম ভেঙে নিজের কল্পনার মিশেলে নতুন নতুন চরিত্র সৃষ্টি করতেন মনে মনে।

হরেক রকম প্রতিবাদী চরিত্র। প্রতিবাদটা যে জীবন থেকে নেয়া! তাঁর চলচ্চিত্র জীবন্ত না হয়ে উপায় আছে? এরপর জান্নাতুল চলচ্চিত্র বানালেন, অভিনয়ের জন্য অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রতিবন্ধী কাউকে খুঁজছিলেন, সাড়া পাওয়া গেলো না। অগত্যা নিজেই দাঁড়ালেন ক্যামেরার সামনে। সেন্সর বোর্ড থেকে অনুমোদনপ্রাপ্ত ‘নীরবে’ তৈরিতে খরচ হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ টাকা। পুরো টাকাটাই তাঁর নিজের। স্টোরি, স্ক্রিপ্ট, পরিচালনা সবই তাঁর। নিজেই অভিনয় করলেন, সঙ্গে নিলেন একঝাঁক প্রথিতযশা শিল্পী।

‘নীরবে’ চলচ্চিত্রটি প্রথম ২০১৩ সালে ফিনল্যান্ডে, ২০১৪ সালে আমেরিকার উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট এ, ২০১৬ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে, এরপর ২০১৭ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে। সেখানে বেশ সুনামও কুড়িয়েছে। ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনীতেও দেখানো হয়েছে চলচ্চিত্রটি। আনুষ্ঠানিকভাবে বড় আর্টিস্টদের নিয়ে জান্নাতুলের প্রথম কাজ ‘নীরবে’। তবে তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘উত্তরণ’। চারজন প্রতিবন্ধী অর্থাৎ বিশেষভাব সক্ষম মানুষের জীবনের গল্প ‘উত্তরণ’।

১৯৯৭ সালে রান্না করতে গিয়ে অগ্নিদুর্ঘটনায় শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে যায় জান্নাতুলের । ৫০টি অস্ত্রোপচারের পর নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে তিনি আজকের জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী।

বন্ধ্যা সময়কে পাশ কাটাতে লেখাপড়াকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। কিছুটা সুস্থ হবার পর পরিবারের উৎসাহ আর মায়ের সহযোগিতায় অনিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেন। মানবাধিকার সংস্থায় চাকরির পাশাপাশি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে মাস্টার্স করেন, এলএলবি ও সোশ্যাল কমপ্লায়েন্সে ডিপ্লোমা করেন। চলচ্চিত্র বিষয়ে অনেক শর্টকোর্স করেন, হতে চান চলচ্চিত্র বোদ্ধা। জীবনে দারুণভাবে সক্ষম প্রতিবন্ধী চলচ্চিত্রকার জান্নাতুল মনে করেন, ঘরে আর বাইরে সর্বত্র নারীর জন্য থাকবে সমান অধিকার। এই আশা থেকেই পেশাগত ক্ষেত্র ছাড়িয়ে চলচ্চিত্র তৈরির মাধ্যমে তুলে ধরেন কর্মজীবী নারীর একান্ত কথা, তাদের ত্যাগ আর ক্ষরণের মর্মস্পর্শী গল্প।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে (২০১৮-২০১৯) অর্থ বছরের জন্য অনুদান ঘোষণা করেছে সরকার।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের জন্য পাঁচজনকে দেয়া হচ্ছে অনুদান। সে তালিকার প্রথম চলচ্চিত্রটিই জান্নাতুল ফেরদৌস আইভীর ‘খিজির পুরের মেসি’। ছবির প্রযোজক এবং পরিচালক দুটোই তিনি।

জান্নাতুল বলেন, আমি ডিজ্যাবিলিটিকে একসেপ্ট করে খুশি, যা আমাকে জীবনের লড়াইটা বোঝার শক্তি যুগিয়েছে। আমি নিজের পরিচয়ের সব শব্দ জেনে একজন নারী হিসেবে, একজন প্রতিবন্ধী নারী চলচ্চিত্রকার হিসেবে এখন নিজের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি নারীকেন্দ্রিক গল্পের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাই। আর সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র থাকবে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করার মধ্যে দিয়েই আমি বুঝেছিলাম, একটা ছেলে যদি পুড়ে যায় তবে এই কথা কেউ বলে না ‘তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা ভালো’। আমি মেয়ে বলেই এই কথাটা একজন আমার আম্মাকে বলতে পেরেছিলেন কত সাবলীলভাবে। এ কারণেই নারীর চরিত্রকে প্রধান করে আমি উপন্যাস লিখি। ফিল্ম বানাই। যারা পুড়ে গিয়ে অসুন্দর অথবা প্রতিবন্ধী হবার পরেও হতে পারে নায়িকা, আমি এই স্বপ্ন দেখি।

জান্নাতুলের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে। তাঁরা দুই বোন, এক ভাই। সবাই প্রতিষ্ঠিত। তিনি পরিবারের বড়। বাবা মারা গেছেন। মা-ই হচ্ছেন জান্নাতুলের আদর্শ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত