প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ছয় বছর, সুবিচার পেতে আর কত অপেক্ষা?

তাসমিয়াহ আহমেদ : ছয় বছর আগে বাংলাদেশে যখন আটতলা একটি ভবন ধসে পড়লো, ১১৩৮ জন পোশাক শ্রমিক মারা গেল, আতংক আর অসহায়ত্ব নিয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া পুরো বিশ্বের আর কিছু করার ছিল না। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে এই শ্রমিকদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভবনটিতে ঢোকানো হয়। অথচ ভবনটির দুরবস্থা নিয়ে তারা আগের দিনই জানিয়েছিল, বলেছিল- তারা ভবনে ফাটল তৈরির শব্দ শুনেছে। শেষ পর্যন্ত সেই ভবনটিই তাদের উপর ধসে পড়েছিল।

সেই রানা প্লাজা ভেঙে পড়ার পর ছয় বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু সুবিচারের জন্য  ক্ষতিগ্রস্থদের অপেক্ষার শেষ হয়নি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে দু’টি মামলা হয়েছিল- তা এখনো শুরুই হতে পারেনি। ২০১৫ সালে সিআইড দু’টি চার্জশিট দাখিল করে। এর একটি ছিল হত্যাকাণ্ডের এবং অপরটি ছিল বিল্ডিং কোড ভঙ্গের। ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ মোট ৪২ জন ছিল আসামী। অভিযুক্তদের মধ্যে কেবল ভবনমালিক সোহেল রানাই এখন কারাগারে। এছাড়া ৩২ জন জামিনে, ছয়জন পলাতক, আর দুজন এরই মধ্যে মারা গেছেন। সোহেল রানা, তার বাবা মা- আবদুল খালেক ও মর্জিনা বেগম এবং অপর ৩৪ জনের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্য চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে- তারা সোহেল রানাকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিল।

এতকিছুর পর এ বছর মাহমুদুল হাসান হৃদয় নামে একজন শ্রমিক, যিনি রানা প্লাজার ওই ঘটনায় আহত হয়েছিলেন, ক্ষতিপূরণ ও পুণর্বাসনের দাবিতে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত আরো অনেকে একই দাবিতে হৃদয়ের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেন। হৃদয়ের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেকের জন্য ৪৮ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ, আহতদের পুণর্বাসন, আহতদের জীবনভর চিকিৎসাব্যয়, যারা বেঁচে আছেন তাদের চাকরির ব্যবস্থা করা, ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস হিসাবে ঘোষণা, ক্ষতিগ্রস্থদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় দেয়া, ইত্যাদি।

বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে বা কর্মসংশ্লিষ্ট ঘটনায় কোন শ্রমিক আহত হলে বা মারা গেলে মালিক বা সংশ্লিষ্টরা তাকে ক্ষতিপূরণ দেবেন। এই ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যই মালিকরা সাধারণত শ্রমিকদের জন্য বীমা করে থাকে। কাজ করতে গেয়ে কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে তিনিও ক্ষতিপূরণের আওতায় থাকবেন। এই ক্ষতিপূরণের মধ্যে অর্থ প্রদানের বিষয়টি যেমন রয়েছে, তেমনি থাকে চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের বিষয়টিও। এমনকি শ্রমিকের ক্ষতিটি যদি তার নিজের কারণেও হয়ে থাকে, তাহলেও তিনি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য হবেন। এই যে ক্ষতিপূরণ, এটা দেয়ার কথা কারখানা মালিকের। কেবল তাই নয়, আইন আনুযায়ী এই ক্ষতিপূরণ মালিক দেবেন দুর্ঘটনার তিন দিনের মধ্যে।

আইনে অবশ্য আহত হয়ে পঙ্গুত্বের শ্রেণীবিভাগ করে দেয়া হয়েছে। তবে মাত্রগত পার্থক্য থাকলেও সকল ক্ষেত্রেই ক্ষতিপূরণ দেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু রানা প্লাজার ক্ষেত্রে আমরা কি দেখলাম? ছয় বছর হয়ে গেছে, কিন্তু নিহতের পরিবার কিংবা আহতরা কেউই তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পায়নি। আর বিপরীত দিকে অপরাধী বা দায়ী ব্যক্তিদের কাউকেই দেয়া সম্ভব হয়নি কোন সাজা। এসব কারণেই এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সুবিচারের একটা সম্ভাবনা তৈরি হতেও ছয় বছর কি যথেষ্ট সময় নয়? রানা প্লাজার হতভাগ্যদের আর কতদিন দুর্ভোগ পোহাতে হবে, আর কত অপেক্ষা করতে হবে?

 (লেখক- নির্বাহী সম্পাদক, ডেইলি আওয়ার টাইম)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত