প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শ্রীলঙ্কার হামলা, ঘৃণার নৃশংস রূপ

কাকন রেজা

প্রচ- জ্বর নিয়ে দেখছিলাম, শুনছিলাম এবং পড়ছিলাম শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার খবর। মাথা কাজ করছিলো না তবুও সামাজিকমাধ্যমে ছোট করে প্রতিবাদ জানিয়ে লিখলাম, ‘এদের কে বোঝাবে, মানুষ মেরে মানুষের মঙ্গল করার চিন্তা উন্মাদের।’ ঘৃণার চর্চা যারা করে তারা ঘৃণ্য। এই যে, তিনশর উপর মানুষ প্রাণ হারালো, এর পেছনের যুক্তিটা কী? নিরীহ মানুষ হত্যার পেছনে কোনো যুক্তি থাকতে পারে না, সে যেই হোক। শুধু সাইকো ছাড়া এর পেছনে আর কেউ যুক্তি দাঁড় করাতে পারে না। ঘৃণার বিপরীতে ঘৃণা ছড়ানো বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষের কাজ নয়।

শ্রীলঙ্কা সরকারকে এ ক্ষেত্রে ধন্যবাদ জানাতে হয়। তারা সবরকম চেষ্টা করেছে, যাতে ঘৃণা না ছড়ায়। তারা নিজ থেকে বলেনি কারা এই কাজ করেছে। আটককৃত সন্দেহভাজনদের নামও জানায়নি তারা। তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিলো ঘৃণার বিপরীতে ঘৃণা না ছড়ানোর। শ্রীলঙ্কা যখন এমন অবস্থানে তখন অন্তত দুটি দেশ ও তাদের গণমাধ্যমের চেষ্টা ছিলো বিষয়টির সাথে জড়িতদের পরিচয় প্রকাশের। মূলত চেষ্টা ছিলো কা-টি মুসলিমদেরই এমনটা জানানো। তা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কা সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে যাতে ঘৃণা না ছড়ায়। তারপরেও শেষ রক্ষা হয়নি। অন্তত একটি মসজিদে পেট্রোল বোমা হামলা হয়েছে, একটি এলাকায় জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে মুসলিমদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি। অর্থাৎ ঘৃণার বিপরীতে ঘৃণার সূত্রে আক্রান্ত হয়েছে নিরীহরাই।

আমাদের দেশেও দেখলাম অনেকে বলছেন, শ্রীলঙ্কার হামলা নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চ মসজিদে হামলার প্রতিশোধ প্রতিক্রিয়া। অথচ ক্রাইস্ট চার্চ হামলার সাথে জড়িত ছিলো হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টরা। তাদের প্রথম কথা ছিলো, সাদারা শ্রেষ্ঠ। অন্য দুটির কথার মধ্যে ছিলো সাদা খ্রিস্টানরা শ্রেষ্ঠ এবং সাদা খ্রিস্টানদেরই ইউরোপে থাকার অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ ইউরোপে থাকার অধিকার কালো বা বাদামি খ্রিস্টানদেরও নেই। অভিবাসীদের প্রতি তাদের দারুণ ঘৃণা। এই ঘৃণার ব্যাপকতা ধর্মের গ-ি পেড়িয়ে আরো অনেক দূর। সুতরাং সেই হামলার প্রতিশোধ নিতে শ্রীলঙ্কার কালো খ্রিস্টানদের কেন বেছে নেয়া হবে, এটা একটা বড় প্রশ্ন। অনেকে বলতে পারেন, নিহতদের মধ্যে বিদেশিরাও রয়েছেন। মুসলিমরাও তো রয়েছেন। আমাদের দেশের আওয়ামী লীগ নেতা শেখ সেলিমের নাতি, নিষ্পাপ শিশু জায়ানও তো রয়েছে।

প্রশ্ন আরো আছে। যেমন, শ্রীলঙ্কায় মুসলমানদের সাথে খ্রিস্টানদের কোনো বৈরি সম্পর্ক নেই। বরং তারা আক্রান্ত হয়েছে কিছুদিন আগেও সিংহলি বৌদ্ধদের দ্বারা। বিপরীতে বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুরের ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিশোধ পরায়নতার কথা যদি উঠেই, তবে এমন ঘটনা বৌদ্ধদের সাথেও ঘটতে পারতো। তার উপর রয়েছে বৌদ্ধদের হাতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্যাতনের চলমান ঘটনা। সুতরাং কাছের ঘটনা রেখে দূরের ঘটনার প্রতিশোধের বিষয়টি যুক্তির ধোপে কতোটা টিকে তাও ভেবে দেখা উচিত। আরো কিছু প্রশ্ন রয়েছে, যার আলোচনা খটকা আরো বাড়িয়ে তোলে। দায়িত্ব স্বীকার করা এনটিজে তথা ন্যাশনাল মুসলিম জামাত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, রয়েছে তাদের সক্ষমতার বিষয়টিও। মূলত নানা প্রশ্নের ঘেরাজালে এখনো রহস্যাবৃত পুরো ঘটনাটি। তবে রহস্য যাই থাক, ঘৃণার যে বিস্তৃতি ঘটছে, তা রুখতে হবে মানবিক মানুষদেরই। এই যে, একটি ঘটনার সূত্র ধরে আরেকটি ঘটনা, এমন ধারাবাহিকতা ক্রমেই মানবিক মানুষদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলবে। সুতরাং একে থামাতে হবে। মানুষ পরিচয়ে বাঁচতে হলে দানবদের রুখে দেয়ার কোনো বিকল্প নাই।   পুনশ্চ : এই যে দানবদের কথা বললাম, এরাই কী সব কিছুর মূলে? অনেকে এদের বলেন ক্রীড়নক। সাথে বলেন, এদের পেছনের কুশীলবদের চিহ্নিত করা বেশি প্রয়োজন।  লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত