প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দিন যাচ্ছে, বাড়ছে সংকট

নিউজ ডেস্ক : ‘উপুড় হওয়া যাবে না, একনাগাড়ে বেশিক্ষণ বসে থাকাও যাবে না, হাঁটতে হবে খুব ধীরে।’ ভয়াবহতম রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে মেরুদণ্ড ভাঙা ফ্যান্টম টেক কারখানার শ্রমিক জেসমিনের জন্য চিকিৎসকদের সর্বশেষ ব্যবস্থাপত্র এটি। কিন্তু এই ব্যবস্থাপত্র মানলে জীবন চলে না। তিনি বলেন, ‘ভাই রে, এক সপ্তাহ আগেও ডাক্তারের কাছে গেছিলাম। ডাক্তারের সোজাকথা, যেসব নিয়মকানুন দিয়েছেন, তা মানতে হবে। কিন্তু দোকানে সারাদিন তো নিজেরই বসে থাকতে হয়। একমাত্র মেয়ে স্কুলে পড়ে। স্বামী মারা গেছে রোড অ্যাক্সিডেন্টে। দোকানে বসার তো আর কেউ নাই। এখন ডাক্তারের কথা মাইন্যা চললে জীবন তো চলব না।’ রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় আহতদের প্রায় সবার অবস্থাই এখন জেসমিনের মতো। পারুল, নিলুফা, হালিমা, সাদ্দামসহ কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হলো। প্রত্যেকেই বললেন একই ধরনের গল্প। বিশেষ করে যত দিন যাচ্ছে, তত বেশি শরীর অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু যে ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, তা-ও নেওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের নেই।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহতদের নিয়ে একটি সমিতি গঠন করা হয়েছে। এই সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন  জানান, রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর যত দিন যাচ্ছে, ততই আহতদের কথা সবাই ভুলে যাচ্ছে। শরীর আগের চেয়ে খারাপ হওয়ার কারণে বেশির ভাগই বেকার হয়ে পড়েছেন। গত এক থেকে দেড় বছরে সাভার এলাকা এবং আশপাশের গ্রামগুলোতে থাকা শ্রমিকদের বেশির ভাগই চলে গেছেন নিজের গ্রামের বাড়িতে। সাদ্দাম হোসেনের বক্তব্যের সত্যতা উঠে এলো চলতি মাসেই প্রকাশিত উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা অ্যাকশনএইডের সর্বশেষ গবেষণায়। এ গবেষণা অনুযায়ী, রানা প্লাজার আহত শ্রমিকদের বেকারত্বের হার বাড়ছে। বর্তমানে এই হার ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ ২০১৬ সালে এই হার ছিল ৪২ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে ছিল ৪৮ শতাংশ। আগের চেয়ে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে ২০ শতাংশ শ্রমিকের।

জেসমিনের বাঁচার লড়াই :২০০৯ সালে জীবনে প্রথম বড় দুঃসংবাদটি শুনেছিলেন জেসমিন। তার স্বামী জাহিদ সাভার এলাকাতেই মহাসড়কে বাস দুর্ঘটনায় নিহত হন। এরপর একমাত্র শিশুসন্তান জারিনকে নিয়ে তার বাঁচার লড়াই। চাকরি নেন রানা প্লাজার চারতলায় অবস্থিত ফ্যান্টম টেক গার্মেন্ট কারখানায়। মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর জীবনে ঘুরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শিকার হলেন জেসমিন নিজেই। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতর কংক্রিটের চাঁইয়ের মধ্যে ৪৮ ঘণ্টা চাপা পড়ে থাকার পর তাকে উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা। প্রথমে সাভার সিএমএইচ এবং পরে ঢাকা সিএমএইচে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। চিকিৎসকরা হাড়ের মধ্যে রড বসিয়ে দেন। সেই রড নিয়েই এখন কিছুটা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন, পুরোপুরি দাঁড়াতে পারেন না এখনও।

জেসমিন জানান, এখনও মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড মাথাব্যথা করে। শরীর অবশ লাগে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের পক্ষ থেকে চিকিৎসার ব্যাপারে মাঝেমধ্যে খোঁজ নেওয়া হয়। ব্র্যাকের তত্ত্বাবধানেই এক সপ্তাহ আগে এনাম মেডিকেলে ডাক্তার দেখিয়েছেন। ডাক্তার আবারও বলে দিয়েছেন, একটানা বেশিক্ষণ বসে থাকা যাবে না; উপুড় হওয়া যাবে না এবং ভারী জিনিস তোলা যাবে না। হাঁটতে হবে ধীর পায়ে। কিন্তু একা মানুষ জেসমিনের পক্ষে ডাক্তারের এই ব্যবস্থাপত্র মেনে চলা সম্ভব কীভাবে?

সাভারের সবুজবাগ এলাকায় একটা ছোট্ট মুদির দোকান জেসমিনের। জীবন-জীবিকা সবকিছু এখন এই দোকানকে ঘিরেই। রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির পর সব মিলিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকার মতো সহায়তা পেয়েছিলেন। সেই টাকায় এই দোকান। এখন এই দোকান তাকে একাই চালাতে হয়। দোকানে মালপত্র তারই নিয়ে আসতে হয়। দোকানে সেগুলো সাজিয়ে রাখতে হয়, ক্রেতা চাইলে ওজন করে দিতে হয়। সারাদিন দোকানে বসেও থাকতে হয় তাকেই। তিনি জীবনে প্রচণ্ড কষ্ট করেও একমাত্র মেয়ে জারিনের লেখাপড়ার ব্যাপারে সচেতন। ‘মেয়েটা এবার ক্লাস এইটে। ওরে দোকানের কাজে রাখি না। লেখাপড়াটা ভালো করে করুক। ওই তো আশা-ভরসা।’ ছলছল চোখে জানালেন জেসমিন।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক মাঝেমধ্যে খোঁজ নিলেও সরকারি তরফে কোনো খোঁজই নেওয়া হয় না বলে জানালেন জেসমিন। বিশেষ করে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে সরকার এবং বিজিএমইএর পক্ষ থেকে যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তা বিন্দুমাত্রও পূরণ করা হয়নি। জেসমিন জানান, তার বেতন ছিল প্রায় ১০ হাজার টাকা। যদি পাঁচ বছর হিসাব করেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হতো, তাহলেও তিনি ছয় লাখ টাকা পেতেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ না দিয়ে রানা প্লাজার আহত শ্রমিকদের ঠকানো হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

মাঝেমধ্যে কিছুই মনে থাকে না পারুলের :রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টম টেক লিমিটেড কারখানার সুইং অপারেটর ছিলেন পারুল আক্তার। ভবন ধসের সময় দৌড়ে বাঁচার চেষ্টা করেন তিনি। এরপর কী হয়েছে, আর কিছুই বলতে পারেন না।

ছয় বছরেও সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি তিনি। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পাওয়া পারুল জানালেন, এখনও হঠাৎ করেই প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হয়। স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ায় কিছুই মনে থাকে না তার। মাথা এবং মেরুদণ্ডের ব্যথার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ খেয়েও এ অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।

সর্বশেষ তার কিডনিতে পাথর ধরা পড়ে। পরে কিডনির অপারেশন করেন তিনি। প্রায় ছয় মাস আগে এই অপারেশনের পর থেকেই মাথাব্যথা আর শরীর দুর্বলতার কারণে আর কোনো কাজ করতে পারেন না পারুল। এখন ছুটে বেড়াচ্ছেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে। শেষ যেটুকু সম্বল, তা-ও প্রায় শেষের পথে চিকিৎসার ব্যয়ে। পারুলের স্বামী মো. ইয়াছিনও রানা প্লাজায় কাজ করতেন। ঘটনার দিন তার কানের পর্দা ফেটে যায় এবং তিনিও মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পর এখন উঠে দাঁড়িয়েছেন। একটা পোশাক কারখানায় নিরাপত্তাকর্মীর কাজ নিয়েছেন। এ কাজের আয় দিয়েই চলছে তার সংসার। পারুল জানান, মাত্র ৪৫ হাজার টাকা ছাড়া আর কোনো অনুদান তিনি কিংবা তার স্বামী পাননি।

একই ধরনের গল্প নিলুফার বেগম ও হালিমা বেগমের। তারা দু’জনও জানান, দিন দিন শরীর আরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কাজ করার শক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে। সামনে একেবারে অনিশ্চিত অবস্থা। তারপরও তারা বাঁচতে চান। যদি তাদের ক্ষতিপূরণ বাবদ এককালীন একটা অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার পূরণ করা হতো, তাহলে তারা আবার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পেতেন।

আহত শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন আরও জানান, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে তার ডান হাত কব্জি পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছে। ডান পায়ে অস্ত্রোপচারের কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারেন না। ছোটখাটো সাপ্লায়ারের কাজ করে কোনোরকমে জীবন পার করছেন। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আগে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নও আর পূরণ হয়নি তার। এখন চাওয়া একটাই- হতভাগ্যদের নূ্যনতম বেঁচে থাকার জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণটা দেওয়া হোক।

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ভবন ধসের ছয় বছর পরও হতভাগা শ্রমিকদের এখনও ক্ষতিপূরণের দাবি জানাতে হচ্ছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। অবিলম্বে সরকার এবং বিজিএমইএর পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা উচিত। সেইসঙ্গে ভবন ধসের ঘটনায় প্রধান আসামি ভবন মালিক সোহেল রানাসহ সব দোষীকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের দাবি জানান তিনি।

রানা প্লাজার সেই জমি এখন পরিত্যক্ত ডোবা :সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, রানা প্লাজার সেই পরিত্যক্ত জমির পাশে রয়েছে কয়েকটি দোকান। স্থানীয়রা জানান, এসব দোকানে রেন্ট-এ-কারের ব্যবসা চলে। এ ছাড়া ছোটখাটো পান-বিড়ির দোকানও আছে। আর সামনে ডোবায় চলে কৈ মাছ চাষ। তবে প্রতিবছর এপ্রিলের ১০ তারিখের আগেই রানা প্লাজার সামনের অংশ থেকে দোকান সরিয়ে নেওয়া হয়, এবারও সরানো হয়েছে। পাশের দোকানগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে। এপ্রিল মাস শেষ হলে আবার দোকান বসে যাবে যথারীতি।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর সরকারের একাধিক মন্ত্রীর ঘোষণা ছিল, রানা প্লাজার জমি দুর্ঘটনায় হতাহত শ্রমিকদের কল্যাণে কাজে লাগানো হবে। কিন্তু সেই উদ্যোগ থমকে আছে।

সূত্র : সমকাল।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত