প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ছুঁয়ে কান্নার রং

সালেহ্ বিপ্লব : আট বছরের জায়ান যখন ঘাতকের জিঘাংসায় চলে গেছে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন ব্রুনেই দারুসসালামে, রাষ্ট্রীয় সফরে। সেখানে বসেই দুঃসংবাদটি পান তিনি, কিন্তু দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলার সুযোগ করে উঠতে পারেননি। রাষ্ট্রনায়ক তিনি, রাষ্ট্রাচারে ব্যক্তিগত সুখদুঃখের ভাব প্রকাশের নিয়ম নেই। একের এর পর এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যখন যোগ দিয়েছেন, অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রাখতে বাধ্য হয়েছেন। শ্রীলংকার নারকীয় হত্যাকাণ্ডে শোক প্রকাশ করেছেন ব্রুনেইর সুলতান ও অন্য নেতাদের কাতারের দাঁড়িয়ে। জায়ানের মতো অসংখ্য শিশুসহ নিহত মানুষগুলোর জন্যে ব্যথিত হয়েছেন। আদরের নাতি জায়ানের জন্যে অশ্রুপাতের বাস্তবতা সেখানে ছিলো না।

দিনশেষে শেখ হাসিনা যখন একা হয়েছেন হোটেল কক্ষে, নিশ্চয়ই কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠেছে তার শরীর। অব্যক্ত যন্ত্রণায় বুক ফেটে গেছে, বারবার চোখে ভেসে উঠেছে জায়ানের আদরকাড়া মুখটি। হায়রে জায়ান! আদরের নাতি!

সফর শেষে দেশে ফেরার জন্যে যখন বিমানে চড়েছেন, সেই ক্ষণটুকু থেকে রাষ্ট্রনায়কের খোলস থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ মেলে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই সময়টা প্রধানমন্ত্রীর অত্যাবশ্যকীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া আর কেউ পারতপক্ষে তার কাছে ঘেঁষেননি। খুব জরুরি না হলে কথা বলে তার শোকবিহŸল নীরবতাকে ভঙ্গ করেননি কেউই। তার নীরবতা ছিলো অশ্রæসজল, পুরোটা পথ তার মন জুড়ে ছিলো জায়ান, ক্ষতবিক্ষত অন্তরের তীব্র যন্ত্রণা তাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে পুরোটা যাত্রাপথ।

আহারে জায়ান। সেই প্রিয় নাতি। দেখা হলেই দাদু বলে ছুটে যেতো শেখ হাসিনার কাছে, ছোট দু’হাতে জড়িয়ে ধরতো খুব প্রিয় দাদীকে। আদরের নাতির জন্যে রাষ্ট্রের প্রটোকলে কোনো বাধা নেই, সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো প্রতিরোধ নেই। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও মমতাময়ী মায়ের চিরন্তন রূপ তার অলংকার। পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে নিতেন জায়ানকে। ফুপাতো ভাই শেখ সেলিমের মেয়ের ঘরের নাতি জায়ান শেখ হাসিনার খুব খুব প্রিয় ছিলো। শান্তশিষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত শিশু জায়ান খুব মিষ্টি স্বরে কোরআন তেলাওয়াত করতো। শেখ হাসিনা খুব পছন্দ করতেন। জায়ানের বাবাও গুরুতর আহত। দু’সপ্তাহের আগে তাকে দেশে আনা সম্ভব না। জায়ানের মরদেহ আসবে বুধবার। সব তথ্যই জানেন প্রধানমন্ত্রী।

এও জানেন, বনানীতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের শহীদ সদস্যদের পাশে দাফন করা হবে জায়ানকে। কিন্তু একটা বিষয় তখনো জানতেন না শেখ হাসিনা, জানতেন না কী করে মুখোমুখি হবেন ভাই শেখ সেলিমের। দৌহিত্র হারানো ভাইটিকে কী বলে সান্ত¡না দেবেন, জানা ছিলো না বোনটির। যন্ত্রণায় জ্বলতে জ্বলতে দেশে এসে পৌঁছলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দূর থেকেই দেখলেন ভাই শেখ সেলিম দাঁড়িয়ে আছেন ভিভিআইপি লাউঞ্জে, বোনের অপেক্ষায়। কিছুক্ষণ পর মুখোমুখি হলেন ভাইবোন। কারো মুখে কোনো কথা নেই। দু’হাত রাখলেন ভাইয়ের কাঁধে। দুচার কথায় প্রধানমন্ত্রীকে কিছু জানালেন শেখ সেলিম। শোকবিহ্বল বোন চোখের জল মুছলেন। বোনের কান্না দেখে ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণের বাঁধ ভেঙ্গে পড়লো। হু হু করে কেঁদে ফেললেন শেখ সেলিম।

পাবলিক প্লেসে ভিভিআইপিদের আবেগ লুকিয়ে রাখার নিয়ম, আর তা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ সেলিম দু’জনেরই খুব কষ্ট হচ্ছিলো। এরপর বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে এলেন তারা। বাম হাতে ভাইয়ের ডান হাত ধরে বের হয়ে এলেন বিমানবন্দর থেকে। প্রকাশ্যে শোকের মাত্রা এটুকুই ধরা দিলো ক্যামেরার সামনে। কিন্তু তারপর? দীর্ঘ রাতটি হয়ে জীবনের অন্যতম কষ্টের রাত হয়ে গেছে শেখ পরিবারের সদস্যদের জন্যে। আত্মীয়-স্বজনের জন্যে। জায়ানের জন্যে কেঁদেছে গোটা পরিবার। তাদের শোকার্ত অবয়ব দেখে কষ্ট পেয়েছে, কেঁদেছে দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ। সম্পাদনা : খালিদ আহমেদ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত