প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. কামাল হোসেনের ভবিষ্যদ্বাণী এবং বাংলাদেশের রাজনীতি

বিভুরঞ্জন সরকার : গণফোরামের সভাপতি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির আগেই জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে সফল হবে। তিনি উদাহরণ হিসেবে কোটা আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেছেন। ২০ এপ্রিল ছিলো কামাল হোসেনের ৮৩তম জন্মদিন। গণফোরাম কার্যালয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা ফুল দিয়ে তাকে বরণ করে নেন। তিনি সবাইকে নিয়ে জন্মদিনের কেক কাটেন এবং বলেন, ‘আজ সবাই পরিবর্তন চাচ্ছে। আমরা আশা করবো, গঠনমূলক রাজনীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে সেই কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আমরা আগামীতে আনতে পারবো’। তিনি আরো বলেছেন, ‘সবাই চাচ্ছে কার্যকর গণতন্ত্র যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে সর্বস্তরে’। তিনি এটাও বলেছেন যে, ‘শক্তিশালী সংগঠন ছাড়া অর্থপূর্ণ কাজ করা যাবে না, দেশেও পরিবর্তন আনা যাবে না। আমরা টাকার বিনিময়ে রাজনীতি করি না। আমরা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করি জনগণের ওপর ভিত্তি করে। এর ওপর ভিত্তি করেই দেশের স্বাধীনতা এসেছে। সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে আমাদের কাজ করতে হবে’।

ড. কামাল হোসেন একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তার জ্ঞানবুদ্ধিও অনেক। তাকে ‘আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন’ বলা হয়। তিনি তার জন্মদিনে দেশের রাজনীতি নিয়ে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন সেটা মানুষকে কতোটা আশাবাদী করেছে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের যথেষ্ট কারণ আছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন । তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়েছে। কারণ তখন তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহছায়ায় আওয়ামী লীগের কোলে। তার রাজনৈতিক ঔজ্জ্বল্য ও পরিচিতি আওয়ামী লীগে থেকেই হয়েছে। তারপর গত শতকের নব্বই দশকের শুরুতেই তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়েছেন। প্রায় তিরিশ বছর হতে চললো তিনি গণফোরাম নামের দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কী অর্জন এই সময়কালে? তার কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী কী এই সময়কালে সফল হয়েছে? তিনি তো গণফোরাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিকল্প হিসেবে। অনেক আশা ও স্বপ্নের কথা গণফোরামের প্রতিষ্ঠালগ্নে শোনানো হয়েছিলো। পরিণতি কী হলো? গণফোরাম কী দেশের রুগ্ন রাজনীতির বিকল্প হতে পেরেছে? রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে কতোটুকু সফল হয়েছে গণফোরাম? প্রতিষ্ঠার আড়াই দশক পর এবার দুইজন সংসদ সদস্য পেয়েও হারিয়েছে গণফোরাম। ‘শক্তিশালী সংগঠন ছাড়া অর্থপূর্ণ কোনো কাজ করা যাবে না, দেশেও পরিবর্তন আনা যাবে না’Ñএটা বলার পরও তিনি কেন পরিবর্তনের কথা বলছেন? গণফোরাম কী শক্তিশালী ভিত্তি নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছে? নাকি দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে?

ড. কামাল বলেছেন তারা টাকার বিনিময়ে রাজনীতি করেন না। টাকা ছাড়া এখন রাজনীতি হয়? তিনি তো গল্প কথার কল্পলোকে বসবাস করছেন। জনগণের ওপর ভিত্তি করে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথাও তিনি বলেছেন। ড. কামাল কী দেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন? তিনি বিএনপির সঙ্গে জোট করেছেন কী অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে শক্তি জোগানোর জন্য? বিএনপি কী অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির দল?

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির আগেই জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে সফল হবে বলতে কামাল হোসেন আসলে কী বুঝিয়েছেন তা-ও খুব স্পষ্ট নয়। তিনি কী মনে করছেন, এই সময়ের মধ্যে আন্দোলন করে জনগণ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাবে? স্বাধীনতার ৫০ বছর পূরণ হতে আর দুই বছর বাকি। এই সময়ের মধ্যে দেশে এমন আন্দোলন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম, যে আন্দোলনে সরকারের পতন হবে। আন্দোলন কারো হুকুমে হয় না। তার বাস্তব ভিত্তি লাগে। লাগে সাংগঠনিক, রাজনৈতিক প্রস্তুতি এবং ব্যাপক জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। আগামী দুই বছরের মধ্যে শেখ হাসিনার বিকল্প যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে ওঠার কোনো লক্ষণ বা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ড. কামাল হোসেন কী তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোনো সফল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন? তিনি যখন আন্দোলনের মাধ্যমে সফলতার কথা বলেন তখন সেটা সবার কাছে কথার কথাই মনে হয়।

আওয়ামী লীগ একটি লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়েই সরকার গঠন করেছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আওয়ামী লীগ উদযাপন করতে চায়। তার একটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং অন্যটি স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী। এই দুটি ঘটনা অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করার জন্য যা যা করা দরকার তাই করবে সরকার তথা আওয়ামী লীগ। এই সময়ের মধ্যে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। ড. কামাল কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের উদাহরণ দিয়েছেন। হ্যাঁ, এ ধরনের আকস্মিক ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন দেশে যেকোনো সময়ই হতে পারে। কিন্তু তাতে সরকার পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হবে না। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের গৎবাঁধা ধারণা থেকে আমাদের রাজনীতিবিদদের বেরিয়ে আসতে হবে। সরকার পরিবর্তন ঘটাতে হবে নির্বাচনের মাধ্যমেই। কিন্তু নির্বাচনে জিতে সংসদে না যাওয়া বা শপথ না নেয়ার ধারা চালু করলে মানুষ তাতেও খুব উৎসাহবোধ করবে কী? ড. কামাল হোসেন বলেছেন ‘সবাই চাচ্ছে’ সমস্যাটা এখানেই। তিনি তার নিজের চাওয়াটাকে সবার চাওয়া বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের দেশে আর কখনই ‘সবাই’ একযোগে কিছু চাইবে বলে মনে হয় না। সমাজ বিভাজিত। এ অবস্থায় সবার চাহিদা এক রকম হবে না। পক্ষ-বিপক্ষ অনিবার্য। আওয়ামী লীগ বা ক্ষমতাসীনদের পক্ষেও লোক আছে, থাকবে। বেশিরভাগ মানুষ চাইলেও অনেক সময় সে চাওয়া পূরণ হওয়ার অবস্থা তৈরি হয় না। কারণ জাতীয় ঘটনাবলীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর সম্মিলন ঘটলেই কেবল কিছু হয়। যারা আন্দোলনের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের অপেক্ষার পালা সংক্ষিপ্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত