প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য সেবা গ্রহীতারা অসহায়

নিউজ ডেস্ক : রাজধানীর উত্তরার বিআরটিএ অফিসটি এখন সঙ্গবদ্ধ দালালের খপ্পরে পড়েছে। এখানে যেকোনো সেবা নিতে এসে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত কয়েকগুণ অর্থ গুনতে হয় সেবা গ্রহীতাদের। দালালের কাজে সহযোগিতা করেন এই বিআরটিএ অফিসের একাধিক ব্যক্তি। এতে এখানে সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা পড়েন এক অসহায় পরিস্থিতিতে। এই অনিয়ম ও দালালবাজি দেখার যেন কেউ নেই। এই অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

জানা গেছে, স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা এ দালালদের দৌরাত্ম্য দমন করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ খোদ বিআরটিএর। দালালদের কার্যক্রম ধমাতে বিআরটিএর সিনিয়র কর্মকর্তারা বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও অদৃশ্য কারণে তারা প্রকাশ্যে কথা বলছেন না। তাই ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অফিসটি সরকারি হলেও এখানের কাজের ঠিকাদারি যেন দালালের হাতে ন্যস্ত। কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তায় এ সুযোগে দিনে লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি দালাল চক্র। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিআরটিএর উত্তরা অফিসটি একটি চারতলা ভাড়া বাসায় প্রথম কার্যক্রম শুরু করে তিন বছর আগে। ভাড়া বাসাটির সামনে ৬ ফুট চওড়া একটি রাস্তা থাকলেও ঠিক সামনের জায়গাটি রাজউকের রাস্তার জন্য বরাদ্দের জায়গা। কিন্তু ড্রাইভিং ও ফিটনেস নিতে আসা গাড়িগুলো সামনের রাজউকের রোডের পাশে খালি জায়গায় রাখা হয়। বিআরটিএ অফিসের সামনের খালি জায়গাটি উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের রাস্তার জন্য বরাদ্দ করা। কিন্তু অফিসের সামনের খালি জায়গাটি নিজের দখলে নিয়ে তুরাগ থানা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মো. নাসির ভাড়া দিয়েছেন বিআরটিএর কাছে। জানা যায়, রাজউকের এই জায়গাটি ২০১৫ সাল থেকে নাসির ও কাউন্সিলরের ভাতিজা সাদেকের দখলে রেখেছেন। তাছাড়া ড্রাইভিং পরীক্ষা দিতে আসা লোকদের জন্য দুটি লক্কড়ঝক্কড় গাড়িও ভাড়ায় খাটান নাসির ও সাদেক। লাইসেন্স নিতে আসা লোকজনকে অবশ্যই তার দেওয়া গাড়িতেই (ঢাকা মেট্রো-ক ০৩-৯২০৫ ও ঢাকা মেট্রো-ড ৪০৪৪) পরীক্ষা দিতে হয়। আবার সেই গাড়ি ব্যবহার না করলেও টাকা দিতে হয় নাসিরের লোকজনকে।

তুরাগের দলিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন জানান, আমি গত ৩ মাস আগে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে যাই এবং লার্নার কার্ডের জন্য দালালের কাছে ৯ হাজার টাকায় চুক্তি করি। পরীক্ষা দিতে এসেছি। ১৫ সেকেন্ডের জন্য একটি গাড়িতে উঠলাম আর নামলাম এর জন্য দিতে হয়েছে ২০০ টাকা। তাছাড়া যে গাড়িটি দিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি সেটির অবস্থা বেহাল। ড্রাইভিং লাইসেন্সের লার্নার কার্ড নিতে আসা আবদুল রাজ্জাক মিয়া জানান, কেউ দালাল ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে পারে না। আমি এখানে এসে নিজের চোখে দেখলাম। এখানে ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হয়। এ যেন টাকার খেলা। সঠিক কাগজপত্র থাকলেও দালাল ছাড়া কাজ করার কোনো উপায় নেই এই অফিসে।

জানা যায়, নাসিরের ভাড়া দেওয়া মাঠটি আগে বিআরটিএ এমনিতে ব্যবহার করত। এই মাঠে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ শতাধিক গাড়ি ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্সে এবং গ্রাহক সেবার জন্য বিআরটিএ কার্যালয়ে আসে। বর্তমানে সেই মাঠটি দখলে রেখে প্রতিদিন লাখ টাকা আদায় করছে নাসির চক্র। তার এ কাজে সহযোগিতার জন্য তিনি আরো তিনজনকে সম্পৃক্ত করেছেন। তারা হলেন বর্তমান কাউন্সিলরের ভাতিজা ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাদেকুর রহমান, শাহীন ও যুবলীগের নিত্যচন্দ্র। বর্তমানে সবকিছুই চলে এই তিনজনের নামে। তাদের কাজে সহযোগিতার জন্য মাঠে আরো ৮-৭ জন দালাল কাজ করছে। তাদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে স্থানীয় শ্রমিক লীগের ইকবাল, সোলেইমান, আলাল। উল্লেখ্য, গত বছর ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানের সময় স্থানীয় দালাল আলালকে হাতেনাতে আটক করে। সে দুই মাস সাজা খেটে আসার পর আবারো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দালালিতে।

তুরাগের নেতৃত্বস্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক এই প্রতিবেদককে জানান, কাউন্সিলরের ভাতিজা সাদেকুর রহমানের ইশারাতেই চলছে তুরাগ এলাকার সব ধরনের অবৈধ কর্মকান্ড। এসবের মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট দিয়ে বিআরটিএ আঞ্চলিক কার্যালয়ে (সার্কেল-৩) চাঁদা আদায়, তুরাগতীরে বালুর গদি দখল, অটোস্ট্যান্ড ও লেগুনাস্ট্যান্ড দখল এবং দখলকৃত প্রতিটি স্ট্যান্ডে চাঁদা উঠানোর জন্য কমিটি গঠনসহ রয়েছে আরো অনেক অবৈধ আয়ের উৎস।

এ ব্যাপারে তুরাগ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মোহাম্মদ সাদেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এখানে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রীগের ১০-১২ জন নেতাকর্মীরা ভাড়া নিয়ে কর্ম করে খাচ্ছে। সব জায়গায়ই পলিটিক্যাল কাজ-কারবার চলে। আমরাও দল করি তাই কিছু একটা করে খাচ্ছি। প্রশিক্ষণের জন্য ২টি প্রাইভেট কার ভাড়া দিয়ে কিছু নেতাকর্মীরা চলছি। প্রায় একই সুরে কথা বলেন মো. নাসিরও। তিনি বলেন, তুরাগের সিনিয়ররা আমাদের বলেছেন বিআরটিএ অফিস এলাকায় গাড়ি ভাড়াসহ সার্বিক বিষয় দেখতে। তাই সবাই মিলেমিশে আছি আমরা। এটা দোষের কিছু নয়।

এ বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের তুরাগ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহীন বলেন, আমি এ ধরনের কাজ থেকে সরে এসেছি। বলতে গেলে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, আপনি আমার সঙ্গে দেখা করলে এ ব্যাপারে আরো তথ্য দিতে পারব।

উত্তরা জোনের বিআরটিএ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস এম মাহফুজুর রশিদের সঙ্গে মুঠোফোনে এ বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সরকার ড্রাইভিং লাইসেন্সের গ্রাহক সেবার জন্য কোনো গাড়ির ব্যবস্থা করেনি। বিআরটিএর মাঠ স্বেচ্ছাসেবক লীগের দখলে কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কে বা কারা প্রশিক্ষণের নাম করে গাড়ি ভাড়া দিয়ে দালালি করছে এ বিষয়ে বিআরটিএর কর্তৃপক্ষ জানে না। বিআরটিএর সামনের মাঠটি কে নিয়ন্ত্রণ করছেন তাও জানেন না তিনি। তবে এ নিয়ে আলোচনা চলছে দ্রুত এর সমাধান হবে বলে জানিয়েছে এ অফিসের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা।

সূত্র : প্রতিদিনের সংবাদ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত