প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মজুদ পর্যাপ্ত তবুও বাড়ছে রমজানের পণ্যমূল্য

ডেস্ক রিপোর্ট : রমজান সামনে রেখে সক্রিয় অসাধু সিন্ডিকেট। রমজাননির্ভর পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও দাম বাড়ছে। সরকারের কঠোর হুশিয়ারি উপেক্ষা করে কারসাজি করে পবিত্র রমজান শুরুর আগেই পণ্যমূল্য বাড়তে শুরু করেছে।

টার্গেট করে বেশ কিছু দিন আগেই বাড়ানো হয়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। কেজিতে ৫৫ টাকা বেড়ে ব্রয়লার এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬৫-১৭৫ টাকায়। প্রায় একই সময় গরুর মাংস কেজিতে ৫০-৬০ টাকা বেড়ে সোমবারও বিক্রি হয়েছে ৫৫০-৫৬০ টাকায়।

মাছ-সবজির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। জানা গেছে, রোজা শুরুর ১৭ দিন আগে পেঁয়াজসহ ছোলা, চিনি, ডাল ও খেজুরকেও টার্গেট করা হয়। গত ১৭ এপ্রিল ৫ পণ্যের মধ্যে হঠাৎ চিনির মূল্য বাড়ানো হয়। পরের দিন বৃদ্ধি পায় ডালের দাম। কৌশলে বাড়ানো হয়েছে পেঁয়াজের দামও। খুচরা বাজারে ছোলার দাম না বাড়লেও পাইকারি বাজারে বাড়তে শুরু করেছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে বাড়ছে আদা ও রসুনের দাম।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রমজানে নিত্যপণ্যের দাম যাতে না বাড়ে এজন্য প্রধানমন্ত্রীও সজাগ। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রমজানে যাতে নিত্যপণ্যের দাম না বাড়ে এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের অনুরোধও করেছেন। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন- রমজাননির্ভর পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। দাম কোনোভাবেই বাড়বে না। বাজার তদারকি সংস্থাগুলো কাজ শুরু করেছে। এ অবস্থায়ও ভিন্ন কৌশল নিয়েছে সিন্ডিকেট। তারা মনে করছেন, রমজানে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির বিতর্ক এড়াতে এক মাস আগেই নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, গত বছরের মতো এ বছরও রমজানের আগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। এ বছর রমজানে নিত্যপণ্যের দাম যাতে না বাড়ে সে বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকার কিছু কার্যক্রমও হাতে নিয়েছে। তবে বাজার মনিটরিংয়ে গাফিলতি আছে; যার কারণে অসাধুরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াতে পারছে। সিন্ডিকেটদের কখনই ধরতে দেখছি না। তারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সবশেষ পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৮ লাখ টন। এর মধ্যে রমজানে চাহিদা তিন লাখ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চিনির উৎপাদন ছিল ৬৮ হাজার ৫৬২ টন। আমদানি করা হয়েছে ২২ লাখ টন। গত বছর উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ৫ লাখ টন। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে চিনি উৎপাদন হয়েছে ৬২ হাজার ৮৮৯ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯ মার্চ পর্যন্ত চিনি আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৭৩ হাজার টন। এলসি খোলা হয়েছে ১২ লাখ ৪৭ টন। ফলে কয়েক লাখ টন চিনির উদ্বৃত্ত থাকার কথা। অথচ বুধবার প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) পাইকারি পর্যায়ে খোলা চিনি ৭০-৮০ টাকা বেড়ে ২৪৮০-২৪৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

খুচরা পর্যায়ে প্রতি বস্তা ১০০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছিল। গত শুক্রবার পাইকারি পর্যায়ে প্রতি বস্তা ২০-৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছে ২৫১০ টাকায়। খুচরা পর্যায়ে ২৬৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। সোমবারও এ দাম ছিল। খাতুনগঞ্জের শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. মহিউদ্দিন জানান, বাজারে রমজাননির্ভর পণ্যের সংকট নেই। তবে মাঝে মধ্যে আমদানি মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। এতে জিনিসপত্রের দাম সাময়িকভাবে বেড়ে যায়।

তবে সংকট না থাকার পরও দাম বৃদ্ধির বিষয়ে নজরদারি দরকার। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের হিসাব বলছে চাহিদার তুলনায় রমজাননির্ভর পণ্যের মজুদ অনেক বেশি। তাই পণ্যের দাম বাড়বে না। মনিটরিংয়ের সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। রমজানকে কেন্দ্র করে কেউ সুযোগ নিচ্ছে কিনা, সে বিষয়টি আমরা নজরে রাখছি।

অন্যদিকে ছোলার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ টন। রমজান মাসেই চাহিদা থাকে প্রায় ৮০ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছোলা আমদানি হয় ২ লাখ ৯৭ হাজার টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৯ মার্চ পর্যন্ত ছোলা আমদানি হয় ৮৯ হাজার ৩৯০ টন। এলসি খোলা হয়েছে আরও ৮৪ হাজার ৭৪৭ টন। এছাড়া ডালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৫ হাজার টন। এর মধ্যে রমজানে এ পণ্যের চাহিদা ৮০ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মশুরের ডাল উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৩ হাজার টন এবং আমদানি ছিল ২ লাখ এক হাজার টন। তাছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯ মার্চ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে এক লাখ ৮৭ হাজার টন। এলসি খোলা হয়েছে আরও ১ লাখ ৯৬ হাজার টন।

এরপরও চট্টগ্রামে ছোলা ও ডালের দাম শুক্রবার দু’দিনের ব্যবধানে মণপ্রতি বেড়েছে ৪৫০-৫০০ টাকা। মিয়ানমারের উন্নতমানের ছোলা সোমবার বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি ২৪৫০-২৫০০ টাকায়। কয়েক দিন আগেও ছিল ২২০০-২২৫০ টাকা। অস্ট্রেলিয়ার উন্নতমানের ছোলা বিক্রি হচ্ছে ২৭০০ টাকা দরে। ৪ দিন আগে ছিল ২৫০০ টাকা। অস্ট্রেলিয়ার মাঝারি মানের ছোলা বিক্রি হচ্ছে ২৪০০-২৪৫০ টাকায়। কয়েক দিন আগে ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা।

বাড়ানো হয়েছে ডালের দামও। সোমবার মসুর ডাল কেজিপ্রতি ৯৩ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ৪ দিন ছিল ৮০ টাকা। মোটা মসুর ডালের দাম কেজিতে সাত টাকা বেড়ে ৮৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খেসারির ডাল ৩৬ টাকা থেকে বেড়ে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সোমবার রাজধানীতে সব ধরনের সবজি ও মাছ বিক্রি হয়েছে উচ্চমূল্যে। বরবটি বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকা কেজিতে, পটল ৬০-৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৭০-৮০, কচুর লতি ৭০-৮০, করলা মান ভেদে ৬০-৮০, শিম ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। প্রতি পিস লাউ ৭০-৮০ টাকা, প্রতি পিস ফুলকপি ৫৫-৬৫, বেগুনের কেজি ৪০-৬০, পাকা টমেটো ৩০-৫০, গাজর ৩০-৪০, দেশি পেঁয়াজ ২৭-৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। প্রতি কেজি তেলাপিয়া মাছ ১৪০-১৬০ টাকা, পাঙ্গাস ১৬০-১৮০, রুই আকারভেদে ৩৫০-৬০০, পাবদা ৬০০-৭০০, টেংরা ৭০০-৭৫০, শিং ৪০০-৫৫০, বোয়াল ৫০০-৮০০ ও চিতল ৫০০-৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোরশেদ শাহরিয়ার সোমবার যুগান্তরকে বলেন, রমজানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিশেষ মনিটরিং সেল কাজ করছে। রমজান মাসজুড়ে চলবে। রোববার শ্যামবাজারে পেঁয়াজ-রসুনের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে অভিযান চালানো হয়েছে। ব্যবসায়ীরা যদি অনৈতিকভাবে দাম বাড়ায়, তাহলে ভোক্তা আইনে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।

বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে বাণিজ্যমন্ত্রীর চিঠি : বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের মজুদ, সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে বিভাগীয় কমিশনারদের চিঠি দিয়েছেন। গত ১৭ এপ্রিলের ওই চিঠিতে তিনি সব জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নিদের্শনা প্রদান করেছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, স্থানীয় পর্যায়ে পণ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য যাতে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, তা নিশ্চিত করতে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় নিয়ে রমজানে ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন।
সূত্র : যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত