প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে খুন হয় মিরণ

মাহফুজ নান্টু: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কুমিল্লা আর্দশ সদর উপজেলার বিষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা সিংগাপুর প্রবাসী আবুল কালাম আজাদ। গত নয় মাস আগে স্ত্রী নুসরাত জাহান ও চার ছেলেকে নগরীর ঝাউতলা এলাকায় ডা.মজিবের বাসার একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে রেখে সিঙ্গাপুর চলে যান আবুল কালাম আজাদ।

নুসরাত আজাদ দম্পত্তির চার ছেলের সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে নয়ন এবার কুমিল্লা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। মেঝো ছেলে মিরণ কুমিল্লা মর্ডাণ হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়তো। সেঝো ছেলে মিশকাত প্রথম শ্রেণীর ছাত্র আর ছোট ছেলে সায়েল সবে দু বছরে পা রাখলো। স্বামী আবুল কালাম আজাদ ছেলেদের ভালো লেখাপড়া এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য গত নয় মাস আগে স্ত্রী সন্তানদের দেশে রেখে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। এদিকে গৃহীনি নুসরাত জাহান চার সন্তান নিয়ে বেশ ভালোভাবেই দিনপার করছিলেন। কিন্তু গত রবিবার শবে বরাতের রাতে আজাদ নুসরাত দম্পত্তির মেঝো ছেলে মিরন তার সহপাঠীদের ছুরিকাঘাতে হাতে খুন হয়। আর এ ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মা নুসরাত জাহান। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বড় ভাই নয়নের। শোকার্ত হয়ে পড়ে এলাকাবাসী। সহপাঠীদের হাতে শান্ত ভদ্র বিনয়ী মিরনের খুনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন পুরো নগরী।

সোমবার নগরীর ঝাউতলা এলাকায় আবুল কালাম আজাদের বাসায় গিয়ে দেখা যায় তালাবদ্ধ। পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা জানান, মিরনের লাশ নিয়ে তার স্বজনরা বিষ্ণপুর গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। এদিকে বিষ্ণপুর মিরনের গ্রামের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় এক শোকবহুল অবস্থা। সহস্রাধিক মানুষ। অথচ কারো মুখে কোন কথা নেই। মিরনের মায়ের সাথে দেখা করতে গেলে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। এ সময় পড়শীরা যারা সান্তনা দিতে এসেছেন মিরনের মায়ের আর্তনাদে তারাও হুঁ হুঁ করে কেদে উঠেন।

সহপাঠীদের হাতে খুন হওয়া মিরনের মা নুসরাত জাহান জানান, আমার মিরনকে আইন্না দাওরে বাবা। আমার ছেলে ঝাউতলা ছাতা মসজিদে নামাজ পড়তে গেছে। পরে রাত ১১টায় শুনতে পাই আমার ছেলেকে কারা যেন মেরে ফেলেছে। এই খবর শুনার পর আমার হাত পা অচল হয়ে যায়। আমি যেন চলতে পারছি না। আমার সন্তানকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। আমার মত আর কোন মায়ের বুক যেন খালি না হয়। ও মিরনরে তুই ফিরে আয় বলে সন্তানহারা মা নুসরাত জাহান মূর্ছা যান।

নিহত মিরনের বড় ভাই নয়ন জানান, গত কয়েকদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে মিরনের বন্ধুদের সাথে একই ক্লাশের কয়েকজনের কথা কাটাকাটি হয়। পরে গত রবিবার রাতে শবে বরাতের রাতে মিরণ ঝাউতলা ছাতা মসজিদে নামাজ পড়বে বলে বাসা থেকে বের হয়। পরে বন্ধুরা মিলে ঠাকুরপাড়া মদিনা মসজিদে যায়। মসজিদের দু’তলায় নামাজ পড়ছিলো মিরণ। এ সময় নিজে মারামারি হচ্ছে এমন খবরে মসজিদের দুতলা থেকে নিচতলায় মিরন এসে দেখে তার ক্লাশের কয়েকজন মিলে তার বন্ধু আবিরকে মারছে। আবিরকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে মিরণ। এ সময় তার ক্লাশে পড়–য়াদের মধ্যে একজন যারা আবিরকে মারছে তাদের একজন মিরণকে পেছনে থেকে ছুরি ঘাই দিয়ে টান মারে। এতে মিরনের পিঠ থেকে কোমড় পর্যন্ত গভীর হয়ে কেটে যায়। পরে মিরনের পায়ের কাছে হাটুর রগেও কোপ মারে। এত মিরনের পায়ের রগও কেটে যায়। এ সময় মিরনের প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। স্থানীয় আহত মিরনকে উদ্ধার করে কুমিল্লা টাওয়ার হসপিটালে নিয়ে গেলে আশংকাজনক অবস্থা থাকায় হসপিটাল কর্তৃপক্ষ মিরনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। পরে কুমেকে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় মিরন।

এ বিষয়ে নগরীর কান্দিরপাড় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল ইসলাম বিষয়টি জানান, সহপাঠীদের ছুরিকাঘাতে মারাত্মক আহত হওয়ার পর স্থানীয়রা আহত মিরনকে হাসপাতালে নেয়ার পর গভীর রাতে তার মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে সহপাঠীদের হাতে নিহত মিরনের চাচা কামরুল ইসলাম বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
হত্যাকান্ডের বিষয়ে কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার্স ইনচার্জ আবু ছালাম মিয়া জানান, খুনের সাথে কে বা কারা জড়িত কিংবা এসব শিক্ষার্থীদের কেউ এমন অপরাধ করতে উসকে দিচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যে বা যারাই এ খুনের সাথে জড়িত তাদেরকে অচিরেই আটক করা হবে। পুলিশ ইতিমধ্যেই খুনের সাথে জড়িতদের আটক করতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সহপাঠীদের হাতে খুন হওয়া মিরনের লাশ হিমায়িত করে রাখা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার মিরনের বাবা দেশে আসার বিষ্ণপুর ঈদগা ময়দানে নামাজে জানাযা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে পরিবার থেকে জানানো হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত