প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পহেলা বৈশাখ : স্মৃতির শিহরন

অসীম সাহা : বাঙালির নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ চেতনার ভেতরে উন্মাতাল হাওয়ার আবেগঘন উন্মীলনে এক কম্পিত শিহরন জাগিয়ে দেয়। প্রতি বছর এই দিনটি ঘুরে এলেই আমি ফিরে যাই আমার শৈশবে। বাংলা নতুন বছর মানেই বাবার হাত ধরে দোকানে দোকানে হালখাতার উৎসবে যোগদান, নানারকম মিষ্টান্নের আয়োজনের দিকে সকাতর দৃষ্টির লোভাতুর প্রতিফলন আর বয়োজ্যেষ্ঠদের আর্শীবাদ ও ভালোবাসার অক্লান্ত প্লাবনে ভেসে যাওয়ার আনন্দে ভরপুর সেই দিনগুলো আমাকে কেবলই স্মৃতির ভেতরে দীর্ঘক্ষণ ডুবিয়ে রাখে।

আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে পুরান বাজার, নতুন বাজার আর নতুন শহর নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ছোট ছিমছাম শহর মাদারীপুর। শহরে ঢুকতেই রাস্তার দু’পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছ আর সুবিশাল এক লেক এই শহরে ভ্রমণকারীদের স্বাগত জানায়। সেই সুন্দর ও মনোরম শহরেই আমার শৈশবের অনেকগুলো দিন কেটেছে। আমি দেখেছি সেখানে কেমন করে সাড়ম্বরে পালিত হতো পহেলা বৈশাখ। আমার মনে আছে, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার আগে থেকেই চলতো আমাদের ছোটদের প্রস্তুতি। নতুন বছরে নতুন জামা-কাপড়ে সজ্জিত হওয়ার মধুর আয়োজন ছিলো নিয়মিত। এখনকার মতো লোক-দেখানো পাজামা-পাঞ্জাবি আর পান্তাভাতের কৃত্রিম আয়োজন তখন ছিলো না, ছিলো না শুধু একটি দিনের জন্য কোলাহলমুখর অনুভূতি প্রকাশের এতো জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিযোগিতা। তখনকার আয়োজন ছিলো, সারা বছর ধরে নিজেকে আর একটি বছরের জন্য প্রস্তুত করার প্রতিজ্ঞায় নিবেদিত। সেই আয়োজনে ছোট-বড়োর মধ্যে তেমন ভেদ ছিলো না। বরং বড়োদের চাইতে ছোটরাই নতুন বছরের আনন্দে উদ্বেলিত হতো বেশি। আর বয়োজ্যেষ্ঠরা ছোটদের আনন্দকে আরো বেশি উস্কে দেয়ার জন্য নানা স্থানে তাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। নতুন বছরে এখানে-সেখানে জমজমাট মেলা বসতো। রাধচক্কর, ঘোড়াচক্কর নামের নাগরদোলা সাজিয়ে বসতো কেউ কেউ। সেখানে লাইন ধরে রঙিন সাজে সজ্জিত ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, এখন তাদের প্রতীক্ষিত সময় আসবে, কখন তারা চড়ে বসতে পারবে ঐ দোলনায়। কখনো কেউ এই আনন্দে যোগ দিতে না পারলে নতুন বছরের আনন্দটাই মাটি হয়ে যেতো। মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলো পুতুলনাচ। টিনের ঘের দেয়া অথবা ত্রিপল দিয়ে ঢাকা একটা ঘরের মধ্যে ছোট একটি মঞ্চে পুতুলনাচ দেখানো হতো। মঞ্চের পাশেই হারমোনিয়ম, বাঁশি ও ঢোলবাদককে নিয়ে বসতো একজন গাইয়ে। গানের তালে তালে নাচতো নানা রকমের পুতুল। ছোট বড়ো সকলেই বিম্ময়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতো পুতুলের সেই অবিশ্বাস্য নাচ। বাইরে চোঙ্গা ফুঁকে পুতুল কী কী নাচ দেখাবে, সে-সম্পর্কে আগাম জানান দিয়ে টিকিট বিক্রি করা হতো। বিশাল বিশাল সাইনবোর্ডে পুতুলের ছবি থাকতো আর থাকতো পুতুলনাচের দলের নাম। মেলায় নিয়মিত আসতো রঙিন পোশাক পরে পুঁতি-বসানো পিতলের গাজীর পট নিয়ে মুসলিম ফকিরগণ। তাঁরা গাজীর ছবি দেখিয়ে গান গাইতেন। ছোটরা তাঁদের ঘিরে থাকতো। মেলায় তৈরি হতো এক নতুন আবহ। কখনো কখনো সার্কাসের দলও আসতো। তখন সারা শহর জুড়ে সার্কাসের হাতি টহল দিতো। আমরাও হাতির পেছনে পেছনে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াতাম।

মেলাপ্রাঙ্গণ জুড়ে এলোমেলো বাজতে থাকতো বাঁশের বাঁশি। কেউ কেউ বাজাতো ছোট ছোট ঢোল, আবার কেউ বা বেলুনবাঁশি। ছোটদের হাতে হাতে পাতলা লাল-নীল কাগজ দিয়ে বানানো চরকি হু-হু করা বাতাসে বন্ বন্ করে ঘুরতো। থাকতো গজা, নিমকি, চিনির তৈরি কদমা, ছোট ছোট মাছ, পাখি, হাতি ও ঘোড়া; থাকতো মজাদার তিলেখাজা। পাওয়া যেতো গোলাপের মতো লাল রঙের হাওয়াই মিঠাই। আশপাশেই ভাজা হতো থালার সাইজের দু’পয়সার মুগের পাপড়। সে-সব দেখে জিভের ডগায় একধরনের শিরশির অনুভূতি জাগতো আর শিশিরের মতো হালকা-পাতলা লালায় ভরে উঠতো মুখ। কুমোরেরা মাটির তৈরি বহু বিচিত্র পণ্য নিয়ে আসতো দূরদূরান্ত থেকে। থাকতো শোলার পাখি, কাঠের তৈরি নানা আকৃতির, নানান রঙের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং বিলাসসামগ্রীও।

হালখাতা করতেন যেসব দোকানি, তারা অনেকেই ছিলেন আমাদের পরিচিত। সেখানে গিয়ে দেখেছি, বাংলা নববর্ষকে তাঁরা কীভাবে প্রাণের অর্ঘ্য দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন। পহেলা বৈশাখ আসার আগে থেকেই প্রস্তুতি চলতো। ঘর ঝাড়ামোছা করা, নতুন কাপড় দিয়ে গদি সাজানো, পুরনো বছরের খেরো খাতা বদলে নতুন খাতার আয়োজন, তাকে ফুল-বেলপাতা দিয়ে স্বাগত জানানো। সবকিছুর মধ্যে একটা পবিত্রতার ছোঁয়া থাকতো।

বেশির ভাগ দোকান ছিলো পুরান বাজারে। সেখানে সাতদিনব্যাপী কীর্তনের আসর বসতো। পুরান বাজার ঘেঁষেই ছিলো আড়িয়াল খাঁ নদী। শত শত নৌকায় করে ছেলেবুড়ো, নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মিছিল এসে যোগ দিতো সেই কীর্তনের আসরে। বাড়িতে ফাঁকি দিয়ে আমি নিজেও যে কতোদিন সেই কীর্তনের আসরের পাশ দিয়ে ঘুর-ঘুর করেছি, তা ভেবে এখনো পুলক অনুভব করি। সারারাত ধরে পালাকীর্তন হতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিখ্যাত বিখ্যাত সব কীর্তন-গাইয়ে আসতেন। তাঁদের গলায় থাকতো রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে চন্দনতিলক। কারো গলায় হারমোনিয়ম, কারো হাতে বাঁশি, আবার কারো গলায় ঝোলানো থাকতো খোল, কারো হাতে করতাল। মূল গায়েন যখন হরেকৃষ্ণ… বলে সুর ধরতেন তখন সঙ্গের গায়েনরা দুলে দুলে নাচতেন। সেই নাচের মধ্যে এমন এক আশ্চর্য দোলা থাকতো যে, তাতে আমার নিজের ছোট্ট দেহটিও কখন যে দুলে দুলে উঠতো আমি নিজেও জানি না। যখন গান থামতো, তাঁদের দেখে আমার ছোট্ট দুটি চোখ বিস্ময়ে গোলাকার হয়ে যেতো। আমি অপলক তাঁদের চেয়ে চেয়ে দেখতাম। এক একজনের পালা শেষ হবার পর আরেকজন এসে গান ধরতেন। বেশিরভাগই ছিলো কৃষ্ণলীলা। অসংখ্য মানুষ সারারাত ধরে সেই পালাকীর্তন শুনতো।

সকাল থেকেই ছোট্ট শহরের সারা পথ জুড়ে দোকানিরা নানারকম পসরা সাজিয়ে বসতো। ভীড়ের মধ্যে আমার ছোট্ট দেহটি একাকী ঘুরে বেড়াতো নানারকম কৌতূহল নিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম স্টীমারঘাট অবধি। পদ্মার স্টীমার কাঠের চাকায় জলের ঘূর্ণন তুলে ভেঁপু বাজিয়ে ঘাটে এসে ভিড়তো। আমি নানা রকম মানুষের ওঠানামা দেখতাম। পহেলা বৈশাখ আমাকে একদিনের জন্য রাজা করে দিতো। মনে হতো আমার মতো স্বাধীন আর কেউ নয়। যদি প্রতিটি দিন পহেলা বৈশাখের দিনটির মতো হতো, তা হলে কী মজাই না হতো!

নতুন বছরে আমাদের বাড়িতেও চেনাপরিচিত মানুষেরা আসতেন। তাদের জলখাবার আর মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। মা নাড়–-মোয়া বানাতেন। হতো লুচি-তরকারি। পিঠে-পুলি তো ছিলোই। নানা ধরনের খাবার করতে মার কোনো ক্লান্তি ছিলো না। তাঁর অক্লান্ত হাতে একটার পর একটা খাবার তৈরি হতো। আমরা আমাদের খুশিমতো যে কোনোটা থেকে খাবার বেছে নিয়ে প্রাণভরে খেতাম।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা রকমের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। কোনোটা বড়োদের জন্য, কোনোটা ছোটদের। সারা শহর মেতে উঠতো আনন্দে, উৎসবে। রঙিন পোশাকে সজ্জিত হয়ে দলে দলে মানুষ সেই প্রতিযোগিতা দেখতে হাজির হতো। হতো গানের প্রতিযোগিতা। এপাড়ায়-ওপাড়ায় সেই প্রতিযোগিতার ঢেউ এসে লাগতো। নদীতে চলতো সাজো সাজো রব। নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। নদী তখন এমন করে শুকিয়ে যায়নি। পুরান বাজার থেকে দশ কিলোমিটার দূরের নদীপথে চরমুগুরিয়া পর্যন্ত নৌকা বেয়ে যেতে হবে। বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিযোগিতার জন্য নানান দল আসতো। বিশাল বিশাল নৌকা সাজানো হতো অপরূপ সাজে। সাথে প্রতিযোগিরাও সাজতো। বৈঠার তালে তালে ঢোল করতাল আর কাসরঘণ্টা বাজতো। মুখে মুখে রব উঠতো হেইও-আরো জোরে হেইও। নদীর তীরে হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে উত্তেজনাকর এই প্রতিযোগিতা দেখতো। পাড়ায় পাড়ায় ছোটদের হৈহুল্লোড়ে ছোট্ট একটা শহরে যে আনন্দের বান ডাকতো, তার তুলনা মেলা ভার।

তখন শহরতলি কিংবা পাশের বিভিন্ন গ্রামেও একসঙ্গে অনেক মেলা বসতো। কোনো কোনো মেলা ছিলো এক নামে খ্যাত। অধিকাংশ মেলাই বসতো কোনো নদী কিংবা খালের ধারে। এর কারণ হয়তো এই যে, তখন নদীপথই ছিলো যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন। অধিকাংশ মানুষই ব্যবহার করতো নৌকা। নদীপথ ধরে অসংখ্য নৌকা এসে ভিড়তো। নদীর কিনারে কিংবা খালের পাশে ছোট ছোট ডিঙ্গি অথবা একমাল্লাই নৌকা যখন একসঙ্গে বাঁধা থাকতো, তখন তাতে যে অসামান্য দৃশ্যপট তৈরি হতো, তা অতুলনীয়। বিশালতা ছাড়া প্রতিটি মেলারই চিত্র ছিলো একইরকম। পহেলা বৈশাখের সারাটা দিন যে কোথা দিয়ে কেটে যেতো টেরও পেতাম না।

এখনও আগের মতোই পহেলা বৈশাখ আসে বাঙালির জীবনে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলাও বসে। মেলাতে সবকিছুই পাওয়া যায়। কিন্তু কোথায় যেন একটা আন্তরিকতার অভাব লক্ষ করি। হতে পারে আমাদের জীবনের সময়টা বদলে গেছে, বদলে গেছে আমাদের দৃষ্টি। তাই মেলা তার মৌলিক চরিত্র নিয়ে আয়োজিত হলেও আমরা তাকে তেমনভাবে গ্রহণ করতে পারি না। হয়তো সে-আমাদের সীমাবদ্ধতা। সময়ের তালে তালে এখন মেলার চরিত্রে আধুনিক নগরজীবনের অনেককিছুর ছোঁয়া লেগেছে। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। আমরা যে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের উৎসব পালন করতাম, সেই বাংলাদেশ তো এখন আর নেই। স্বভাবে-চরিত্রে, আদর্শে, চিন্তা-চেতনায় এখন বাঙালি তার মূল স্রোত থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। তাই সে এখন ছুটে যাচ্ছে এমন এক স্রোতের দিকে, যা আমাদের ডুবিয়ে দিতে পারে অন্ধকার এক ঘূর্ণির ভেতরে। আমি জানি না, এ আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাই না। আমার স্থির বিশ্বাস, আমি যেমন করে আমার শৈশবের স্মৃতিতে ডুবে গিয়ে এক পুলকিত শিহরন অনুভব করি, বাঙালি তার অস্তিত্বের প্রয়োজনে সেই শিহরন-জাগানো সময়কে নতুন পারম্পর্যে ফিরিয়ে আনবেই। এবারের পহেলা বৈশাখে সেই হোক আমাদের একমাত্র প্রার্থনা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত