প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরও আলো, আরও আলো, এ দু’নয়ন ভরে ঢালো

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ : প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি বছর শেষ হয়ে যায়, আরেকটি আসে। দিন যায়, দিন আসে, দিন বদলায়। এভাবে কেটে যায় অনন্তকাল। কিন্তু, কালের দাবী তার স্বাক্ষর রেখে যায় সভ্যতার আকে-বাকে। আজ আরও একটি নতুন বছরের সূচনা হোল। প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার হিসেব মিলাতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছি বার বার। আমার সমস্ত চেতনায় একটি নাম আজ প্রতিবাদের আগুন হয়ে স্ফুলিঙ্গ ছড়াচ্ছে।
নুসরাত! মেয়েটি লড়াই করতে চেয়েছিল। ঘুণে ধরা সমাজের আনাচে-কানাচে সকল দীনতা আর হীনতার বিরুদ্ধে।

নুসরাতকে চারপাশে দেখি। নুসরাত হারিয়ে যাওয়ার নয়। আমি রাজনীতির অলি-গলি চিনিনা, আমি মোল্লা তন্ত্রের যাঁতাকলে ধর্মকে বন্ধক দেইনি, আমি নারীবাদি না পুরুষবাদি তা নিয়ে ভাবার সময় পাই না। আমি প্রগতিবাদী নই, আমি কুসংস্কারে নিজের শুদ্ধি খুজিনা, আমি তো ডান-বাম চিনিনা।

আমি শুধু দেখি এক বিশাল অন্ধকার গহবরে আমার মানব অস্তিত্ব। আগুনের লেলিহান শিখা আমার বিবেককে দাউ দাউ করে পোড়াচ্ছে। আমি সরকারের পক্ষে যুক্তি দিব না, আমি সরকারের বিপক্ষে আন্দোলন করব না। আমাকে শুধু একবার কেউ বুঝিয়ে দিয়ে যাক, আমার নুসরাত কেন চলে গেল না ফেরার দেশে?

নুসরাত হিজাব পড়ত না টাইট জিন্স এসব আমাকে বিচলিত করে না। নুসরাত ধর্ম মানত নাকি নাস্তিক ছিল এসব আমাকে ভাবায় না। নুসরাত তার প্রথম প্রণয়ে কাউকে কাছে টেনেছিল নাকি বাবা-মার পছন্দের ছেলের হাত ধরে সংসার করতো এসবের কোন কিছুই আমাকে চিন্তিত করে না। আমি খুব স্বার্থপর! ভাবি, শুধু আমার নুসরাতের কথা। আমার ঘরে যে “নুসরাত” বড় হচ্ছে, আমি তাকে বাঁচাবো কি করে? সে কোথায় নিরাপদ? আমার দেবালয়তুল্য ঘরে? তার আলোকবর্তিকা পাঠালয়ে? তার পিতার কাছে? পুরুষ স্বজনদের কাছে? ধর্মগুরুর কাছে? তার স্বপ্নের হাতছানি দেয়া পথের মোড়ে মোড়ে বিপদ। এত অন্ধকার কেন এই সমাজ? আমি আমার “নুসরাত” কে কেন জন্ম দিলাম?

আইনের লড়াই লড়ে যাওয়া যায় অনন্তকাল। আইন আছে না নাই তা নিয়ে তর্ক-বিতর্কে যাওয়া আজকাল খুব অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। অপরাধীর শাস্তি হবে, বা নাও হতে পারে। কি আসে যায় তাতে? আবার আরেক নুসরাতকে আত্মাহুতি দিতে হবে। এটাই তো স্বাভাবিক বলে আমরা মেনে নিয়েছি। আসলে আমাদের অন্ধকার মনে এর চাইতে বেশী কিছু আমরা ভাবতেও পারিনা। আমরা আমাদের কন্যাকে সম্মান করতে শিখিনি, আমরা আমাদের কন্যাকে সমান ভাবতে পারিনা, আমরা আমাদের কন্যাকে উত্তরাধিকারী ভাবার জায়গা তৈরী করিনি। কন্যাকে সম্পত্তির অধিকার দিতে গেলে সমাজপতি, পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তো বটেই, ঘরের মহিলারা, এমনকি কন্যার জন্মদাত্রী মাও মুখিয়ে উঠে।

আসলে এ এক ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ। শিশ্ন-পূজারী এই সমাজ আরও অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। তবে, “নুসরাত” আমাদের লড়তে শিখিয়েছে। আমি লড়ব, আমার “নুসরাত”ও লড়বে। আপনারাও লড়াই করুন। কিন্তু দয়া করে রাজপথে, মিটিং, মিছিলে নয়। ফেসবুকের টাইম লাইনে নয়। মিডিয়া-পত্রিকায় নয়। লড়াই শুরু করুন আপনার মূল্যবোধের ঘরে; জ্বী, আপনার নিজের ঘরে। পারবেন? আর যদি না পারেন, তবে দয়া করে চুপ করে থাকুন। আর দেখতে থাকুন এই শিশ্ন-পূজারী সমাজের মানবিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের পতন। আগুনে শুধু “নুসরাত” নয়, পুড়বে আপনার ঘর, সমাজ, জাতি, পুড়বেন আপনি ও।
নতুন বছরে নতুন লড়াইএর প্রত্যাশায় …

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত