প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডেমোক্রেসি, পার্টিক্রেসি

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার : ড. কামালের জাতীয় ঐক্য কনসেপ্ট ও বাকশালের পার্থক্য কি? জাতীয় ঐক্য হলেতো সব দলকে নিয়ে ঐক্য হতে হবে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বাকশালের কথা টানলেন। বাকশালতো জাতি গঠনের স্বার্থে সব দলের ঐক্যে একটা কোয়ালিশন সরকারের রূপরেখা ছিল মাত্র, ৭৫’ এর পট পরিবর্তনের কারণে একে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।

যদিও আমি মনে করি জাতি গঠনের স্বার্থে বাকশাল তৈরির উপযুক্ত সময় ছিল মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর পরই, এটা যখন গঠন করা হয় ততক্ষণে কনটেক্সট অনেকটা পরিবর্তন বা জটিল হয়ে গিয়েছিল, এবং এখন বাকশাল বা সমরূপ কোন ফর্মুলায় ফিরে যাওয়া বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সম্ভব নয়,সমীচীনও নয় – কারণ এর নেতৃস্থানীয়দের মাঝে আদর্শিক শূন্যতা থাকলে এটি এখন স্বৈরতন্ত্রের থেকেও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ স্বৈরতন্ত্রেও এর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক মুভমেন্ট জেগে উঠে বা উঠতে পারে, এখানে সেই সুযোগটিও থাকবেনা,কালেকটিভ স্বৈরতন্ত্র গড়ে উঠতে পারে; সিন্ডিকেটের মতোই এখানে ক্ষমতাশীলদের সমঝোতা হতে পারে। যেকারণে এত সেফগার্ড (Safeguard) থাকার পরও ব্যুরোক্রেসি তথা আমলাতন্ত্র ফেল করল।

যদিও বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র এখন আর সার্ভ করছেনা। সারা বিশ্বেই এখন কম আর বেশি পার্টিসিক্রেসির আধিপত্য। যতক্ষণ না গণতন্ত্রের উত্তম বিকল্প প্রায়গিক থিউরি আমরা তৈরী করতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত পার্টসিক্রেসিকে বাম দিকে অর্থাৎ গণতন্ত্রের দিকে ঝুকানোই একাডেমিক প্রচেষ্টা থাকবে।

(ডেমোক্রেসি <পার্টিক্র্যাসি > করাপ্ট পলিটিক্স) পার্টিক্রেসির একপাশে আছে গণতন্ত্র আর অন্যপাশে আছে করাপ্ট পলিটিক্স বা দুর্বৃত্ত-করায়ত্ত রাজনীতি।

সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পার্টিক্রেসি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। আর্মস্ট্রং পার্টিক্রেসি শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন গত শতকের ৬০ দশকের শেষার্ধে। পার্টিক্রেসি যতটা বামদিকে ঝুঁকবে ততটা সুশাসন নিশ্চিত হবে, আর যতটা ডানদিকে ঝুঁকবে ততটা সাধারণের বঞ্চনা ও শোষণ বাড়বে। পার্টিক্রেসিতে স্থিতাবস্থায় থাকতে পারাটাও মন্দ নয়, কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে শেষেরটা অনিবার্য।

সংক্ষেপে বললে পার্টিক্রেসি এমন একটি অবস্থা যেখানে সবকিছুই দলীয় রাজনীতির দখলে। এই কারণে এই কাঠামোতে রাজনীতি করতে গেলে পদ পদবী খুব বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতি সংশ্লিষ্ট সবাই পদ পদবীর পিছনে ছুটে; নেতৃত্বের মানদন্ড হয় পদ। ফলে নিজ দলেও প্রতিহিংসা-প্রতারণা জন্ম নেয়।

দলের উৎপত্তি, বিকাশ, গঠনতন্ত্র ও আদিনেতাদের ত্যাগের ইতিহাস এবং এর রাজনৈতিক ও আদর্শিক দর্শন সম্পর্কে জানতে ও মানতে আগ্রহ কমে যায়। কর্মী আর ভলান্টিয়াররা হয় অস্থির ও হতাশ। এই অবস্থায় রাজনীতিতে যদি আগাছা বা আবর্জনা বেড়ে যায় তবে কোন অবস্থাতেই সমাজ থেকে শোষণ, হতাশা, মাদক, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দূর করা সম্ভব নয়। পানি ঢালতে হলে গাছের গোড়াতেই ঢালতে হবে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের মাঝে ইতিকাল লিডারশীপ বা নেতৃত্বের নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ, উচ্চ শিক্ষিত ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ, দলের সাংগঠনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তদলীয় গণতন্ত্রচর্চা, জাতীয় স্বার্থে আপসহীনতা ও সর্বদলীয় ঐক্য স্থাপন এবং এইরূপ স্বার্থকে সবসময় দলীয় স্বার্থের উরদ্ধে রাখা, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়িক স্বার্থের অতি প্রাধান্য নিয়ন্ত্রণ, রাজনীতির দোকানদারি ও বাণিজ্যকরণ নিয়ন্ত্রণ, অস্বচ্ছ রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং সরকারী দলের ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনা ও দল পরিচালনার দায়িত্ব আলাদা টিমের হাতে অর্পণ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত সংস্কার প্রস্তাবনার মধ্যে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ইতিমধ্যে হয়েছে, এবং সরকার পরিচালনা ও দল পরিচালনার দায়িত্ব আলাদাকরণ নিয়েও ক্ষমতাসীন দল ভাবছে। আর প্রথম দুটি প্রস্তাবনা তাত্ত্বিক ও প্রায়গিক উভয়দিক থেকেই বাস্তবায়নযোগ্য এবং এদের ফলাফল বা ইতিবাচক প্রভাব হবে ব্যাপক। বাকি প্রস্তাবনাগুলোকে অনেক তাত্ত্বিক মনে হতে পারে কারণ অবক্ষয় এমন পর্যায়ে যে এখানে শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি। তাই একটি নতুন প্রজন্মকে নিয়েই যাত্রা শুরু করতে হবে। তবে আরও যাতে বিপর্যয় না ঘটে সেজন্য শীর্ষনেতৃত্বের উচিত হবে বাকি প্রস্তাবনাগুলোর বাস্তবায়ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও ভাল।

প্রথম সংস্কার প্রস্তাবটি নিয়ে সিভিল সোসাইটি, বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানরাও কাজ করতে পারে। সরকার ও কর্পোরেট সেক্টর তার সোসাল রেস্পন্সিবিলিটির পার্ট হিসেবে এখানে অংশীদার হতে পারে। যেমন, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ, নতুন প্রজন্মের মাঝে আদর্শিক নেতৃত্বের ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে একটি পাইলট ধারণাপত্র (কনসেপ্ট পেপার) তৈরি করেছে। পাইলট ইনিশিয়েটিভটি কার্যকরিকরণের ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা এবং এর জন্য কৌশলগত অংশীদার অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার শাসন ব্যবস্থা, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ে গবেষক এবং এসোসিয়েট প্রফেসর (সরকার ও রাজনীতি) ও পরিচালক (গবেষণা), এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত