প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেউ আমাদের দাবায় রাখতে পারবা না

প্রভাষ আমিন : বয়সে বাংলাদেশ আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট। মানুষ বড় হলে আস্তে আস্তে ফুরিয়ে যেতে যেতে নিভে যায়। কিন্তু একটা দেশ সময়ের সাথে সাথে নিভতেও পারে, জ্বলতেও পারে; পূর্ণতাও পেতে পারে, আবার ফুরিয়েও যেতে পারে। যেমন পাকিস্তান ক্রমশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তানের কাছ থেকে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে পূর্ণতার দিকে। অথচ একাত্তর সালে বিজয় অর্জনের পর বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সাহস খুব বেশি মানুষের ছিলো না। হেনরি কিসিঞ্জার তো তাচ্ছিল্য করে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন। যতোই দাও, যে ঝুড়ি কোনোদিন ভরবে না। জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত ছোট্ট বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে যে জাতীয় ঐক্য দরকার ছিলো, তা তখন ছিলো না। স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি তো বটেই, এমনকি জাসদের মতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিও সরকারের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। থানা লুট, পাটের গুদামে আগুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেড়াও, ভারতীয় হাইকমিশনারকে অপহরণের চেষ্টা; সব মিলিয়ে সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে জাসদ। যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রে ৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। ৭৫এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ আবার পেছনের পায়ে হাটতে শুরু করে। তারপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সামরিক শাসনের অধীনে চলে দেশ। ২১ বছর দেশে নিষিদ্ধ ছিলেন জাতির জনক। বিকৃত করা হয় স্বাধীনতার ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ২১ বছর পর তার কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরেই ঠিক ট্র্যাকে উঠে বাংলাদেশ। তবে শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় ফিরিয়ে এনে ইতিহাসের গ্লানি মোচনের কাজটি করতে হয়েছে আগে। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি মন দেন উন্নয়নে।

বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবেই বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতাও চেয়েছিলেন, অর্থনৈতিক মুক্তিও চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা এনে দিলেও অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ শেষ করার গুরুদায়িত্ব এখন তার যোগ্য কন্যার কাঁধে। আর তিনিও কী অসাধারণভাবে পালন করছেন সেই দায়িত্ব। এরচেয়ে ভালো করে কাজটি আর কেউ করতে পারতো না। যারা একসময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে তাচ্ছিল্য করেছিলো, তাদের কাছেই বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের বিস্ময়। বাংলাদেশ এখন যে জায়গায় আছে, তিনদশক আগে সেটা ছিলো স্বপ্ন। আজ যেন সবকিছুই হাতের মুঠোয়। মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য- সব সূচকেই বাংলাদেশের অর্জন বিস্ময়কর। সাবমেরিন, পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট- জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে। বাংলাদেশ এখন আর ৫/১০ বছরের কথা ভাবে না, পরিকল্পনা করে শতবছরের। এই বাংলাদেশকে রুখবে, এমন সাধ্য কারো নেই। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই।

তবে উন্নয়নই একটি দেশ বা মানুষের শেষ কথা নয়। পেট ভরলেই হয় না, মানুষ আরো কিছু চায়। তারা চায় পছন্দের মানুষকে ভোট দিতে, তারা চায় আইনের শাসন, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত দেশ, তারা চায় মানবাধিকার। মানুষ জোর গলায় পছন্দের কথা যেমন বলতে চায়, অপছন্দের কথাও বলতে চাই। অনেক সময় মানুষ একবেলা খেয়েও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পেলে খুশি। তাই উন্নয়নের পাশাপাশি চাই গণতন্ত্রও। গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না।

বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত, সমৃদ্ধশালী, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। তার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আমাদের সবটুকুই চাই। উন্নয়নও চাই, তার আগে চাই গণতন্ত্র। চাই কথা বলার অধিকার, সমালোচনা করার সাহস, ভোট দেয়ার স্বাধীনতা।
লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত