প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিঙ্গাপুর পারলে আমরা কেন পারবো না?

বিভুরঞ্জন সরকার : আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে সিঙ্গাপুর যাওয়ার। মাত্র ৭২ ঘণ্টার অবস্থান। এই অল্প সময়েই দেশটিকে যতোটুকু দেখেছি, জেনেছি, তাতে বিস্মিত হয়েছি, মুগ্ধ হয়েছি। একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র, অল্প মানুষ, প্রাকৃতিক সম্পদহীন একটি দেশ কীভাবে মাত্র কয়েক দশকের মধ্য একটি উন্নত, সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হলো, কোন বা কেমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোন জাদু বলে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললেন, তা কিছুটা জানা-বোঝার চেষ্টা করেছি। সিঙ্গাপুর একটি পরিছন্ন, পরিপাটি এবং গোছানো শহর। দেশটির মাটিতে পা দিয়েই অনুভব করা যায় তার সৌন্দর্য় এবং শৃঙ্খলা। সেখানে কোনো অপরাধ প্রবণতা নেই। নেই দুর্নীতি। বহু জাতিসত্তার সমন্বয়ে গঠিত একটি শান্তির দেশ সিঙ্গাপুর। এক সময় জেলে পল্লী হিসেবে পরিচিত একটি নগর রাষ্ট্র এখন শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। দুনিয়ার তাবৎ শক্তিধর রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরকে গণনায় ধরে।

সিঙ্গাপুরের সরকারি নাম প্রজাতন্ত্রী সিঙ্গাপুর, ইংরেজিতে রিপাবলিক অফ সিঙ্গাপুর।
এটি একটি ক্ষুদ্র অথচ ব্যাপকভাবে নগরায়িত দ্বীপরাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণতম প্রান্তে , মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যখানে অবস্থিত।

সিঙ্গাপুরের স্থলভূমির মোট আয়তন মাত্র ৬৯৯ বর্গকিলোমিটার। তটরেখার দৈর্ঘ্য ১৯৩ কিলোমিটার।
১৯৬০-এর দশকে দেশটির আয়তন ছিলো ৫৮২ বর্গকিলোমিটার এবং ২০৩৩ সাল নাগাদ আরো ১০০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বাড়বে। সমুদ্রতলের মাটি, পর্বত ও অন্যান্য দেশ থেকে মাটি সংগ্রহ করে দেশটির স্থলভাগের আয়তন বাড়ানো হচ্ছে।

সিঙ্গাপুর দ্বীপের বেশিরভাগ এলাকা সমুদ্র সমতল থেকে ১৫ মিটারের চেয়ে বেশি উঁচুতে অবস্থিত নয়। সিঙ্গাপরের সর্বোচ্চ বিন্দুটির নাম বুকিত তিমাহ, যেটি সমুদ্র সমতল থেকে ১৬৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গ্র্যানাইট পাথরে নির্মিত একটি শিলা। সিঙ্গাপুরের উত্তর-পশ্চিমে আছে পাললিক শিলা দিয়ে নির্মিত ছোট ছোট টিলা ও উপত্যকা। অন্যদিকে পূর্বভাগ মূলত বালুময় সমতল ভূমি দিয়ে গঠিত।
সিঙ্গাপুরে কোনো প্রাকৃতিক হ্রদ নেই। তবে পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। আমাদের দূতাবাসের একজন কর্মকর্তার কাছে শুনেছি, সিঙ্গাপুর সরকার নাগরিকদের সুপেয় পানির জোগান নিশ্চিত করার জন্য মালয়েশিয়া থেকে প্রচুর পানি আমদানি করে থাকে।
‘সিঙ্গাপুর’ নামটি এসেছে মালয় ভাষার ‘সিঙ্গাপুরা’ থেকে। আবার সিঙ্গাপুরা শব্দটি এসেছে ‘সিংহপুরা’ বা সিংপুর থেকে।

সিঙ্গাপুরের জাতীয় সঙ্গীতের প্রথম লাইন : মাজুলাহ সিঙ্গাপুরা, বাংলায় : সামনে দেখো সিঙ্গাপুর।
হ্যা, ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট স্বাধীনতা লাভের পর থেকে সিঙ্গাপুর শুধু সামনেই দেখছে। সিঙ্গাপুর শুধু এগিয়েই যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের চোখ ধাঁধাঁনো সাফল্যের কাহিনী গল্পকেও হার মানায়।
সিঙ্গাপুর বহু ভাষিক, বহু জাতিক মানুষের দেশ। রাষ্ট্রীয় ভাষাই চারটি : ইংরেজি, ম্যান্ডারিন (চীনা) , মালয় এবং তামিল। আরো কমপক্ষে ২০টি ভাষায় কথা বলার লোক সিঙ্গাপুরে বাস করেন।
সিঙ্গাপুরে ধর্ম বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী মানুষ পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করেন। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি নেই।

একজন ট্যাক্সি চালক, যিনি নিজে ইসলাম ধর্মাবলম্বী, মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে এসেছেন, আমাকে বললেন, ধর্ম নয়, কর্মই মানুষকে বড়ো করে। তাই আমরা কর্মকে বেশি গুরুত্ব দেই।
জনসংখ্যার ৪২.৫ শতাংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ইসলাম ধর্মের অনুসারী ১৪.৯ শতাংশ। খৃস্টান ১৪.৬ শতাংশ। কোনো ধর্মাচারে বিশ্বাস করেন না ১৪.৮ শতাংশ মানুষ। হিন্দু ধর্মের অনুসারী আছেন ৪ শতাংশ।
সিঙ্গাপুরে সব ধর্মানুসারীদের জন্য উপাসনালয় আছে। প্যাগোডা, মসজিদ , মন্দির – আমি নিজেই দেখেছি। তবে মানুষের উপস্থিতি তেমন দেখিনি।

বাংলাদেশের মানুষ যেমন সরকার বদলের জন্য মুখিয়ে থাকে সিঙ্গাপুরের মানুষ তেমন নয়। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে একটি দলই সরকার গঠন করছে, দেশ শাসন করছে। আমাদের দেশের মানুষ বিরোধী দলের প্রতি সহানুভূতিশীল, আর ওখানে মানুষের পছন্দ সরকারি দল। সিঙ্গাপুরে ক্ষমতাসীন দলের নাম পিপলস অ্যাকশন পার্টি (পিএপি)। এছাড়া আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দল আছে। তবে বেশিরভাগ মানুষ সেসব দলের নামও জানে না। ওয়ার্কার্স পার্টি নামের একটি বামপন্থি দলের দুজন প্রতিনিধি পার্লামেন্টে আছেন। বাকি সবাই পিএপির সদস্য। প্রকাশ্য সভা-সমাবেশে রাজনীতিবিদদের বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ নেই। সিঙ্গাপুরের সংসদীয় গণতন্ত্র একটু ভিন্ন মডেলের। বেশি উন্নয়ন, কম গণতন্ত্রÑ এই নীতি সিঙ্গাপুরে কার্যকর।

স্বাধীনতার ৪৮ বছরে আমরাও অনেক উন্নতি করেছি এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে আমাদের আরো অনেক কিছুই অর্জন করা বাকি রয়েছে। আমরা সবার জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারিনি। সবার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ আরো অনেক কিছুই করতে পারিনি। একশ্রেণির মানুষ যেমন বিপুল ধনসম্পদের মালিক হচ্ছে, তেমনি নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়াও আছে। সমাজে ধনবৈষম্য বাড়ছে। সামাজিক স্থিতি ও শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার পরিস্থিতি বিদ্যমান। অনেক মানুষই এখনো বঞ্চনার শিকার।

রাজনীতি ও সমাজ চিন্তায় আমরা গতানুগতিকতার বাইরে কিছু ভাবতে পারি না। সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিন্তু গতানুগতিক পথে হেঁটে সিঙ্গাপুরকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে নেননি। বাংলাদেশ বিপুল সম্ভাবনার দেশ। সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশ। প্রতিবাদের দেশ। প্রতিরোধের দেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বিশ্বমাপের নেতার দেশ। এই দেশের সমৃদ্ধিযাত্রা অবশ্যই অব্যাহত থাকবে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তার যেমন স্বপ্ন আছে, তেমনি স্বপ্ন পূরণের সংকল্পও আছে। আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক বলে পরিচিত লি কুয়ান ইউ তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি দেখেছি, সুগঠিত সরকার কাঠামোও যদি মন্দ লোকের দ্বারা পরিচালিত হয় তাতে করেও জনগণের ক্ষতিই সাধিত হয়। অন্যদিকে আমি অনেক সমাজে সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতা সত্ত্বেও সুনেতৃত্বের বদান্যতায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা হতে দেখেছি’। সরকার তথা রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে একই সঙ্গে ভালো লোক ও সুনেতৃত্বের ওপর জোর দিয়ে সাফল্য পেয়েছিলেন লি কুয়ান। আমাদেরও সেদিকে নজর দিতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারলে সিঙ্গাপুর যা পেরেছে, আমরাও তা পারবো।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত