প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথে ভানুয়াতুতে আটকা পড়েছেন ১০১ জন বাংলাদেশি

ডেস্ক রিপোর্ট : অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুতে ভাগ্যের সন্ধানে গিয়ে আটকা পড়েছেন ১০১ জন বাংলাদেশি। কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের দেশটিতে নিয়ে যাওয়া হলেও কোনো কাজ দেয়া হয়নি। বরং এখন পাচারের মামলার সাক্ষী হিসেবে তারা বন্দি রয়েছেন। দেশে ফেরার সুযোগ তারা পাবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তারা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনও তাদের ফেরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরের বিভিন্ন সময়ে এই ১০১ বাংলাদেশিকে ভানুয়াতু নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের অবৈধভাবে দেশটিতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে চার বাংলাদেশিকে গত নভেম্বর মাসে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আগামী মাসে তাদের আদালতে তোলা হবে। ভানুয়াতু হিউম্যান রাইটস কোয়ালিশন নামে একটি মানবাধিকার সংস্থা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইওএম) সঙ্গে যৌথভাবে এসব বাংলাদেশিকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভানুয়াতু সরকারের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার কাজটি করছে আইওএম। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আটক ১০১ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে আইওএমের কাছে। তবে তারা এখনও কোনো তথ্য বাংলাদেশকে দিতে পারেনি।

ভানুয়াতুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্ড্রু সলোমান নাপুয়াট রয়টার্সকে বলেছেন, এই বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত পাঠানোর আগে তারা আদালতের আদেশের অপেক্ষা করবেন।

এদিকে, ভানুয়াতু সরকারের দেয়া রেশন ও সামান্য আর্থিক সহযোগিতায় এখন দিন কাটাতে হচ্ছে ১০১ বাংলাদেশিকে। রাজধানী পোর্ট ভিলার তিনটি ভবনে তাদের রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে দু’জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আটক বাংলাদেশিদের মধ্যে একজন হারুন অর রশিদ। অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি দেয়ার নাম করে তাকে ভানুয়াতু নিয়ে যাওয়া হয়।

মোবাইল ফোনে হারুন বলেন, এখানে আমাদের জন্য আর কিছুই নেই। আর বাড়ি ফিরে গেলেও জানি না কী হবে। হারুন অর রশিদ জানান, এখানে আটক বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার-কর্জ করে বা জমি বিক্রি করে এসেছেন এখানে। সেই ঋণের টাকা কিভাবে শোধ করবেন, তা নিয়েও মহাদুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

আটক বাংলাদেশিরা বলেন, ভানুয়াতু ও এর প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন দোকানে বিক্রয়কর্মীর চাকরির লোভ দেখিয়ে তাদের নিয়ে আসা হয়। তাদের কারও কারও কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভানুয়াতু আসার পরপরই তাদের নির্মাণ শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে বলে জানান হারুন অর রশিদ। শুধু তাই নয়, তাদের মারধর করা হয়েছে এবং প্রাপ্য মজুরিও ঠিকমতো দেয়া হয়নি বলে জানান তিনি।

হারুন আরও বলেন, এখানে আটকদের কেউ কেউ এই পরিস্থিতিতে আত্মহত্যাকেও অপেক্ষাকৃত শ্রেয় বলে মনে করছেন। কারণ তাদের সামনে তারা আর কোনো পথ দেখছেন না। আবার দেশেও ফিরতে পারছেন না। কারণ, পাচারের মামলায় সাক্ষী হিসেবে তাদের আটকে রাখা হয়েছে, কিন্তু কাজের কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। দেশের ফেরার চাইতে সুযোগ থাকলে ভানুয়াতুতেই কিছু করে খেতে চান বলেও মত দিচ্ছেন কেউ কেউ।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, জনশক্তি রফতানিতে অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ১০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি দেশের বাইরে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছে। এই সংখ্যা আগের যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। তবে অধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশিদের বিদেশে যাওয়ার পেছনে দালালদের একটি চক্রও ব্যাপক সক্রিয়।

ভানুয়াতুতে আটকা পড়া ১০১ বাংলাদেশিও এমন একটি দালালচক্রের খপ্পড়ে পড়েছিল। টাঙ্গাইল ও বরিশালের এই বাংলাদেশিদের ভারত, সিংগাপুর ও ফিজি হয়ে ভানুয়াতু নেওয়া হয়। এর মধ্যে হারুন অর রশিদের বাড়ি টাঙ্গাইলে। তার পরিবার গত বছর অভিযোগ করলে এক দালালকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ভানুয়াতুতে আটক একজন বাংলাদেশি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশে একটি পোশাক কারখানা ছিল তার। দেশের বাইরে পোশাক রফতানি করার সুযোগ পাবেন— এমন প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ভানুয়াতু নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ভানুয়াতুতে গিয়েই তিনি বুঝতে পারেন, তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাকে স্রেফ ধোঁকা দেওয়া হয়েছিল। এখানে এসে আমাকে যে বাজার দেখানো হয়েছে, সেটা এখানে পাচার হয়ে আসা বাংলাদেশিদেরই গড়ে তোলা কয়েকটি তাঁবু দিয়ে বানানো বাজার। ওই দালাল ও পাচারকারীদের কারণে আমি আমার সব হারিয়েছি।’ তার অবর্তমানে তার পোশাক কারখানাটিও বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

ভানুয়াতু হিউম্যান রাইটস কোয়ালিশনের প্রধান অ্যান পাকোয়া বলেন, এখানে যে বাংলাদেশিদের রাখা হয়েছে, তাদের মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে। তাদের খুব সামান্য পরিমাণে খাবার দেওয়া হয়। সেখানকার স্বাস্থ্যসেবারও কোনো সুযোগ নেই। ফলে তারা অসুস্থ হলেও কোনো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এমনকি যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের জন্যও চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই।

পাকোয়া বলেন, বিনামূল্যে চিকিৎসার একটি ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু তা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের। তাদের জন্য যেসব ওষুধ প্রয়োজন, তাও ভানুয়াতুতে সহজলভ্য নয়। সবমিলিয়ে ওই বাংলাদেশিরা ব্যাপকভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

এদিকে, ভানুয়াতুতে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই। তবে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত বছরের নভেম্বরে আইওএম তাদের প্রথম এ বিষয়ে জানায়। তবে তারা বাংলাদেশিদের সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি।

দূতাবাসের একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, আইওএম আমাদের বিস্তারিত তথ্য দিতে পারলে আমরা তাদের নাগরিকত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে এবং তাদের ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারতাম।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত