প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এবার স্কুল কক্ষেই কোচিং বাণিজ্য

ডেস্ক রিপোর্ট : ভিন্ন কৌশলে কোচিং বাণিজ্যে নেমেছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। সরকারকে বোকা বানাতে এখন খোদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে কোচিংয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছেন কোচিংবাজ শিক্ষকরা।

এ ক্ষেত্রে কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি ও আবার কোথাও প্রতিষ্ঠানের প্রধান সহায়তা করছেন। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে কারও কারও বিরুদ্ধে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, উচ্চ আদালত সরকারের কোচিং নীতিমালা বৈধ ঘোষণার পর এই ‘চালাকি’তে নেমেছেন বেপরোয়া ওইসব শিক্ষক ও তাদের রক্ষাকর্তারা। স্বার্থসিদ্ধির জন্য কোচিং বাণিজ্য বন্ধসংক্রান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার সুবিধাজনক ব্যবহার করা হচ্ছে।

ব্যক্তিপর্যায়ের কোচিং অবৈধ হলেও এ কাজে সংশ্লিষ্টদের কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আয়োজিত কোচিংয়ের ধারা তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে আয়ের ১০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা নেয়া হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর শীর্ষে আছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)।

জানতে চাইলে সংস্থাটির মহাপরিচালকের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান যুগান্তরকে বলেন, “এটা একেবারেই অসম্ভব। আইনের অপব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে এটা এক ধরনের কর্ম ‘চতুরতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা নিঃসন্দেহে অপরাধ। এর দায়-দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান প্রধানকে বহন করতে হবে। আমরা ২৭ মার্চই খোঁজ নিয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব।”

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের ২০ জুন ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ জারি করে। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (নিম্ন মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর) এক শ্রেণীর শিক্ষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোচিং পরিচালনা করে আসছেন।

এটি বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এছাড়া অনেক শিক্ষক শ্রেণী কক্ষে পাঠদানে মনোযোগী না হয়ে কোচিংয়ে বেশি সময় ব্যয় করছেন। এখন কোচিং ব্যয় নির্বাহে অভিভাবকরা হিমশিম খাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই পর্যবেক্ষণের যথাযথ চিত্র পাওয়া গেছে। কোচিংবাজ শিক্ষকরা তাদের কাছে পড়তে শিক্ষার্থীদের এক প্রকার বাধ্য করে। শুধু ক্লাসে ফাঁকিই নয়, তাদের কাছে না পড়া শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে-পরীক্ষার হলে নানাভাবে মানসিক হয়রানি ও বঞ্চিত করার অভিযোগ আছে। খোদ ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের এক শিক্ষক অভিযোগ করেন, তার এক ছেলে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজে ইংরেজি ভার্সনে পড়ত।

ছেলেটি ওই শাখার ‘ইমাম’ নামে পরিচিত শ্রেণী শিক্ষকের কাছে পড়ত না। এ কারণে তাকে প্রায়ই মানসিক অত্যাচার করা হতো। একদিন ওই শিক্ষকের কোচিংয়ের ছাত্র ইমতি তার ছেলেকে মারধর করে ঠোঁট কেটে দেয়। কিন্তু ইমতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তার ছেলেকে এক মাসের জন্য স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কোচিং না করায় এসএসসির টেস্ট পরীক্ষার হলে আরেক ছাত্রকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেয়ারও ঘটনা ঘটেছিল একই স্কুলে।

ওই শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, উল্লিখিত স্কুলে কোচিংবাজদের রক্ষায় একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ‘স’ আদ্যক্ষরের এমপিও বন্ধ হওয়া এক শিক্ষক সিন্ডিকেটের হোতা বলে জানা গেছে। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে জাল সনদে উচ্চতর স্কেল গ্রহণের মাধ্যমে সরকারের অর্থগ্রহণের অভিযোগ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উল্লিখিত নীতিমালা জারির পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজধানীর কোচিংবাজ শিক্ষকদের তালিকা করে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ পাঠায় সরকারের কাছে। সে অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় অ্যাকশনে যায়। এর পরই একটি সরকারি এবং একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা দুদকের নোটিশ এবং নীতিমালা নিয়ে হাইকোর্টে একাধিক রিট দায়ের করেন।

সেই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৭ ফেব্রুয়ারি রায় প্রদান করেন আদালত। রায়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে করা সরকারের নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করা হয়। ওই সময়ে এসএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব ধরনের কোচিং বন্ধ রাখতেও আলাদা নির্দেশ দেন।

যে কারণে ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েক দিন কোচিংবাজ শিক্ষকরা বাণিজ্য বন্ধ রাখেন। এরপর স্কুলকেই কোচিং সেন্টারে পরিণত করার ‘বুদ্ধি’ বের করেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে গত এক মাস ধরে কোচিংবাজ শিক্ষকরা ফের বাণিজ্যে নেমেছেন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক নিজের প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী পড়াতে পারবেন না।

অনুমতি সাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের এক ব্যাচের সর্বোচ্চ ১০ জন পড়াতে পারবেন। আর ‘দুর্বল’ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অভিভাবকের সম্মতিতে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা যাবে।

এ ক্ষেত্রে আয়ের ১০ শতাংশ স্কুলের তহবিলে জমা দিয়ে বাকিটা কোচিং করানো শিক্ষকের মধ্যে বণ্টন করা যাবে। কিন্তু এই নীতিমালা লঙ্ঘন করে ব্যক্তির কোচিং বৈধতা দিতে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই কক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছে।

এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ এবং আইডিয়াল স্কুল ও কলেজ অন্যতম। ভিকারুননিসায় কলেজ ভবনে ১২শ’ টাকা করে নিয়ে ‘ব’ আদ্যক্ষরের এক শিক্ষক পদার্থ বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন। ওই শিক্ষকের অধীন একটি সেকশনে ১৬০ জন ছাত্রী আছে। তাদের মধ্যে ৯৭ জনই ওই বিষয়ে ফেল করেছে। যে কারণে ছাত্রীরা পড়তে বাধ্য হয়েছে।

‘ন’ আদ্যক্ষরের গণিতে এবং ‘শ’ আদ্যক্ষরের অর্থনীতির দুই শিক্ষিকাও কলেজ ভবনের রুম বরাদ্দ নিয়ে ছাত্রীদের পড়াচ্ছেন। সূত্র জানিয়েছে, প্রথমে শুক্র-শনিবার ছুটির দিনে কেবল পড়ানো শুরু হয়। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে কলেজ ছুটির পর পড়ানো হচ্ছে। এভাবে আরও কয়েক শিক্ষক-শিক্ষিকা কখনও ছুটির পর আবার কখনও ছুটির দিন স্কুল ও কলেজ ভবনেই পড়াচ্ছেন।

সরেজমিন কয়েক ছাত্রীর সঙ্গে কথা হয়। তাদের দাবি, ভিকারুননিসায় সবচেয়ে বেশি রমরমা বিজ্ঞান বিভাগের কোচিং। ছাত্রীদের পড়াতে বাধ্য করতে ‘ফেল’ ব্যবসা প্রধান হাতিয়ার।

এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের এমসিকিউ এমনভাবে করা হয়, যাতে ছাত্রীরা ফেল করে। এ কারণে ছাত্রীরা পড়তে বাধ্য হয়। এই প্রক্রিয়ায় চলতি বছর প্রথম বর্ষে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় ১৪শ’ ছাত্রীর মধ্যে সহস্রাধিকই ফেল করে। নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন অভিভাবক এ ঘটনা তদন্তের দাবি করেন।

স্কুলে রুম নিয়ে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে এ প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হাসিনা বেগম যুগান্তরকে বলেন, কয়েকজন পড়াচ্ছেন। কিন্তু সঠিক সংখ্যা আমার জানা নেই। তবে যারা ভেতরে পড়াচ্ছেন তাদের বলব নিয়ম মানতে।

অভিভাবকের সম্মতি নিয়ে তা স্কুলে জমা দিতে হবে। তিনি বলেন, ফেল করানোর অভিযোগ সঠিক নয়। একজন শিক্ষক কেন ফেল করাবেন। আমি শিক্ষকদের বলেছি, ছাত্রীদের খাতা অভিভাবকের কাছে দিয়ে দিতে, যাতে তারা দেখতে পারেন তাদের কন্যারা কী লিখেছে।

জানা গেছে, এভাবে আইডিয়ালসহ রাজধানীর আরও কয়েকটি স্কুলে কোচিং বাণিজ্য চলছে। ধানমন্ডি এলাকার একটি সরকারি স্কুল ও কলেজে শুধু স্কুলেই নয়, স্কুল আঙ্গিনায় অবস্থিত সরকারি কোয়ার্টার কোচিংপাড়ায় পরিণত হয়েছে।

আইডিয়াল স্কুলে শুধু ছুটির দিনেই নয়, স্কুল চলাকালেও পড়ানো হয়। এর মধ্যে ছেলেদের সকাল ৭-১২টা এবং মেয়েদের ১২-৬টা পর্যন্ত পড়ানো হয়। অভিভাবকরা বলছেন, সেখানে স্কুলকে রীতিমতো কোচিং সেন্টারে পরিণত করা হয়েছে। এ ছাড়া কোচিং নীতিমালা চ্যালেঞ্জ করে আপিলের পাঁয়তারাও চলছে ওই প্রতিষ্ঠানে। এ ক্ষেত্রে ‘স’ আদ্যক্ষরের এক সহকারী প্রধান এবং ‘ম’ আদ্যক্ষরের এক শিক্ষক নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সূত্র জানায়, ওই প্রতিষ্ঠানে বেশকিছু কক্ষ শিক্ষকদের কাছে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিলের প্রধান ক্যাম্পাসের ৩১৭ নম্বর কক্ষ পেয়েছেন পদার্থ ও রসায়নের শিক্ষক ফখরউদ্দিন। জীববিজ্ঞানের আবুল কালাম আজাদ (কক্ষ-৩১৬), বাংলার আলি মুর্তাজা (কক্ষ নম্বর ৩০১), ওয়াহিদুজ্জামান (৪১৭) ও আজমল হোসেন (৪০৩), ধর্মের খায়রুল হাসান (৫০১), গণিতের নুরুল আমিন (২০৫) ও মুনিরা বেগম (৫০৪), গণিত ও বিজ্ঞানের গোলাম মোস্তফা (২০৬), ফাহমিদা খাতুন পরী (৫০২) ও জাকির হোসেন (৩১২), ইংরেজির আবুল কালাম আজাদ (২০৩), মনিরুল ইসলাম (২০৭), লাভলী আক্তার (৫০৩), তৌহিদুল ইসলাম (৩১১), হাসান মালিক আ. ছালাম (১০০৫) ও নিজাম কামাল (২০৯), পদার্থবিজ্ঞানের কামরুজ্জামান (৪০২) ও জহিরুল ইসলাম (৪০১), বাংলা ও সমাজের উম্মে ফাতেমা (৫০১), সমাজের সাখাওয়াত হোসেন সোহেল (২০৪), রসায়নের জিয়াউল হক জিয়া (৩২২) ও কামরুজ্জামান (১০০৪) নম্বর রুম বরাদ্দ পেয়েছেন। যারা ব্যক্তিগতভাবে কোচিং করছেন তারাই রুম বরাদ্দ পেয়েছেন।

জানতে চাইলে উত্তেজিত হয়ে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ড. শাহানআরা বেগম বলেন, যা করা হয়েছে সরকারের নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। এ কথা বলে ফোনের লাইন কেটে দেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে রুম বরাদ্দ নেয়া শিক্ষকদের একজন আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা ২০-২২ জন রুম বরাদ্দ নিয়েছি। আমার ১৩০-১৪০ জন স্টুডেন্ট আছে। আমি ২০৩ নম্বর রুম পেয়েছিলাম। কিন্তু অনুষ্ঠানের কারণে সেখানে পড়াতে পারি না। কখনও ২০৪ আবার ২০৫ নম্বরে পড়াই। আয়ের দশভাগ আমরা প্রতিষ্ঠানকে দেব। তিনি বলেন, অনেকেই বাইরে পড়ান। আমরা নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পড়াই।
সূত্র : যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত