প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

২৫শে মার্চের রাতে জগন্নাথ হলের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে

অসীম সাহা

আমি এখন এই অন্ধকার মধ্যরাতে সবুজ ঘাসের মাঠে
অসহায় একা একা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রয়েছি;

চারিদিক নিস্তব্ধ, শুন্শান্, এমনকি তপ্তক্লান্ত ঘাসগুলোও
মাটির চাদরে নিঃসঙ্গ মাথা রেখে ঘুমিয়ে রয়েছে
আকাশের কোথাও কোনো নক্ষত্রেরা জেগে নেই আজ
শুধু আমাকে ঘিরে প্রাচীরের চার-পাশে উদ্যত সঙ্গিন হাতে
ঘুরে বেড়াচ্ছে হানাদারবাহিনীর রক্তচোষা হায়েনার দল।

আমার ভেতরে সংশয়ের ঘূর্ণাবর্তে চক্রাকারে কেঁপে উঠছে
হাহাকার, বিদীর্ণ আত্মার করুণ ক্রন্দন।

আমি তখনো বুঝতে পারছি না, আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে
কালাপাহাড়ের মতো নগ্নতম মৃত্যুর দূত
ধেয়ে আসছে পর্বতের চেয়ে উঁচু জলোচ্ছ্বাসের মতো রক্তাক্ত হাওয়া।

ধেয়ে আসছে সহস্র সহস্র মাইল দূর থেকে হায়েনার রক্তের নদী।
তখন নিঝুম রাতে আমাদের নিরপরাধ সন্তানেরা কী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে!
আমি সেই রাতের কথা বলতে গিয়ে শিহরিত হয়ে উঠছি
আমি ২৫শে মার্চের কথা বলতে গিয়ে
কম্পমান আতঙ্কের ঝাঁকুনিতে আর্তনাদ করে উঠছি
আমি জগন্নাথ হলের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে
পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণ্যতম, সবচেয়ে বর্বরতম রাতের
রক্তাক্ত ইতিহাসের ভেতরে থর থর করে কেঁপে উঠছি।

তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?
আমি মৃণাল বোসের গলিত লাশের ওপরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে
সারা পৃথিবীকে আমার আর্তনাদের কথা জানিয়ে দিচ্ছি,
আমি আমার পশ্চিমদিকের টিনশেডের নিচে ঘুমিয়ে থাকা
কবি আবুল কাসেমের রক্তাক্ত লাশের দিকে তাকিয়ে
অশ্রুর গহন সাগরে ডুবে যাওয়ার কথা জানিয়ে দিচ্ছি
এমনকি আমি হায়েনাদের হাত থেকে একমাত্র বেঁচে থাকা
আমার ভাই কালীরঞ্জন শীলের মুমূর্ষু হাহাকারের ভেতরে
নিজের অস্তিত্বহীনতার ভয়ে অচৈতন্য হয়ে পড়ার কথা জানিয়ে দিচ্ছি।

আমি পৃথিবীর সকল নির্যাতিত, আহত, ক্ষত-বিক্ষত মানুষকে
সেই সব নিরীহ বাঙালি সন্তানের সম্মিলিত আর্তনাদের কথা জানিয়ে দিচ্ছি।
আমি আমাদের প্রিয় প্রফুল্লদার দীর্ঘতম মৃতদেহের কথা জানিয়ে দিচ্ছি
আমি পৃথিবীর সব সংঘাত, সব সংঘর্ষ থেকে দূরে থাকা
হিন্দুস্থানি দারোয়ান, মালি এবং তাদের বুকফাটা কান্নার কথা জানিয়ে দিচ্ছি।

আমি আলাভোলা দার্শনিক গোবিন্দ চন্দ্র দেবের কথা জানিয়ে দিচ্ছি
আমি আধুনিকতম আলোকচ্ছটার প্রতীক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার কথা জানিয়ে দিচ্ছি
আমি ইতিহাসের আলোয় স্নাত সন্তোষ ভট্টাচার্যের কথা জানিয়ে দিচ্ছি
আমি যৌবনের উচ্ছলতার প্রতীক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের কথা জানিয়ে দিচ্ছি।

তোমরা শুনতে পাচ্ছো কি বাংলাদেশ, এই জগন্নাথ হলের সবুজ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে
আমি সেই সব অজাতশত্রু মানুষের কথা জানিয়ে দিচ্ছি, যাদের রক্তমূল্যে কেনা
লাল আর সবুজের মানচিত্রে লেখা আছে এই প্রিয় স্বদেশের নাম;
যাকে আমরা আমাদের অশ্রুর ভেতর থেকে জেগে ওঠা নাম ধরে ডাকি
যাকে আমরা আমাদের ভ্রাতা-ভগ্নি, পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা
ত্রিশ লাখ শহিদ আর দুই লক্ষ নারীর সম্ভ্রম হারানো বেদনার ভেতর থেকে ডাকি
সন্তান হারানো পিতা, স্বামী হারানো স্ত্রী, পিতা হারানো ভাইবোন,
আর তাদের অশ্রুজল ও করুণ দীর্ঘশ্বাসের ভেতর থেকে ডাকি।

হায় ২৫শে মার্চ, হায় ১৯৭১, হায় আমার প্রিয় বাংলাদেশ
এতো রক্ত নিলে যদি, কেন তবে এই দেশে
হায়েনার সহোদর স্বাধীনতা-বিরোধীর রক্তচিহ্নে
অন্তত জগন্নাথ হলের প্রিয় প্রান্তরে ঘুমিয়ে থাকা ঘাসের ডগাকে কেন
একটুও রাঙিয়ে দিলে না?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত