প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফেসবুক মানুষকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে

মো. তৌহিদ এলাহী : প্রতিদিনের কার্যকলাপ ফেসবুকে জানান দেয়া এখন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কে কতটা আনন্দের সাথে জীবন কাটায় তার যেন প্রতিযোগিতা চলছে ফেসবুকে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বরং বলছে, ফেসবুক মানুষকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে। কিন্তু তারপরও কেন মানুষের নিজেকে সুখী দেখানোর নিরন্তর এত চেষ্টা?

বিবিসি বাংলা বুধবার এই প্রতিপাদ্য নিয়ে কথা বলেন অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারীর সাথে । এমনই একজন যুবাইর ইবনে কামাল, ঢাকার যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসায় আলীম দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বয়স ১৯ বছর। তার প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের অনেকের মতো তিনিও ফেসবুকে সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

তিনি বলেন, “সর্বশেষ মঙ্গলবারই একটা আইসক্রিম পার্লারে গিয়েছিলাম। আমাদের এলাকায় নতুন হয়েছে। সেখানে গিয়ে সাথে সাথেই একটা ছবি চেক-ইনসহ পোষ্ট করেছিলাম।”

তিনি আরও বলেন, “আমি যখন দেখি একটা নতুন মুভি বের হয়েছে, আর সবাই দেখছে, আমার কাছে মনে হয় সবাই তো দেখছে আমি মনে হয় আনহ্যাপি বা ওই গণ্ডির বাইরে। সুতরাং আমার আবশ্যিকভাবে এটা দেখতে হবে। আর যখন এটা দেখি তখন আমার মনে হয় যেহেতু দেখেছি তাই সবাইকে জানানো প্রয়োজন যে আমিও তোমাদের মতোই হ্যাপি।”

তিনি বলেন, এটা অবচেতন মনেই কীভাবে কীভাবে যেন হয়ে যায়। ইবনে কামাল বলেন অবচেতন মনেই তিনি ফেসবুকে অনেক কিছু করেন।

ঢাকায় একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী সাজিয়া আফরিন। তিনি বলছেন, ফেসবুকে মূলত হাসিখুশির বিষয়ে পোষ্ট করাই তার ভালো লাগে। যেমন বন্ধুদের নিয়ে ঠাট্টা করা, মজার কিছু কোথাও দেখলে সেটা শেয়ার করা।

তিনি বলেন, কোথাও বেড়াতে গিয়ে ফিরে আসার পর অন্তত একমাস প্রতি রাতে তিনি সেখানকার ছবিগুলো ফেসবুকে নেড়েচেড়ে দেখেন। এটা তাকে সুখী করে।

তিনি আরও বলেন”দেখা গেলো একদিন আমার মন খারাপ বা মেজাজ খারাপ কিন্তু আমি ফেসবুকে ফানি কিছু দিচ্ছি। আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা হচ্ছে যেদিন আমার সুখী হবার কোন কারণ নেই সেদিন ওই পোস্টটা দিয়ে আমি সুখী হয়ার কারণ খুঁজে নেই।”

ফেসবুকের সাথে সুখের কি সম্পর্ক? বাস্তব জীবনের চেয়ে ফেসবুকের অবাস্তব জগতে মানুষকে অনেক বেশি সুখী কেন মনে হয়? মানুষের মধ্যে নিজেকে সুখী দেখানোর এই চেষ্টাই বা কেন?

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলছেন, “অন্যের কাছে নিজেকে আমরা সফল বা সুখী দেখাতে চাই। সেটা আমাদের ব্যক্তিত্ব ও পরিচয় তৈরিতে সাহায্য করে। এই দেখানোটা সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই পরে। সোশাল মিডিয়া আমাদেরকে তার জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে। যেমন চায়ের দোকানে চা খেতে গেলে আপনি কিন্তু ফেসবুকে ছবি দেবেন না। একটা ব্রান্ড কফি শপে গেলেন তখন কিন্তু ছবিটা দেবেন।”

তিনি বলছেন, “অন্যের চোখের মাধ্যমে আমরা আসলে বোঝার চেষ্টা করি আমি সামাজিকভাবে ঠিক আছি কিনা, ঠিক যায়গায় আছি কিনা। আমি অন্যে চোখের দৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে দেখতে পাই। এসব জিনিস পোষ্ট করে আমি বুঝতে পারি অন্যরা আমাকে কিভাবে দেখছে।”

সামিনা লুৎফা বলছেন, “সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলো জনপ্রিয় হয়ার আগে প্রতিবেশী, আত্মীয় বা সহকর্মীর সাথেও একইরকম গল্প করার বিষয়টি ছিল। তখনও মানুষ নিজেদের সুখ ও সাফল্যের কথা শোনাতে চাইতো। এখন তার মাধ্যম ও মাত্রা বদলেছে।”

সামিনা লুৎফা মনে করেন মানুষের বন্ধনগুলো ধীরে ধরে অনেক শিথিল হয়ে যাচ্ছে।

গবেষণা বলছে, ফেসবুক মানুষকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনোবিজ্ঞানী ইশরাত শারমিন রহমান বলেন, “ধরুন এক দম্পতি ফেসবুকে দেখছে যে অন্য একটা কাপল দেশের বাইরে ঘুরতে যাচ্ছে, বাইরে নিয়মিত খেতে যাচ্ছে, দামি কাপড় পরছে। তখন তারা মনে করছে আমি পারছি না কেন? আমার তো নিত্যদিন চলাটাই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিজের জীবনের সাথে এই তুলনা তার মন খারাপ করে দিচ্ছে।”

সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন জীবনে ভার মুক্ত হওয়ার জন্যে, ক্ষোভ ও দু:খের কথা জানানোর জন্যেও, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো যেন এখন একটা জায়গা হয়ে উঠেছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত