প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটের অভিশাপ ‘কোলপ্যাক’

স্পোর্টস ডেস্ক : কাইল অ্যাবট ও রাইলি রুশোর কোলপ্যাকে হ্যাম্পশায়ার খেলতে যাওয়ার খবরটা বেরিয়েছে তখন। ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকার সংবাদ সম্মেলনে হাজির তিনজন- তখনকার প্রোটিয়া কোচ রাসেল ডমিঙ্গো, প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাত ও অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসিস। তিনজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শান্ত ডু প্লেসিস। হয়তো তিনি অন্য দিককার গল্পটা জানেন বলে। শুধু কোলপ্যাক-অভিজ্ঞতা তার আছে তা নয়, ডু প্লেসিস চাইলে হয়তো খেলতে পারতেন ইংল্যান্ডের হয়েও।

অ্যাবট যেমন হুট করেই ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে হাজির হননি, ২০০৬ সালে তিনি খেলতে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের ডেভনের ডি গ্রেডের এক লিগে। ক্রিকএক্স নামের যে এজেন্সির মাধ্যমে অ্যাবট গিয়েছিলেন, সেই তারাই নিয়ে গিয়েছিল ডু প্লেসিসকেও। ল্যাঙ্কাশায়ারের র‌্যামসবটম ক্রিকেট ক্লাব থেকে লিভারপুল ক্রিকেট ক্লাব হয়ে নটিংহ্যাম লিগে খেলেছিলেন ডু প্লেসিস।

নটিংহ্যামশায়ারের দ্বিতীয় একাদশের এক ম্যাচে ডু প্লেসিস করলেন ডাবল সেঞ্চুরি, এরপর টানা তিন ম্যাচে সেঞ্চুরি। ২১ বছর বয়সী ডু প্লেসিসকে একটা চুক্তির প্রস্তাব দিল নটিংহ্যামশায়ার। তাদের হয়ে পেশাদার ক্রিকেট খেলার জন্য তিন বছরের এক চুক্তির প্রস্তাব। তবে সঙ্গে শর্ত ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার জন্য যোগ্য বিবেচিত হলে তাকে করতে হবে সেটাই। ডু প্লেসিসকে কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাই।

২০০৮ সালে ল্যাঙ্কাশায়ার আবার কোলপ্যাক প্রস্তাব দিল ডু প্লেসিসকে, এবার ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার শর্তটা ছাড়াই। ডু প্লেসিস মানলেন। তবে ২০১০ সালে ফিরে আসতে হলো তাকে। ততোদিনে বদলে গেছে কোলপ্যাকের নিয়ম। চার বছরের কাজের অনুমতি বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নির্দিষ্ট সংখ্যক ম্যাচের অভিজ্ঞতা থাকতে হতো কোলপ্যাকের অধীনে খেলতে।

ডু প্লেসিস ফিরে গেলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। ততদিনে অবশ্য টাইটানসে জায়গাটা পোক্ত হয়েছে তার। ২০১২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে অভিষেকে অ্যাডিলেডে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৭৬ বলে খেলে ১১০ রানে অপরাজিত থেকে ড্র করা ম্যাচে হলেন ম্যাচসেরা। ডু প্লেসিস এখন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক। তবে সবার গল্পটা ডু প্লেসিসের মতো হয় না। সবাই কোলপ্যাক থেকে ফিরেও আসেন না।

এখন কথা হলো, এই কোলপ্যাক রুল কী?

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইইউ-র সদস্য দেশগুলির নাগরিকরা অন্য যে কোনও সদস্য রাষ্ট্রে কাজ করার অনুমতি পান। ‘কোটোনু অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ‘ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েসন অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ইইউ-র সঙ্গে সমঝোতা করা ৭৮টি দেশের সদস্যরাও এমন সুবিধা কেন পাবেন না, এ নিয়ে ‘ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ জাস্টিস’-এ যান স্লোভাক হ্যান্ডবল প্লেয়ার মারোস কোলপ্যাক। এরপর থেকে ইইউ-র নাগরিকদের মতো সমঝোতা স্বাক্ষরকারী দেশগুলির নাগরিকরাও সমান স্বাধীনতা পান কাজ ও চলাচলের ক্ষেত্রে। কোলপ্যাক এই রুল দিয়েই ঢুকে গেছেন ইতিহাসে।

ক্রিকেটে কোলপ্যাক

ইইউ-র সঙ্গে সমঝোতা আছে এমন দেশগুলির মাঝে ক্রিকেটে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডও। ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকান বাঁহাতি স্পিনার ক্লডি অ্যান্ডারসন প্রথম কোলপ্যাকে যাওয়া ক্রিকেটার।

কোলপ্যাকে গেলে কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়তে হয়?

হ্যাঁ। তবে চাইলে কোলপ্যাক বাদ দিয়ে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে পারেন তারা। কোলপ্যাকে খেললে যে দেশ থেকে ক্রিকেটার গেছেন, সে দেশেও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে পারেন তারা। তবে শর্ত হচ্ছে- খেলতে হবে ইংল্যান্ডের ক্রিকেট মৌসুম ছাড়া অন্য সময়।

ব্রেক্সিটের প্রভাব কী?

যুক্তরাজ্য ইইউ ত্যাগ করলে কোলপ্যাক রুলিং অকার্যকর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অ্যাবট, রুশো, মরকেলের পর এবার অলিভিয়ারের কোলপ্যাকে যাওয়ার খবরে তাই নড়ে বসে ক্রিকেট। টলে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ক্যারিয়ারটা যখন পেখম মেলতে চাইছে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে, অলিভিয়ার তখনই যে উড়ান দিলেন অন্য দিগন্তে।

কিন্তু, কেন? প্রশ্নটা যতোটা সোজাসাপটা, উত্তর ততোটা নয়। কোলপ্যাকে যাওয়ার ক্রিকেটারদের কাউন্টি দলগুলি আর্থিকভাবে যেরকম মূল্য দেয়, দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া কাঠামো তেমন দিতে পারে না। সেখানে অনেক ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে চিত্রটা হতাশার। পেসার ডেল ডিব যেমন অবসরে গেছেন ২৫ বছর বয়সেই। ঘরোয়া ওয়ানডে কাপের সেরা ক্রিকেটার হয়েও যে অর্থের চুক্তির প্রস্তাবনা পেয়েছিলেন, ঠিক ‘যথেষ্ট’ ছিল না সেটা। ডিব এখন একটা ‘অফিসের সিলিং ও পার্টিশন সাপ্লাইয়ার’ কোম্পানিতে কাজ করেন। ডিব হয়তো কলপ্যাক দিয়ে ক্রিকেটে টিকে থাকার চেষ্টাই করেননি।

স্মিটকে অবশ্য এজন্য প্রোটিয়াদের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিনিধিত্ব করার গৌরবটা ত্যাগ করতে হয়নি। যেটা হয়েছে অ্যাবট, রুশোদের, যেটা করতে হচ্ছে অলিভিয়ারকে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ড সিএসএ বরাবরই ‘হতাশ’ হয় কোলপ্যাকে কোনও ক্রিকেটার যাওয়ার পর, তাদের পেছনে ‘অনেক লগ্নি’টা অকালেই বৃথা যাচ্ছে বলে। তবে হতাশা ব্যক্ত করা ছাড়া আপাতত যেন আর কিছু করার নেই তাদের।

আবার এমন শৃঙ্খল আগেভাগেই কাটিয়ে যেতে চান কেউ কেউ। অনিশ্চিত ভবিষ্যতে পা মাড়াতে চান না কেভিন পিটারসেন, জোনাথন ট্রট বা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকাকে নেতৃত্ব দেওয়া কিটন জেনিংসরা। ইংল্যান্ড তাদেরকে দেয় অপেক্ষাকৃত নিশ্চিত এক ভবিষ্যত।

অবশ্য আছে অন্য প্রেক্ষাপটও। কলিন ইনগ্রাম যেমন ২৭ বছর বয়সে কোলপ্যাকে গিয়েছিলেন ‘কাউন্টি ক্রিকেটের স্বাদ নিতে’। তার মতে, এ বয়সে এসেও কাউন্টিতে খেলতে না পারাটা মানতে পারেননি তিনি। ১২ টেস্ট খেলা ব্যাটসম্যান স্টিয়ান ভ্যান জিলের মতটাও প্রায় একই। আবার সাইমন হার্মারদের মতো কেউ কোলপ্যাকে যান কাউন্টিতে খেলে নিজের খেলাটা উন্নত করতে।

সব মিলিয়ে একদিকে ইংল্যান্ডে যেমন ‘মেধা’ চলে যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে, অন্যদিকে ইংল্যান্ডও ভুগছে আরেক সমস্যায়। এতো ‘বিদেশী’ ক্রিকেটাররা খেলছেন বলে সেখানকার স্থানীয় ক্রিকেটাররা সুযোগ ‘কম পাচ্ছেন’ বলেও অভিযোগ আছে অনেকের। অবশ্য অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞদের সংস্পর্শে ইংল্যান্ডের তরুণ ক্রিকেটাররা অনেক কিছু শিখতে পারেন বলে পাল্টা যুক্তিও আছে।

কাউন্টিতে ‘বিদেশী’ বা ‘কোলপ্যাক ক্রিকেটার’দের বাঁধ দিতে চুক্তি করা দলকে জরিমানার ব্যবস্থাও করেছিল ইসিবি। ‘চার বছরের কাজের অনুমতি’ বা ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা’ নিচের স্তরে সংখ্যাটা কমিয়েছে, শীর্ষ পর্যায়ে অবশ্য তাতে খুব একটা লাভ হয়নি সেদিক দিয়ে। আবার জেনিংস বা জাফরা আর্চারদের নিয়েও কম মাতোয়ারা নয় ইংলিশ ক্রিকেট।

তবে এতো আলোচনার পরও তাই প্রশ্ন ওঠে কলপ্যাক নিয়ে, যেসবের উত্তর ঠিক মেলে না। হয়তো যে পৃথিবীতে অনেক কিছু হাতের মুঠোয় হলেও পাসপোর্টে জমা থাকা দেশ-পরিচয়ের ভিন্নতা ছিন্ন করা যায় না, হয়তো যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে অভিবাসীর আগমন বন্ধের জোর চেষ্টা করে যান, অন্যদিকে অস্কারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জেতেন মিশর বংশোদ্ভুত রামি মালেক, হয়তো সে পৃথিবীর ক্রিকেটে আরেক দেশে গিয়ে খেলার জন কোলপ্যাক পেরিয়ে যাওয়া এক অনিবার্য সমস্যা।

হয়তো এ সমস্যার সমাধান হিসেবে আসবে কিছু একটা। অথবা সেই সমাধান তৈরি করবে আরেক জটিলতা, যা থেকে তৈরি হবে আরেক সমস্যা। কোলপ্যাক, অথবা ভিন্ন নামে। (প্যাভিলিয়ন থেকে)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত