প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চুড়িহাট্টায় এখনো স্বজনহারাদের বিলাপ

ডেস্ক রিপোর্ট : চুড়িহাট্টা। স্বজন হারানোর কাছে এক মৃত্যুপুরীর নাম। চুড়িহাট্টা মোড়ের অদূরে শাহীন আহমেদের বাসা। জানালা খুলে অপলক দৃষ্টিতে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনে তাকিয়ে থাকেন তার স্ত্রী ময়না বেগম। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনলেই এগিয়ে যায় এই দম্পতির সাত বছর বয়সী মেয়ে হুমায়রা। কিন্তু শাহীন আহমেদ আসেন না। কোনোদিন আর আসা হবে না। চুড়িহাট্টার আগুনে পুড়ে মারা গেছেন তিনি।

প্রায়ই চুড়িহাট্টা মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তার স্ত্রী ময়না। ওয়াহেদ ম্যানশন, রাজমহল রেস্টুরেন্টের দিকে তাকিয়ে নীরবে কান্না করেন তিনি। গতকাল দুপুরে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘক্ষণ। বোরকা পরনে। সঙ্গে ছোট্ট মেয়ে হুমায়রা। ময়না বেগম বলেন, জানি তিনি আর কখনো ফিরবেন না। তবু মন মানে না। এদিকটায় (চুড়িহাট্টা) এলেই নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। ছোট্ট মেয়েটি এখনো মনে করে তার বাবা ফিরে আসবে। ঘুমানোর আগ পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকে। শাহীন-ময়না দম্পতির তিন সন্তান। বড় সন্তান সাফোয়ানের বয়স ১৩, মেজো সন্তান হাফসার বয়স ১১ ও আর ছোট সন্তান হুমায়রার বয়স সাত বছর। একইভাবে চুড়িহাট্টা মোড়ের হায়দারবক্স লেনে একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এক নারী। তার নাম সোমাইয়া জামান। সোমাইয়া বলেন, এখানেই আমার ভাইটি পুড়ে মরেছে। আহা, কত কষ্ট পেয়েছে। আমার ভাইটি অনেক ভালো মানুষ ছিলো। তাকে এভাবে মরতে হলো কেন। আমি কি আর এই জীবনে ভাইকে পাবো। বলেই কাঁদছিলেন সোমাইয়া আজিজ। চুড়িহাট্টা
ট্র্যাজেডিতে ভাইকে হারিয়ে পাগলপ্রায় তিনি। আগুনে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া পিচঢালা পথের মাটি ছুঁয়ে বারবার একই কথা বলছিলেন। কাঁদছিলেন। গতকাল দুপুরে ওই সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় থমকে দাঁড়ান তিনি। সোমাইয়া জামান জানান, চুড়িহাট্টা মোড়ে দোকান ছিলো তার ভাই ইয়াসিন খানের। দোকান বন্ধ করে নন্দকুমার দত্ত রোডের বাসায় ফিরছিলেন তিনি। এরমধ্যেই আগুনে পুড়ে মারা যান।

অনেক খোঁজাখুঁজি করে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে লাশ পেয়েছেন তার। সোমাইয়া বলেন, অনেক লাশের ভিড়ে ভাইয়ের লাশ খুঁজে বের করতে বেগ পেতে হয়েছে। আগুনে পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া মানুষের শরীর। ওই দিনের পর থেকে ঘুমাতে গেলেই লাশের দৃশ্য চোখে ভাসে। ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না তিনি। বাসার বাইরে বের হয়ে চুড়িহাট্টার দিকে গেলে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারেন না তিনি। সোমাইয়া বলেন, কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে গেছে। এখন আর জল আসে না। তিনি আশা করেন এবার অন্তত কেমিক্যালের বিষয়ে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্টরা। এভাবে আরেকটা নিমতলী, আরেকটা চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি নিশ্চয়ই আবার ঘটুক তা তারা চাইবেন না।

একই প্রত্যাশা পুত্র হারানো নাসির উদ্দিনের। চকবাজারের এই ব্যবসায়ীর একমাত্র পুত্র ওয়াসি উদ্দিন চুড়িহাট্টার আগুনে পুড়ে মারা গেছে। নাসির উদ্দিন জানান, পুত্রকে হারিয়ে তার মা শয্যাশায়ী।
গত মঙ্গলবার চুড়িহাট্টার দিকে গিয়েছিলেন ওয়াসি উদ্দিনের মা। ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে যেতেই ‘বাবা বাবা’ বলে চিৎকার করছিলেন তিনি। দ্রুত আশপাশের লোকজন তাকে সরিয়ে নিয়ে যান। বাসায় এসে অসুস্থ হয়ে যান। নাসির উদ্দিন বলেন, চুড়িহাট্টা আমাদের সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে। ১৬৭টি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আমাদের বুকে একটা বিশাল ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এই ক্ষতের যন্ত্রণা সন্তান হারা পিতা-মাতা ছাড়া কেউ বুঝবে না।

তিনি বলেন, সন্তান হারিয়েছে। আমার এখন ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া নেই। আমি সকলের নিরাপত্তা চাই। সবাই নিরাপদ জীবন-যাপন করুক, সেটাই চাই।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনই অনেক মানুষ চুড়িহাট্টায় ভিড় করেন। তাদের অনেকেই কান্নাকাটি করেন। বিমর্ষ চেহারা নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। আবার কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে আসেন। স্বজন হারানোদের কাছে চুড়িহাট্টা এক মৃত্যুপুরীর নাম। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এএসআই আজাদ জানান, প্রতিনিয়ত অনেক মানুষ চুড়িহাট্টায় আসে। প্রয়োজন ছাড়া সাধারণত পুলিশ সবাইকে ঢুকতে দেয় না। ওই জায়গাটা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর বলে জানান তিনি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত