প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গুজব, অনুমান আর মিডিয়ার দায়িত্ব

তাসমিয়া নুহিয়া আহমেদ : সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে কোন ঘটনা সঠিকভাবে পাওয়ার সক্ষমতা এবং পরে কোন ভুল হয়ে গেলে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করে নেয়ার ওপর। সাংবাদিকদের একটি ঘটনার এই দু’টি দিক সম্পর্কেই তাদের দায়িত্বকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। সেই সাথে ঐ বিষয়ে নিজস্ব মতামত দেয়া থেকে নিজেদের বিরত থাকতে হবে। একজন সাংবাদিক তখনই একটি সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন, যখন তিনি তার দায়িত্বকে পেশা মনে করেন ও গুরুত্বের সাথে নেন। দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সম্ভবত এই নিয়মটি ভুলে গেছে। অনেকগুলো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাই তারা পেশাদার সাংবাদিকের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আর এভাবেই ভুয়া সংবাদের জন্ম হচ্ছে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমের একটি সংবাদ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আর সেটি দাবানলের মতো ছড়িয়েও পড়েছে। ঘটনাটি হলো-বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা। বিভিন্ন গণমাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন সংবাদ পরিবেশন করেছে যে, রবিবার রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং-৭৩৭ বিমানটি ছিনতাই করেছে ২৫ বছরের এক যুবক। পরে তাকে গুলি করা হলে সে নিহত হয়। বিমানটি ঢাকা থেকে চটগ্রাম হয়ে দুবাই যাচ্ছিলো। যুবকটি বিমান উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিলে, চট্টগ্রাম শাহ্ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৫টা ৪১ মিনিটে পাইলট জরুরি অবতরণ করেন। গণমাধ্যমগুলো আরো জানিয়েছে যে, প্রায় ১০ মিনিট ধরে চলা অভিযানের পর, বিমানটির ১৩৪ যাত্রী ও ১৪ ক্রু’র সবাইকে নিরাপদে বের করে আনা হয়েছে। আইএসপিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুয়ায়ী, ছিনতাইকারী এক কেবিন ক্রুকে জিম্মি করার সময়, অন্য ক্রুরা যাত্রীদের সুকৌশলে বিমান থেকে বের করে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার সারোয়ার-ই-জামান জানিয়েছেন, ‘ছিনতাইকারী মানসিক ভারসাম্যহীন। স্ত্রীর সাথে তার ঝামেলা চলছিলো বলেই সে বিমানটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে এবং সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলো’। এক যাত্রী জানিয়েছেন, তিনি দু’বার গুলির আওয়াজ শুনেছেন।

গণমাধ্যমগুলো তার পরিচয়ও নানাভাবে প্রকাশ করেছে। একবার ছিনতাইকারী যুবককে মাহাদী একবার মোহাম্মদ পলাশ আহমেদ হিসেবে উল্লেখ করছে। কথিত এই বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার ১৭ ঘণ্টা পরও, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করতে পারেনি যে, ঐ ঘটনায় ব্যবহৃত পিস্তলটি খেলনা নাকি আসল! দক্ষিণ-পূর্ব চট্টগ্রামের এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ছিনতাইকারীর শরীরে কোন বোমা পাওয়া যায়নি এবং তার হাতের পিস্তলটি খেলনা পিস্তল ছিলো। এভাবেই বিভিন্ন গণমাধ্যম বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করছে।

তবে এই সংবাদটি শুধুই এক উদাহরণ। বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের নানা ভুয়া সংবাদের কবলে পড়ি আমরা।

এ বিষয়ে আফসান চৌধুরীর একটা লেখা খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছেন, সংবাদ সংগ্রহে বুভ্ক্ষু মিডিয়াগুলো অনেক সময় মনে করে সমাজ পরিবর্তন কিংবা সমাজের উন্নয়নের দায়িত্ব বুঝি তাদেরই। কিন্তু এটা পুরোপুরি ভুল। তাদের আসলে যেমনভাবে ঘটনাটি দেখেছেন, ঠিক তেমনিভাবে রিপোর্ট লিখতে হবে। সেখানে বাড়তি বিন্দুমাত্র মেদ লাগানো যাবে না। কোন ধারণা বা অনুমানকে রিপোর্টে যুক্ত করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, একটি রিপোর্ট প্রচার হওয়ার পর লাখ লাখ লোক সেটি দেখে, বা পড়ে। কাজেই সামান্য ভুল হলেও তার প্রতিক্রিয়া হয় মারাত্মক। আফসান চৌধুরীর মতে, এ কারণেই হয়তো এ দেশের মানুষ পেশাদার মিডিয়াগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

সাংবাদিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব কি?- তা উপলব্ধি করার এটাই সময়। খুব প্রলুব্ধকর হলেও জনগণকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়, এমন ঘটনা পরিবেশন সম্পর্কে সতর্ক থাকবো আমরা। আমাদের জানা দরকার, সাংবাদিকতা মানে ভুয়া সংবাদ তৈরি করা নয়। মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর প্রতি জনগণের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, ডেইলি আওয়ার টাইম। (মূল ইংরেজি থেকে অনূদিত ও ঈষৎ সংক্ষেপিত)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত