প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সবাই বড় কথা বলে কাজে নেমে চুপসে যায়

ড. সা’দত হুসাইন : সম্প্রতি আমি গাজীপুর গিয়েছিলোম। আমার গন্তব্যস্থল ছিলো সিটি কর্পোরেশনের সীমান্ত ঘেঁষা একটি গ্রাম, যার অবস্থান সখিপুর স্কাউট পল্লী এবং আনসার একাডেমির বিপরীতে রাস্তার উত্তর পাশে। আমার নিকুঞ্জের বাসা থেকে এ গ্রামে যেতে সময় লাগার কথা এক ঘণ্টা বিশ মিনিট। ভাঙাচোরা রাস্তা এবং ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ চলার কারণে দু’একবার এ সময়টা পৌনে দু’ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকেছিলো। একবার প্রচ- বৃষ্টি-কাদার কারণে গাড়ি চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ায় সময় বেশি লেগেছিলো, সেটি নিতান্তই দৈব দুর্যোগজনিত বিলম্ব।

আজকাল দেখছি গাজীপুরের এই গ্রামে যেতে প্রায়ই মাত্রাতিরিক্ত দীর্ঘ সময়, তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা লেগে যায়। মূল সমস্যা হচ্ছে টঙ্গীর পুল থেকে ভোগড়া পর্যন্ত বারো কিলোমিটার রাস্তা। এটুকু পথ পেরুতেই দু’ থেকে আড়াই ঘণ্টা, কখনও তিন ঘণ্টা লেগে যায়। আজ এ সমস্যা, কাল ওই সমস্যা লেগেই আছে। সমস্যার দেখছি শেষ নেই। কোনোদিন বিআরটিএর জন্য রাস্তা খোঁড়া হচ্ছে, কোনোদিন অলিগলি থেকে অনেক গাড়ি বেরুচ্ছে, কোনোদিন রাস্তায় মিছিল বেরিয়েছে, আবার কোনোদিন রাস্তার মধ্যে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ভেঙে পড়েছে। কারণ যাই হোক, ফল একই। রাস্তায় মাত্রাতিরিক্ত বিলম্ব। বিরক্তির শেষ নেই, সব প্রোগ্রামই নষ্ট। ফিরে আসার জো নেই, সামনে-পেছনে শত শত গাড়ি। কোথাও গাড়ি ঘোরানোর ব্যবস্থা নেই। অতএব, গাড়িতে বসে সময় নষ্ট করো। আর তো কিছু করার নেই।

আজকাল প্রায়ই কাগজে দেখতে পাচ্ছি ঢাকা-কুমিল্লার পথে দশ-বিশ কিলোমিটার, ঢাকা-ফরিদপুরের পথে পনেরো কিলোমিটার, ঢাকা-টাঙ্গাইলের পথে পঁচিশ কিলোমিটার, ঢাকা-মাদারীপুরের পথে বিশ কিলোমিটারের মতো ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ ঢাকা থেকে কোনোদিকেই শান্তিতে চলতে পারবেন না। যেদিকে যান না কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে বসে থাকতে হবে। এসব নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। দু’একবার নাগরিক সমাজ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছে। এখন সব থেমে গেছে। সবাই মেনে নিয়েছে যে, সড়ক পথের বিড়ম্বনাকে জীবনের অংশ ধরেই নিয়ে বাঁচতে হবে। এর জন্য হইচই করে লাভ নেই।

অথচ বিষয়টি এমন দুঃসাধ্য সমস্যা নয়। টঙ্গীর রাস্তার কথা ধরা যাক। টঙ্গীর পুল থেকে ভোগড়া বা জয়দেবপুর চৌরাস্তার দূরত্ব মাত্র বারো কিলোমিটার। রাস্তা মোটামুটি ভালো। কোনো বাঁক নেই, গাড়ি আটকে থাকার মতো সিগনাল বাতির আধিক্য নেই। নরসিংদী যাওয়ার মোড়ে যে বড় সিগনাল বাতি রয়েছে তাতে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন হয় না, বলা যায় সোজা রাস্তা। মাঝে মধ্যে গলি থেকে যানবাহন মহাসড়কে ঢোকে। এটি সামান্য ঝামেলা। ভোগড়া থেকে বাঁপাশে টাঙ্গাইল যাবার জন্য কমপক্ষে একশো ফুট চওড়া বাইপাস তৈরি করা হয়েছে। টাঙ্গাইল যাবার গাড়িগুলো নির্বিঘ্নে নিরন্তর বাঁদিকে চলে যেতে পারে, কোথাও থামার দরকার নেই। ময়মনসিংহ ও গাজীপুর শহরে যাবার গাড়িগুলো ভোগড়া সিগন্যালে কয়েক মিনিট (ধরুন পাঁচ মিনিট) থেমে সোজা সামনে চলে যেতে পারে। মহাসড়ক অতিক্রম করার জন্য কাঞ্চনব্রিজ-মীরের বাজার থেকে আসা গাড়িগুলোকে রাস্তার পূর্ব দিকে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সুতরাং মূল সড়কে বিভিন্ন স্থানে দশ মিনিট পনেরো মিনিট করে বারবার ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকার কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয় না। অলিগলি থেকে যেসব যানবাহন বেরুবে, যেসব যানবাহনকে প্রথমে মহাসড়কের যানবাহনের সাথে মিশে সামনে যেতে হবে। তারপর সুযোগ বুঝে ইউটার্ন নিয়ে রাস্তার অন্য পাশে যাবে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা নিরলস সতর্কতায় যানবাহনগুলোকে সামনে যেতে তাগিদ দিবে।

আমি পুরো বারো কিলোমিটার রাস্তায় হাতেগোনা কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ দেখেছি। এ রাস্তায় চারটি পয়েন্টে কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ যানবাহনগুলোকে থামতে না দিয়ে সামনের দিকে চলতে তাগাদা দিলে এবং ভোগড়ার সামান্য আগ থেকে বামদিকে যাওয়ার গাড়িগুলোকে আলাদা করে নির্বিঘ্নে, নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে দিলে রাস্তায় অসহনীয় যানজট হবে না। পুলিশকে সহায়তা করার জন্য সিটি কর্পোরেশন থেকে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করা গেলে কাজটি আরো সুচারুভাবে সম্পন্ন হতে পারে। সিটি মেয়র উদ্যোগ নিলে এ কাজটি সহজেই করা যায়। নির্বাচনের আগে নাগরিকরা সে রকম আশ্বাস পেয়েছিলেন। এখন উদ্যোগে ভাটা পড়েছে কেন তা সহজবোধ্য নয়। নেতৃবৃন্দ অনুধাবন করবেন যে, এই সামান্য রাস্তাটুকুতে যান চলাচল নির্বিঘ্নে হলে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ এবং উত্তরবঙ্গের জেলাসমূহে যাওয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা, দীর্ঘ পথের ভ্রমণ বিরক্তিকর হবে না।

রাস্তার আঁকবাঁক পরীক্ষা করে একটু সময় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে খোলামনে আলাপ-আলোচনা করলে অন্যান্য মহাসড়কের যানজটের সমস্যার সমাধানও খুঁজে পাওয়া যাবে। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে আন্তরিক কিনা।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত