প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যুবরাজের এশিয়া সফর, নতুন বার্তা পশ্চিমের প্রতি

জেননি মার্স, সিএনএন

পাকিস্তান ও ভারতে যে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই সময়ে অন্য কোথাও তা পেতেন বলে মনে হয় না। পাকিস্তানে তার সম্মানে আকাশেই জেট বিমানের বহর তাকে এস্কর্ট করে নিয়ে গেছে, একুশবার তোপধ্বনি করা হয়েছে, একটি সোনালি সাবমেশিনগান উপহার দেয়া হয়েছে। আর ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রটোকল ভেঙে একেবারে বিমানের কাছে চলে এসেছেন, তাকে উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছেন। আর চীনে এই সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর বিশ্বনেতা দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার সঙ্গে দাঁড়িয়েছেন ছবি তোলার জন্য।
কোনো সন্দেহ নেই যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে তার জন্য এমন অভ্যর্থনা অচিন্তনীয়। বিশেষ করে তুরস্কে জামাল খাশোগি নিহত হওয়ার পর, এর সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর ওই দেশগুলোতে তিনি কিছুটা বেকায়দাতেই ছিলেন। তিনি নিজে যতোই এই ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করুন না কেন, এ নিয়ে তিনি কিছুটা কোণঠাসা অবস্থাতেই ছিলেন গত কিছুদিন ধরে। এমন একটা বিব্রতকর অভিযোগ থেকে বের হতে তার একটা সফল গণসংযোগের দরকার ছিলো। মনে কর হয়, এবারের এই এশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে সেই কাজটিই অত্যন্ত সফলভাবে তিনি করতে পেরেছেন। চীন অবশ্য আগে থেকেই সৌদি আরবের বড় ব্যবসায়িক অংশীদার। আর যুবরাজের এই সপ্তাহের এশিয়া সফর প্রমাণ করেছে ব্যবসায় আর স্বার্থের কাছে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শগত দূরত্ব কোনো বাধাই সৃষ্টি করতে পারে না। এই যে তিনটি দেশ তিনি সফর করেছেন, এই দেশগুলোর নেতারা কেউই জামাল খাশোগি হত্যাকা- নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। সন্দেহ নেই এই বিষয়টি সৌদি প্রশাসনকে স্বস্তি দিয়েছে। বিপরীত দিকে বেইজিংয়ে অবস্থানকালে সৌদি যুবরাজও জিনজিয়াংয়ে মুসলিম নির্যাতন নিয়ে কোনো কথা বলেননি। অথচ সারা দুনিয়ার মুসলিমরা ধর্মীয় অনেক বিষয়েই সৌদি আরবের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কারণ সৌদি আরবেই রয়েছে মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র স্থাপনা কাবা শরীফ। আবার যে ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতনের খবর নিয়মিত মিডিয়াগুলোতে প্রকাশিত হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে যেখানে এই মুসলিম নির্যাতনের বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে, সেখানেই তিনি একশো বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করেছেন। দু’বছর আগে বিন সালমানের পিতা বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ যখন এশিয়া সফর করেছিলেন তখন তার রুটটি ছিলো ভিন্ন। তিনি গিয়েছিলেন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনেই, জাপান এবং চীন। এবার তার ছেলের সফর ছিলো অনেকটাই সংক্ষিপ্ত। জাপান, দ. কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সহযোগীকে পর্যন্ত এড়িয়ে গেছেন। এ ব্যাপারে আবুধাবীর জায়েদ ইউনিভার্সিটির চীন-মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক জোনাথন ফুলটন বলেন, যুবরাজ বিন সালমানের এবারের এই সফরটি ছিলো খুবই হিসাব-নিকাশ করা। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই গুরুত্ব আরও বেড়েছে। খাশোগির মৃত্যুর পর পশ্চিমা ব্যবসায়ী নেতারা সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলন বয়কট করে। তখন যে অল্প সংখ্যক রাষ্ট্রনায়ক সেখানে অংশ নেন, তাদের মধ্যে ইমরান খান গুরুত্বপূর্ণ একজন। আর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে গেলো সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে যুবরাজ নিজেই বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের ভিত্তি রয়েছে আমাদের ডিএনএ’র মধ্যেই। গত সত্তর বছর ধরে সৌদি আরব গঠনের যে প্রক্রিয়া, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারত।’ বর্তমানে প্রায় ত্রিশ লাখ ভারতীয় সৌদি আরবে রয়েছে, এরা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে।
আর চীনও সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সহযোগীদের একটি। গত বছর এরা সৌদি আরব থেকে ছেচল্লিশ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যদিও এর সিংহভাগই তেল এবং তেল জাতীয় পণ্য। এর বিপরীতে চীনের যে বিপুল পণ্য লোহিত সাগর দিয়ে ইউরোপের দিকে যায়, তার নিরাপত্তা পাবে সৌদি আরবের কাছ থেকে। সব মিলিয়ে এই সফর সৌদি যুবরাজের জন্য কেবল ব্যবসায়িকই নয়, কূটনৈতিক বিবেচনাতেও একটি সফল এবং কার্যকর সফর। তিনি যেন পশ্চিমাদের বলেই দিলেন, তোমারা আমাকে যতোই চাপে রাখো না কেন, যতোই একা করে দিতে চাও, আসলে আমি মোটেই একা নই। আমার সঙ্গে সবসময়ই রয়েছে একাধিক বিশ্বশক্তি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত