প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভাষাসৈনিক নিখিল সেন আর নেই, হ্যাটখুলে স্যালুট, হে কমরেড আপনার প্রতি

দেবদুলাল মুন্না

ভাষা সৈনিক ও  একুশে পদকপ্রাপ্ত নিখিল সেন ২৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার দুপুর ১ টার দিকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ফেব্রুয়ারিকে আমরা ভাষার মাস বলি। এদিনেই ভাষা আন্দোলনের সুফল আমরা বয়ে এনেছিলাম। এ মৃত্যু যেন তাই আলোকিত। তার বয়সও হয়েছিলো ৮৭ বছর। মৃত্যুকালে তিনি দুই সন্তান রেখে গেছেন। নাটকে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক লাভ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার হাতে এই সম্মাননা তুলে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি নিভৃতচারী ছিলেন। রাজধানী থেকে বহুদূরে বরিশালে বসবাস করতেন। অন্যান্য ভাষা শহীদদের আমরা যেরকম স্মরণ রেখেছি জীবিতাবস্থায় সেরকম সত্যি কথা বলতে কি আমরা  নিখিল সেনের খোঁজখবর নিইনি। এ ব্যর্থতার দায় আমাদের। এ ব্যর্থতাকে অস্বীকারের উপায়ও নেই। অথচ নিখিল সেনের জীবন কতো না বনার্ঢ্য ছিলো। তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। নিখিল সেন বাংলাদেশের একজন প্রতিথযশা নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন অভিনয় শিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনীতিবিদ। আবৃত্তিতে অবদান রাখার জন্য ২০১৫ সালে শিল্পকলা পদক লাভ করেছেন। এছাড়াও ১৯৯৬ সালে শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন সম্মাননা ও ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পুরস্কার পান। নিজের যোগ্যতাবলে এতো এতো পদক পেয়েছেন, স্বীকৃতিও পেয়েছেন কিন্তু বিজ্ঞাপনে নিজের মুখ ঢাকতে দেননি। তাই হয়তো ছিলেন দূরে, বরিশালে।

তিনি ১৯৩১ সালের ১৬ এপ্রিল বরিশালের কলশ গ্রামে নিখিল সেন জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও মা সরোজিনী সেনগুপ্ত। তিনি বাবা মায়ের ১০ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ। নিখিল সেন মাধ্যমিক পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা সিটি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে আবার বরিশালে ফিরে আসেন। সিরাজের স্বপ্ন নাটকে সিরাজ চরিত্রে অভিনয় করার মধ্য দিয়ে নাট্যজীবন শুরু করেন নিখিল সেন। এরপর তিনি অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন।

নিজেই দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন ২৮টি নাটকে। নিখিল সেন কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে নিখিল সেন যুদ্ধে যোগদান করেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিও আস্থা রাখতে পারেননি। আবার ‘বাকশাল’ রাজনীতির প্রতিও আকৃষ্ট হননি।কিন্তু কমিউনিস্ট মতাদর্শকে আজীবন সেরা মনে করতেন। ফলে তার চরিত্র সামাজিকভাবে অনেকটাই হয়ে ওঠে আলবেয়্যার কাম্যুর ‘দি আউটসাইডার’ উপন্যাসের  নাম পুরুষের মতো। যিনি পরাবাস্তবের এক চরিত্র যেন। যেন সমাজের সবাইকে ভালোবেসেছেন অফুরন্ত, কিন্তু কোথাও যেন দূরত্ববোধ, মিশে যেতে পারেননি। ফলে সমাজে থেকেছেন আউটসাউডার বা আগন্তÍুকের মতোন। সত্যজিৎ রায়ের আগন্তÍুক সিমেনাতে উৎপল দত্তের আমরা যেমন চরিত্র দেখেছি অনেকটা তেমন ছিলেন। তিনি তার বার্তা বারবার পৌঁছে দিতে চেয়েছেন আমাদেরকে। কিন্তু আমরা রাজনীতিবিমুখ বলে তাকে ঠাঁই দিয়েছিলাম সংস্কৃতির অঙ্গণে। এখানেই ছিলো তার আগন্তÍুক হয়ে ওঠার জন্য আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়ানাপনার ইতিবৃত্ত। নিখিল সেন, কমরেড, হ্যাট খুলে আবারও স্যালুট। লেখক : সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত