প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কি লখিন্দরের বাসরঘর?

প্রভাষ আমিন : বাংলাদেশ বিমানের দুবাইগামী ফ্লাইট ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারীর নাম মাহাদী না পলাশ, সে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নাকি নাশকতার জন্য ছিনতাই করতে চেয়েছে, তার কাছে থাকা পিস্তলটি খেলনা নাকি আসল, তাকে মেরে ধরা হয়েছে নাকি ধরে মারা হয়েছে-এসব বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। এগুলো বড় মানুষদের বিষয়। আমি আদার বেপারী, জাহাজের খবর নিয়ে আমি কী করবো। আর এতো জাহাজ নয়, রীতিমতো উড়োজাহাজ। আমি ছোট মানুষ, আমার প্রশ্নও ছোট-কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী, ডিঙিয়ে বিমানে সে উঠলো কিভাবে?

বিমানে চড়তে সবসময়ই নানা নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরুতে হয়। আর ২০০১ সালের ৯/১১এ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিমান হামলায় টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর বিশ্বজুড়েই বিমানের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি পায়। নিরাপত্তার নামে বাড়াবাড়ি নিয়ে অনেকে বিরক্তও। ফ্লাই করতে হলে এখন দফায় দফায় নিরাপত্তা তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়। অধিকাংশ বিমানবন্দরেই জুতা, মোজা, বেল্ট খুলতে হয়। সন্দেহ হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের মুুখোমুখি হতে হয়। যাত্রীর লাগেজ স্ক্যান করা হয় নিবিড়ভাবে। এতোটাই নিবিড়ভাবে যে শ্যাম্পু, সাবান, টুথপেস্ট, চিরুনি, চুলের ক্লিপ, সেইফটি পিন, নেইল কাটার, নেইল পালিশ, লিপস্টিক, ভেসলিন, সিগারেট, লাইটার কিছুই বহন করা যায় না। আবার ল্যাপটপ, পাওয়ার ব্যাংক, মোবাইল মূল লাগেজে দেয়া যায় না; হ্যান্ড লাগেজে নিতে হয়। গতবছর ভুল করে একটি পাওয়ার ব্যাংক মূল লাগেজে দিল্লি এয়ারপোর্টে প্রায় ফ্লাইট মিস করেছিলাম। মাহাদী ওরফে পলাশের ঘটনার পর অনেকেই এখন ফেসবুকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে নেইল পালিশ, লিপস্টিক, লাইটার ফেরত চাইছেন। আর বিমানে ওঠার আগে একটা নয়, একাধিক নিরাপত্তা তল্লাশি পাড় হতে হয়। আর নিরাপত্তা প্রটোকল কিন্তু সারাবিশ্বে একইরকম। কারণ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের কোনো এক বন্দরে শৈথিল্য থাকলে, ঝুঁকিটা ছড়িয়ে পড়ে। তাই খেলনা হোক আর আসল, পিস্তল নিয়ে কারো বিমানে উঠে পড়া, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আবারো প্রশ্নের মুখে ফেলে দিলো। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্য আগে থেকেই আছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির দোহাই দিয়ে ঢাকা-লন্ডন রুটে কার্গো চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিলো যুক্তরাজ্য। বিমানবন্দরের সোনার খনি হয়ে ওঠাও এই শৈথিল্যের বড় প্রমাণ। যেই পথে সোনা বা মাদক পাচার হয়, সেই পথেই হয়তো পিস্তলটি বিমানে উঠে পড়েছিলো। তাই এক্ষুণি, এই মুহূর্তে বিমানবন্দরে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কাদের গাফিলতিতে এতো বড় অনিয়ম হতে পারলো, ভবিষ্যতের স্বার্থেই তা নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তা প্রশ্নে নিচ্ছিদ্র শব্দটি ব্যবহার করা হয়। কারণ ছোট কোনো ছিদ্র দিয়েই ঢুকে যেতে পারে বড় কোনো বিপদ। লখিন্দরকে সম্ভাব্য সাপের দংশনের অভিশাপ থেকে বাঁচাতে বেহুলা-লখিন্দরের বাসর ঘর বানানো হয়েছিলো সুরক্ষিতভাবে, যাতে কোনো সাপ ঢুকতে না পারে। ছোট একটা ছিদ্র রাখা হয়েছিলো, শ্বাস নেয়ার জন্য। সেই ছিদ্র দিয়ে চিকন সুতানলী সাপ ঢুকে দংশন করেছিলে লখিন্দরকে। তাই নিরাপত্তায় কোনো ছিদ্র রাখার কোনো সুযোগ নেই।

আমাদের এই ছিনতাই নাটকের ভিলেন মাহাদী ওরফে পলাশ কিন্তু বেশ রোমান্টিক। সে নাকি কোনো এক নায়িকাকে বিয়ে করেছিলো। সে তার স্ত্রীর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলতে চেয়েছিলো। পেছনে আর কিছু আছে কিনা জানি না, তবে এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে, প্রেমের কারণেই জীবন দিয়েছে মাহাদী ওরফে পলাশ। একজন ফেসবুকে লিখেছেন, এতোদিন জানতাম প্রেমের মরা জলে ডুবে না, এখন দেখছি প্রেমের মরা আকাশেও ভাসে না। তবে বিমানের নামটি শুনে আমার মনে একটা গান গুনগুন করছে, ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে সাত সাগর আর তেরো নদীর পাড়ে; ময়ূরপঙ্খী ভাসিয়ে দিয়ে সেথা দেখে এলেম তারে…’। পলাশও তার প্রেয়সীকে পেতে বিমান বাংলাদেশের ‘ময়ূরপঙ্খী’কেই বেছে নিয়েছিলো।লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত