প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘নিদ্রাচক্র’ কি সত্যি ষড়যন্ত্র করতে পারে?

অসীম সাহা : আইনমন্ত্রী একটি চমৎকার শব্দ জাতিকে উপহার দিয়েছেন ‘নিদ্রাচক্র’। শব্দটি বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করলে তাদের ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে সংযুক্ত করতে পারেন। আসলে শব্দ বা ভাষা এমনই একটি আধার, যেটি যে কোনো সময় যে কোনো পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবতার প্রয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে। এটি ভাবার কোনো কারণ নেই, অভিধানে যতো শব্দ আছে, তার সবগুলোর আবিষ্কারক প-িতেরা! এটা যে আমজনতারও অধিকারভুক্ত, তা ভাষাবিদ বা বৈয়াকরণ কিংবা ব্যাকরণবিদরাও স্বীকার করতে বাধ্য। তাই আইনমন্ত্রীর এই আবিষ্কার বিস্ময়ের নয়, প্রয়োজনের। এই প্রয়োজন থেকে একসময় সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দুটি শব্দ আবিষ্কার করেছিলেন। তার একটি ‘তেঁতুল হুজুর’ আর একটি ‘আগুনসন্ত্রাস’। হেফাজতিরা যখন ভয়ানক তা-বের মাধ্যমে শেখ হাসিনার গদি উল্টে দেয়ার কোশেশ করেছিলেন আর শফী হুজুর নিয়মিত নারীদের তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে প্রবল বিতর্কের সূচনা করেছিলেন, তখন সাবেক তথ্যমন্ত্রী শফী হুজুর সম্পর্কে ‘তেঁতুল হুজুর’ অভিধাটি প্রয়োগ করেছিলেন। আর এর আগের নির্বাচনের সময় হালে পানি না পেয়ে বিএনপি যখন পেট্রোল বোমা মেরে এবং অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে দেশকে অচল করে দিতে চেয়েছিলেন, তখনও হাসানুল হক ইনু বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কর্মকা-কে ‘আগুনসন্ত্রাস’ এবং তাকে ‘আগুনসন্ত্রাসী’ নামে অভিহিত করে বাংলা ভাষায় দুটি নতুন শব্দের যোজনা করেছিলেন। এবার আইনমন্ত্রী আরও একটি শব্দ সংযোজন করে বাংলা অভিধানের ভা-ারকে কিছুটা হলেও ভারী করলেন।

আইনমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কর্তৃক গণশুনানিকালে ফ্রন্টের অনেক নেতাই নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে কথাটি বলেছেন। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে নেতাদের নিদ্রামগ্ন হবার কথাটি উড়িয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, আসলে সকলে চোখ বুজে মনোযোগ সহকারে বক্তব্য শুনছিলেন। বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়, বিএনপির লোকজন ‘নিদ্রামগ্নতা’ আর ‘মনোযোগ’ শব্দ দুটিকে কীভাবে একে অপরের পরিপূরক করে তুলেছেন! কিন্তু তারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন, তাদের এই ব্যাখ্যা যদি মেনে নিতে হয়, আর জাতি যদি সত্যি সত্যি নিদ্রামগ্ন হয়ে মনোযোগ সহকারে সব শুনতে থাকে, তা হলে এই জাতি ও দেশের পরিণাম কী হতে পারে?

তবে প্রশ্ন হতে পারে, ‘নিদ্রাচক্র’ কি কোনো ষড়যন্ত্র করতে পারে? নিদ্রার মধ্যে থেকে যে ষড়যন্ত্র করা যায় না, সেটা নিশ্চয়ই আইনমন্ত্রী ভালোভাবেই জানেন। তাই তিনি এই নিদ্রার মধ্যে কী করে চক্রান্ত খুঁজে পেলেন, আমরা বুঝতে অক্ষম। মাননীয় মন্ত্রী এটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে বিএনপির যারা নীতিনির্ধারক, তারা যে নিজেদের কথার মধ্যে একটি অনিবার্য স্বীকারোক্তি দিয়ে ফেলেছেন, তা তাদের কথা থেকেই বোঝা যায়। তারা কেউ ঘুমোননি, শুধু চোখ বুঝে ঘাপটি মেরে নেতাদের ‘ঘনশুনানী’ শুনছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে চক্রান্তের পথটিকে আরো মজবুত করা যায়, সেটা তাদের কথায় স্পষ্ট। যদি সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক দিকনির্দেশনার ব্যাপার থাকতো, তা হলে তাদের চোখে নিদ্রা আসবার কথা নয়। বরং দু’চোখ-কান খোলা রেখে নিমগ্নভাবে সব কথা শোনাটাই তাদের জন্য অনিবার্য ছিলো। তা না করে তারা যে ‘নিদ্রামগ্নতা’র বদলে ‘নিদ্রাজাগরণের’ কথা বলেছেন, তা তো কেবলি নির্বোধের উক্তি। মানুষকে কি এতো বোকা ভাবার কারণ আছে যে, কোন্টা নিদ্রা আর কোন্টা নিদ্রার ভঙ্গিতে কথা শোনা, তারা তা বুঝবে না? ফলে সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গণশুনানীর আসল উদ্দেশ্য কী? হালে পানি না পেয়ে লোক দেখানো নাটক নাকি সত্যিকারের অতল ঘুমের আহ্বানে নিরুদ্দেশযাত্রার প্রথমপর্বের সূচনা? থলের বেড়াল বের করার দায়িত্ব সরকারের। আর আইনমন্ত্রীর জন্যে তা একেবারেই ফরজ! আমরা সাধারণ মানুষ যারা, তারা এই নিদ্রামগ্নতার বেড়াল কেমন করে ঘুমায় ও জেগে থাকে, তার রহস্য উন্মোচনোর জন্য অপেক্ষায় রইলাম!

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত