প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশ বিমানের ‘ময়ূরপঙ্খী’ ছিনতাইচেষ্টা এবং কয়েকটি প্রশ্ন

বিভুরঞ্জন সরকার : চব্বিশ ফেব্রুয়ারি রবিবার চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণের খননকাজ এবং লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলবেন, যেন সমগ্র বিশ্ব অবাক হয়ে এদেশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্য দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ^বাসীর নজর কাড়ে বাংলাদেশ বিমানের ‘ময়ূরপঙ্খী’ উড়োজাহাজ ছিনতাইচেষ্টার খবর। ঢাকা থেকে দুবাইগামী উড়োজাহাজটি ১৩৪ জন যাত্রী ও ১৪ জন ক্রু নিয়ে ঢাকা থেকে উড্ডয়নের পরপরই ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে। বিমানটির চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের কারণে যাত্রীরা সবাই নিরাপদে নেমে আসতে সক্ষম হন। অল্প সময়ের ব্যবধানে কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ‘ছিনতাই’ ঘটনার অবসান হয়। কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঘটনাটি ততোক্ষণে ব্যাপক প্রচার পায়। প্রথমে জানানো হয়েছিলো ছিনতাই চেষ্টাকারীর নাম মাহাদি। পরের দিন র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয় কমান্ডো অভিযানে নিহত ওই যুবকের আঙুলের ছাপ র‌্যাব ক্রিমিনাল ডাটাবেইজের একজন অপরাধীর সঙ্গে মিলে যায়। সেখানে রক্ষিত তথ্য অনুযায়ী তার নাম মো. পলাশ আহমেদ। অন্যদিকে ‘দেশ রূপান্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির নাম মাহমুদ পলাশ (২৪)। নরায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের দুধগাটা গ্রামের পিয়ার জাহানের ছেলে এই পলাশ।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নানা ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। ছিনতাইচেষ্টাকারী নাকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কি কথা বলতে চেয়েছিলেন তা কী তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো? বিমানের চালক, যার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাইচেষ্টা হলো তার কোনো বক্তব্য নেই কেনো? পুরো ঘটনাটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ছিনতাইচেষ্টার উড়োজাহাজে যাত্রী ছিলেন চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য জাসদ নেতা মঈনউদ্দিন খান বাদল। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এক অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী সেখানে পাইলটকে জিম্মি করে। গুলিও করে সে। যাত্রীরা নেমে গেলেও সে উড়োজাহাজের ভেতরে থেকে যায়’। অন্য যাত্রীরাও গুলির শব্দ শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান বিমানের ভেতর গুলির বিষয়টি নাকচ করে বলেছেন, ট্রমার কারণে যাত্রীদের এমন মনে হতে পারে।

প্রশ্ন হলো, মঈনউদ্দিন খান বাদলের মতো একজন মুক্তিযোদ্ধা ও ঝানু রাজনীতবিদও কি ট্রমার কারণে গুলির শব্দ শুনেছেন?

অভিযানের পরপর এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান বলেন, ছিনতাইচেষ্টাকারী যুবকের কাছ থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। আবার এর ঘন্টাদুয়েক পর চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহবুবার রহমান বলেছেন, ছিনতাইকারীর কাছে যে অস্ত্রটি পাওয়া গেছে এটা ফেইক, খেলনা পিস্তল।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, একটি খেলনা পিস্তলধারীকে নিবৃত্ত করতে যৌথ অভিযানে এতো শক্তি প্রয়োগ করতে হলো কেনো, যার কারণে যুবকটির মৃত্যু হলো?

তার অস্ত্রটি যদি খেলনাও হয় সেটিওতো স্কেনিংয়ে ধরা পরার কথা। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নাইম হাসান নিজেই জানিয়েছেন,‘ছোট নেইলকাটার, খেলনা পিস্তলও আমরা ধরে ফেলি। সিস্টেমে এটা করা আছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বলয় পেরিয়ে অস্ত্র নিয়ে ভেতরে যাওয়া সম্ভব নয়’।

ঘটনার দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। সঙ্গত কারণেই সেদিন ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা থাকার কথা। তারপরও সেদিনই কীভাবে ছিনতাইচেষ্টাকারী অস্ত্রধারী ওই যুবক বিমানে উঠতে সক্ষম হয়েছিলো? এ প্রশ্নের উত্তর কি আর কোনোদিন পাওয়া যাবে? দায়িত্বে অবহেলার জন্য কেউ কি শনাক্ত হবে? কারো কি শাস্তি হবে?

ছিনতাইচেষ্টাকারী যুবককে মানসিক ভারসাম্যহীন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। আসলেই কি ওই যুবক মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলো?

তার সম্পর্কে ‘দেশ রূপান্তর’-এ প্রকাশিত তথ্য : “পলাশ ২০১১ সালের দিকে স্থানীয় তাহিরপুরের একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করে। এরপর সোনারগাঁও ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি। পলাশের বাবা ১৯৯০ সাল থেকে বিদেশ থাকতেন। প্রথম কুয়েত ও পরে সৌদি আরবে ছিলেন তিনি । প্রবাসী বাবার দেয়া টাকা-পয়সা নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করতেন পলাশ। এর মধ্যে নাচগান থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র শিল্পে জড়ান তিনি। কয়েকটি শর্টফিল্মও তৈরি করেন বলে জানায় পরিবার। একটা সময় বাসা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন পলাশ। বাড়িতে তেমন যেতেন না। মাঝে-মধ্যে টাকার প্রয়োজন হলে বাড়ি যেতেন। পলাশের বাবা গত সাত বছর আগে বিদেশ থেকে স্থায়ীভাবে দেশে চলে আসেন। এলাকায় একটি মুদি দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। পলাশরা চার ভাইবোন। তারা তিন বোন এবং এক ভাই। মা রেনু আক্তার গৃহিণী। পলাশের বাবা বলেন, গত ২০-২৫ দিন আগে বাড়িতে আসে পলাশ। সাধারণত বাড়িতে সে এতো দিন থাকতো না। গত ২০-২৫ দিনে অনেকটা পাল্টে যায় সে। মসজিদে যাওয়া-আসা করে, এমনকি আজানও দিয়েছে। তিনি জানান, গত শুক্রবার বাসা থেকে বিদায় নেয়ার সময় তার মাকে বলে যায়- ভ্রমণ ভিসায় আমি দুবাই যাচ্ছি। তবে দুবাই যাওয়ার বিষয়ে বাবাকে কিছু বলেননি পলাশ। তার বাবা বলেন, ছেলের উচ্ছৃঙ্খল জীবন নিয়ে তিনি এতোটাই অতিষ্ঠ ছিলেন যে, তিনি চেয়েছেন- হয় ছেলে ভালো হোক, না হয় মারা যাক।”

পলাশের বাবার বক্তব্য থেকে এটা মোটেও বোঝা যায় না যে পলাশের কোনো মানসিক সমস্যা ছিলো। মানসিক সমস্যার কথা সামনে আনা কি অন্য কিছু আড়াল করার জন্য? কি সেটা?

যুক্তরাজ্যের সংবাদ মাধ্যম ‘ডেইলি মেইল’- এর খবরে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন সশস্ত্র ছিনতাইকারীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিলো, বুকে বোমাও বাঁধা ছিলো। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে জঙ্গি উপস্থিতি রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জঙ্গিদের হাতে কয়েকজন ব্লগার ও লেখক নিহত হন।

পলাশের বাবার দেয়া তার বদলে যাওয়া জীবনপ্রণালীর তথ্যের সঙ্গে ‘ডেইলি মেইল’-এর ‘জঙ্গি’ প্রসঙ্গের কোনো যোগসূত্র আছে কি?

প্রশ্ন আরো আছে, পলাশ কি দুবাই যাচ্ছিলো,নাকি চট্টগ্রাম যাচ্ছিলো? যদি দুবাইগামী হয়ে থাকেন তাহলে তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট থাকার কথা। তার সঙ্গে পাসপোর্ট থাকলে তার পরিচয় নিয়ে সমস্যা দেখা দিতো না।

বিমান যাত্রীদের অনেকেই বলেছেন ছিনতাইচেষ্টাকারী যুবকের কাঁধে একটি ব্যাগ ছিলো। এখন প্রশ্ন হলো, সে ব্যাগটি কোথায়? ব্যাগে কি ছিলো তা কি আর কখনো জানা যাবে?

কোনো ছোট ঘটনাকে কি কেউ ভুলবশত বড় করে ফেলেছেন? নাকি বড় ঘটনাকেই যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে? আমাদের দেশের প্রতি বিশ^বাসীর নজর পড়–ক সেটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু সেটা অবশ্যই যেন আমাদের সম্মান ও মর্যাদার কারণে হয়।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত