প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষার এ কী হাল! পরিবর্তন আসবে কবে?

বণিক বার্তা থেকে:  ফেব্রুয়ারি (২০১৯) মাসের মাঝামাঝি নিজের কাজের অংশ হিসেবে এবং কিছুটা ব্যক্তিগত উৎসাহের কারণে উত্তরবঙ্গের (রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়) কিছু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে এলাম। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ছিল ব্র্যাক পরিচালিত, সেগুলো প্রচলিত প্রাথমিকের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। কাজেই সেগুলো নিয়ে মন্তব্য না-ই করলাম। কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো এমপিওভুক্ত। আমি নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলাম, একটি সূক্ষ্ম কোণ কত ডিগ্রি হতে পারে, সবাই ক্লাসে কথা বলে না। যারা বলেছে তারা বলল, ‘স্যার,  ৯০ ডিগ্রি।’ দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটিয়েছি। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে একটি মেয়ে বলল, সে গতকাল বিদ্যালয়ে আসেনি। আমি বললাম এ বাক্যটিই তুমি ইংরেজিতে বলতে পারবে? মেয়েটি পারেনি। পরে দশম শ্রেণীর ৬৭ জন শিক্ষার্থীর সবার উদ্দেশে বললাম, আমি গতকাল স্কুলে আসিনি, এ বাক্যটি ইংরেজিতে কী হবে? কেউ কোনোভাবেই বলতে পারল না। পরে আমি বলে দিলাম এবং বোর্ডে লিখে দিলাম। ভাবলাম গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোয় গ্রামার বেশি পড়ানো হয় এবং ওদের সিলেবাসেও আছে, তাই জিজ্ঞেস করলাম I did not come to school yesterday বাক্যটির Tag question কী হবে। একই অবস্থা। এবারো কেউ বলতে পারল না। পরে আরেকটি বাক্য জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমাদের ক্লাসে ৬৭ জন ছাত্রী আছে’ এটির ইংরেজি কী হবে। কেউ পারেনি। সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষকও ছিলেন। তাদের মধ্যে দু-একজন বললেন, ‘স্যার, ট্রান্সলেশন এখন সিলেবাসে নেই।’ এ উত্তর শুনে পাঠক/শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কী বলবেন আমি জানি না। তবে এতটুকু বুঝতে পারবেন যে আমাদের বিনা মূল্যে বই বিতরণ করা হয়, আমাদের টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ হয়, সরকারি বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে বহু প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়, নায়েমে প্রশিক্ষণ হয় অথচ শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অবস্থা তথৈবচ।

উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় এসেই জাতীয় দৈনিকগুলো পড়ছিলাম। একটি দৈনিকের খবরে দেখলাম গণশিক্ষা সচিব হঠাৎ মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার পদ্মার চরের সাতটি স্কুল পরিদর্শন করেন। তিনি যে অবস্থা দেখতে পান, তা আরো ভয়াবহ। তিনি দেখতে পান সাতটির মধ্যে ছয়টিই বন্ধ। ২৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ২০ জনই অনুপস্থিত। দুটি বিদ্যালয়ে প্রকৃত শিক্ষকের পরিবর্তে ‘প্রক্সি শিক্ষক’ দেখতে পান। অবস্থা দেখে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে বিদ্যালয়গুলো দিনের পর দিন বন্ধ থাকে। এসব এলাকার ২০ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিনের পর দিন ক্লাস হয় না। ক্লাসের সময় অধিকাংশ বিদ্যালয় তালাবদ্ধ থাকে। কিছু বিদ্যালয়ে স্বল্প বেতনে ‘প্রক্সি শিক্ষক’ বা ‘প্যারা শিক্ষক’ দিয়ে ক্লাস করানো হয়। শিক্ষকরা মাসে দু-একদিন বিদ্যালয়ে হাজিরা দিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে হাওয়া হয়ে যান। এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখে না সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। এমনকি এসব বিদ্যালয়ে পরিদর্শনে যান না সংশ্লিষ্ট সহকারী উপজেলা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। ফলে সরকারের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে বসেছে। শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছে দুর্গম চরাঞ্চলের প্রায় ৩৬ লাখ শিশু-কিশোর।

দেশের চরাঞ্চল, হাওড়প্রবণ ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ২০ হাজার ৫২টি বিদ্যালয়ে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। আর শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৫ লাখ ১৫ হাজার ৬৭০ জন। সরকার মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণসহ উপবৃত্তি দিচ্ছে। এসব স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারী শতভাগ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। অথচ বিদ্যালয়গুলোয় তাদের উপস্থিতি একেবারেই অনিয়মিত এবং নগণ্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু নজরদারি না থাকায় শিক্ষক-কর্মচারীরা বিদ্যালয়গুলোয় নিয়মিত উপস্থিত না হয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্বাক্ষর করে নিচ্ছেন। বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকরা অনুপস্থিত থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা নিজেরা খেলাধুলা ও খোশগল্প করে বাড়ি ফিরছে। এক বিদ্যালয়ে মাননীয় সচিব দেখতে পান যে অষ্টম শ্রেণী পাস একটি মেয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা দেখভাল করছে। সে সচিবকে জানায় যে শিক্ষার্থীরা পাশের উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা দেখতে গেছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সচিব কথা বলে জানতে পারেন তারা ক্লাসে অসেনি, কারণ শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে আসেন না। কিছু অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন মাঝে মধ্যে শিক্ষকরা এলেও খাতায় সই করে চলে যান। অন্য একটি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা পান আরেক মহিলা শিক্ষিকার, যাকে বিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষক প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে ২ হাজার ৫০০ টাকা দেন। বিনিময়ে তিনি স্কুলে ক্লাস করান। এই হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা। কে এ নিয়ে কথা বলবেন? আমাদের মনে একটি প্রশ্ন জাগে। আর সেটি হচ্ছে, দেশের প্রায় সব প্রত্যন্ত অঞ্চলের একই চিত্র, কিন্তু এসব এলাকার জনপ্রতিনিধিদের এ বিষয়ে কোনো আগ্রহই কি নেই যে তাদের এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর এ করুণ হাল হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কী হবে? এ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তাই কি নেই? মাননীয় সচিব তো একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। কোথাও টিইও, ডিপিইও, পরিচালক, মহাপরিচালক কেউই খোঁজ রাখেন না প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় কী হচ্ছে, অথচ স্বয়ং সচিব মহোদয় অবহেলিত এলাকার বিদ্যলয়গুলো পরিদর্শনে গিয়ে এ করুণ চিত্র আবিষ্কার করেছেন। সালাম জানাই মাননীয় সচিবকে।

গত বছর (২০১৮) অনুষ্ঠিত প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় মোট ৩০ লাখ ৯৫ হাজার ১২৩ জন খুদে শিক্ষার্থী অংশ নেয়ার কথা থাকলেও ১ লাখ ৬০ হাজার ১৬৮ জন অনুপস্থিত ছিল। বাকিদের কী খবর কেউ আমরা সঠিকভাবে জানি না। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কি দায়িত্ব নয় বাকি শিশুরা কোথায় গেল, কী হলো, কেন এমন হচ্ছে ইত্যাদি জাতিকে জানানো? বিশেষ করে চর ও হাওড় এলাকার কী অবস্থা? মাঝে মাঝে কিছু বেসরকারি সংস্থা এ নিয়ে তথ্য প্রকাশ করে, যেগুলো রীতিমতো বিস্ময়কর। শিশুর সার্বিক বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আদর্শ স্থান হচ্ছে বিদ্যালয়। তাই বয়সোপযোগী হয়ে উঠলেই শিশুকে সেই জগতে পাঠাতে হয়। কিন্তু আমাদের এই অবহেলিত অঞ্চলের শিশু শিক্ষার্থীদের কোথায় পাঠাব? শিশুর সামাজিক, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও মানসিক বিকাশের এক চলমান মঞ্চ বিদ্যালয়। আমরা কি সে ধরনের বিদ্যালয় স্থাপন করতে পেরেছি?  শিশুর বেড়ে ওঠায় বিদ্যালয় নানাভাবে সমৃদ্ধ করে। শিশুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঠিক বৃদ্ধি হলো শারীরিক বিকাশ। আর মানসিক বিকাশ হচ্ছে আচার-আচরণ, চিন্তাচেতনা। এসব ক্ষেত্রে পরিবারের পরেই বিদ্যালয়ের স্থান। অবহেলিত এলাকার শিশুরা পরিবারে সে ধরনের পরিবেশ পায় না। রাষ্ট্রের উচিত বিদ্যালয়ে সেসবের ব্যবস্থা করা। কিন্তু কবে হবে সেটি?

ইউনেস্কোর সুপারিশ মতে, প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি শ্রেণীর জন্য একজন করে শিক্ষক দরকার। সে অনুযায়ী প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমপক্ষে ছয়জন শিক্ষক থাকা প্রয়োজন, কারণ প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত মোট ছয়টি করে শ্রেণী রয়েছে। সেখানে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একজন করেও শিক্ষক আছেন। ২০১৭ সালের ‘অ্যানুয়াল প্রাইমারি স্কুল সেন্সাস’ অনুযায়ী দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১২২। এর মধ্যে ৩৮ হাজার ৮৫৬টি স্কুল চলছে ছয়জনের কমসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে, ২২ হাজার ৫২৭টি বিদ্যালয় চলছে চারজন করে শিক্ষক নিয়ে। ৮ হাজার ৫৬৪টি স্কুল চলছে তিনজন করে শিক্ষক নিয়ে। আর বিদ্যালয়ে যে কয়েকজন শিক্ষক থাকেন, তাদের মধ্যে কেউ না কেউ ছুটিতে কিংবা বিভিন্ন কারণে অনুপস্থিত থাকেন। তাহলে আমাদের শিশুদের কী হবে?

২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ২৯৬ কোটি ৭ লাখ ৮৯ হাজার ১৭২টি বই বিতরণ করা হয়েছে। এটি নিশ্চয়ই আনন্দের সংবাদ। এর উল্টো দিকে যদি কথা বলি তাহলে বলতে হয়, যে বই বিতরণ করা হয়, তা শিশুরা ঠিকমতো ব্যবহার করলে কয়দিন ব্যবহার করতে পারে? কয়েক মাস পরেই বইগুলো ছিঁড়ে যায়, তখন শিশুরা কী ব্যবহার করবে? বইয়ের কাগজের যে মান, তাতে কোনোভাবেই এ বই এক বছর টেকে না। এর সমাধান কী? বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যনবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ২০১৮-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ৩৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার ১ শতাংশের বেশি কমলেও এখনো সেই হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ। ২০১১ সালে মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার কারণ জানতে একটি জরিপ করেছিল ব্যানবেইস। তাতে দেখা গিয়েছিল অভিভাবকদের নিম্ন আয়, বাল্যবিবাহ ও দরিদ্রই এর অন্যতম কারণ। অল্প বয়সে যেসব মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ঝরে পড়ে। কিন্তু চর, হাওড় ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কী অবস্থা, সেখানকার এ চিত্র আরো কত ভয়াবহ, তা কি আমরা চিন্তা করে দেখেছি? এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী? শিক্ষা তথ্য-২০১৮ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী প্রায় পৌনে দুই কোটি। এর মধ্যে ছাত্রী ৫০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মাধ্যমিক স্তরে ২০ হাজার ৪৬৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৫৪ শতাংশ ছাত্রী। কলেজেও এখন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রায় সমতা চলে এসেছে। কলেজে ছাত্রীদের বর্তমান হার ৪৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। মাদ্রাসায় ছাত্রীদের হার এখনো বেশি। দেশে বর্তমানে ৯ হাজার ২৯৪টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী পৌনে ২৪ লাখ, এদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ২৬ শতাংশ ছাত্রী। আমাদের অবহেলিত অঞ্চলগুলো, দুর্গম এলাকাগুলোর সঠিক পরিসংখ্যান দরকার। কে করবে সেটি? শিশুর মৌলিক চাহিদা চিন্তাশক্তির ওপর প্রভাব ফেলে, যা তার মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। শিশুর মৌলিক চাহিদা অপূর্ণ থাকলে শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও ক্ষুণ্ন হয়। তাই শিশুদের স্বাধীনতার চাহিদা, আত্মস্বীকৃতির চাহিদা, সক্রিয়তার চাহিদা, নিরাপত্তার চাহিদা—এগুলো যাতে তারা বাসগৃহ ও বিদ্যালয়ে পূরণ করার সুযোগ পায়, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন অভিভাবক, সমাজ ও সর্বোপরি রাষ্ট্রের।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ