প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আঠারোয় দেওয়া সুবিধা ঊনিশে পর্যবেক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

কালাম আঝাদ: ২০১৮ সালে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া সুবিধা এ বছর পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে সুবিধা প্রদানের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দেওয়া কথা রাখছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার জন্য ব্যাংকগুলোকে নানা ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা এ ব্যাপারে কাজ করছি। অন্যান্য ব্যাপারেও আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় মূলধন যোগান দেয়ার পুরনো খবরের সঙ্গে গত বছর সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) কমানো, রেপোতে সুদহার কমানো, সরকারি সংস্থার ৫০ শতাংশ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে রাখা এবং করপোরেট কর কমানো ছিল চোখে পড়ার মতো।

ব্যাংকগুলোকে দেওয়া সুবিধার বিপরীতে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহার এক অঙ্কে আনার প্রতিশ্রুতিও তেমন বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে গত বছরজুড়ে ব্যাংকখাতে সাধারণ মানুষের লাভের লাভ তেমন কিছুই হয়নি। বরং আমানতে সুদহার কমলেও ঋণে কমেনি।

বছরজুড়ে অনিয়ম ও জালিয়াতির খবর গণমাধ্যমে তেমন না এলেও ব্যাংক খাতে কয়েক বছরে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির প্রতিবেদনে নজর ছিল অনেকের। ৮ ডিসেম্বর ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ)। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত দুর্নীতির বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি (অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ)।

জানা গেছে, বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংকে সংকট শুরু হয় আগে থেকেই। এরই প্রেক্ষিতে ব্যাংকটি ২০১৭ সালে লোকসান করে ৫৩ কোটি টাকা। গেল বছর শেষে ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে ব্যাংকের আমানত ছিল ৪ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকটির আমানতের চেয়ে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায় গেল বছরের শেষের দিকেই। এ অবস্থায় ফারমার্স ব্যাংকের গ্রাহকরা আমানতের জন্য গিয়ে ব্যাংকটি থেকে কোনো টাকা ফেরত পায়নি। ব্যাংকটির মতিঝিল ও গুলশান শাখায় বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে। পরে ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে রাখ হয় পদ্মা ব্যাংক। এটিও এক ধরনের সুবিধা বলেই মনে করছেন আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা।

গত বছর এপ্রিলে ব্যাংকগুলোকে সুবিধা প্রদান করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়- বর্তমানে বাংলাদেশের সব তফসিলি ব্যাংককে (শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকসহ) তাদের মোট তলবি ও মেয়াদি দায়ের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ দ্বি-সাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে এবং ন্যূনতম ৬ শতাংশ দৈনিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ জমা হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। ১৫ এপ্রিল নগদ জমা সংরক্ষণের হার দ্বি-সাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দৈনিক ভিত্তিতে ন্যূনতম ৫ শতাংশ হবে। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার পৃথক নির্দেশনায় বলা হয়- বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো সুদহার বিদ্যমান বার্ষিক শতকরা ৬ দশমিক ৭৫ ভাগ থেকে ৭৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে শতকরা ৬ ভাগে পুনর্র্র্নিধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, রিভার্স রেপো সুদহার বিদ্যমান বার্ষিক শতকরা ৪ দশমিক ৭৫ ভাগে অপরিবর্তিত থাকবে। এ নির্দেশনা ১৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে।

জানা গেছে, শুধু সিআরআর কমানোর কারণেই বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিজেদের হাতে পায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। ওই সময় ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গণমাধ্যমকে জানান, এখন থেকে সরকারি তহবিলের ৫০ শতাংশ অর্থ যাবে সরকারি ব্যাংকে; বাদবাকি ৫০ শতাংশ অর্থ পাবে বেসরকারি ব্যাংক। এর আগে যেকোনো সরকারি সংস্থা তার তহবিলের ৭৫ শতাংশ রাখত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রেপোর মাধ্যমে বাজারে অর্থ ছাড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ, যেসব ব্যাংক রেপোতে সফলতার সঙ্গে অংশ নেয়, সেসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তহবিল পায়। আর রেপোতে সুদহার কমানোর ফলেও লাভবান হচ্ছে ব্যাংকগুলো। অপরদিকে রিভার্স রেপো হচ্ছে মার্কেট থেকে অর্থ তুলে নেয়া। এক্ষেত্রে রিভার্স রেপোতে সুদহার না কমানোয় এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর লাভ-লোকসান আগের মতোই রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। ফলে এখন থেকে করপোরেট গুনতে হবে সাড়ে ৩৭ শতাংশ। ফলে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফার পরিমাণ বাড়বে।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংককে সুবিধা দেয়া অযৌক্তিক নয়। তবে সাধারণ গ্রাহকের জন্য ব্যাংক কতটুকু করল সেটাই আসল কথা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা নতুন ৯টি ব্যাংকের কোনোটিই এখনও পুঁজিবাজারে যায়নি। ফলে ব্যাংক খাতে যেসব সুবিধা দেয়া হয়েছে, সেগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মুনাফা ঘাটতিতে যেমন কাজে দেবে, তেমনি নতুন ব্যাংকগুলোর মালিকেরা বছরশেষে পাওয়া বাড়তি মুনাফা নিজেদের পকেটে পুরবেন। সবমিলে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া বাড়তি সুবিধার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হলেও যেন সাধারণ মানুষের তা উপকারে আসে, এমনটিই চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত