প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধর্মের নামে এ কোন্ অজ্ঞতা?

শাহীন কামাল

 

চকবাজার ট্রাজেডিতে ৮১ জন জীবিত মানুষের দগ্ধ হওয়ায় পুরো জাতি শোকে বিহ্বল। ঘটনার পর থেকে পুরো দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু চকবাজার। ঘটনার ব্যাপ্তি, কারণ, প্রতিকার আর প্রতিক্রিয়ার সাথে টুকরো টুকরো ঘটনা আমাদের বেদনায় আপ্লুত করে। ছেলের লাশের টুকরো কোলে নেয়ার জন্য মায়ের আকুতি, শিশুকে বাঁচাতে বাবা-চাচার মানব প্রাচীর তৈরি, সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে বাঁচাতে না পেরে স্বামীর মৃত্যু কিংবা সন্তান কোলে নিয়ে মায়ের মৃত্যু (যদিও ছবিটি নিয়ে আমি সন্দিহান) পাষাণের মনেও বেদনার দাগ কাটে । ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া মায়ের কোলে সন্তানের এ দৃশ্য শত বছরের পুরনো মাতৃ স্নেহের স্বাভাবিক চিত্র প্রমাণ করে। তেমনি অনাগত দিনগুলোতে সন্তানদের শেষ আশ্রয়স্থলের আলোকবর্তিকা হিসেবে জ্বলবে এ ছবিটা। কিন্তু এতো ঘটনার পরে দু’একটি ভিন্নধর্মী সংবাদ কিংবা আলোচনা অনেককে বিরক্ত করেছে। অতিউৎসাহী কিছু সংবাদ মাধ্যম কিংবা নিউজ পোর্টালে সংবাদ প্রকাশ করে প্রকৃতপক্ষে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাচ্ছে।

ঘটনা পরবর্তীতে পানি সংগ্রহ বিষয়ে দু’একটি পত্রিকা মসজিদের ইমামকে দুষছেন। তারা এ ঘটনাকে সামনে এনে নিজেদের ভেতরে লালিত মানসিকতা কৌশলে প্রচার করছেন। বিষয়টা কতোটুকু প্রমাণিত তার হিসেব না করেই কেউ কেউ কথার ঝড় তুলছেন। প্রথম আলোসহ বেশ কয়েকটা পত্রিকায় সংবাদ এসেছে যেসব মাধ্যম থেকে পানি সরবরাহ হয়েছে, তার মধ্যে মসজিদ অন্যতম। তাছাড়া চকবাজারের ঘটনার মতো এতোবড় মানবিক বিপর্যয়ে অগ্নিনির্বাপণের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের ওপর থাকে না। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিভিল কর্মকর্তাদের সাথে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কোথা থেকে কোন প্রক্রিয়ায় পানি সরবরাহ হবে, তা শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত বাহিনীই নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে ওই ইমামের প্রসঙ্গ টেনে আনা অবান্তর। চকবাজারের এই দুর্ঘটনার জন্য রাস্তার অপ্রতুলতাই প্রধানত দায়ী। সাথে কেমিক্যালের আধিক্যকেও অস্বীকার করা যায় না। আমার জেলা শহরে আগুন লাগার ঘটনা মসজিদ থেকে প্রচার করা হয়েছে। আমি নিজেই এর সাক্ষী। ঘটনার রাতে মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষককে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার কর্মে অংশগ্রহণ করতে দেখেছি।   মসজিদ পুড়েনি কিংবা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অবিকল আছে, এমন সংবাদ প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ অনেকটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন। বিষয়টা অনেককে বিব্রত করেছে। যেখানে এতোগুলো মানুষের মৃত্যুর মতো বেদনাহত ঘটনা সেখানে আপনি এসব কিসের সংবাদ দিচ্ছেন!

ঈমান কিংবা কালিমার সম্পর্ক জিন আর ইনসান অর্থাৎ মানুষ আর জিন জাতির সাথে। কোনো জড়বস্তুর সাথে ঈমানের সম্পর্ক নেই। মসজিদের সামনে পাথরে লেখা কালিমা পুড়েনি দেখে পুলকিত হচ্ছেন, একবারও কী ভেবেছেন যারা নিহত হয়েছেন অনেকের অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ছিলো। অন্তত দু’জন হাফেজে কুরআন ছিলেন যাদের অন্তরে পুরো কুরআনের ত্রিশ পারা মুখস্থ ছিলো। তারাও তো পুড়ে মারা গেলেন। আগুনে পুড়ে ছাই করবে, এটা আগুনের সাধারণ ধর্ম। এর বাইরে কিছু হওয়া অলৌকিক ঘটনা যেটা নবী-রাসূলদের সাথে ঘটেছিলো যা মোজেজা নামে পরিচিত। হজরত ইব্রাহিমের (আ.) সাথে আল্লাহ যা ঘটিয়েছেন তা সর্বত্র ঘটবে এমন প্রত্যাশা করা যুক্তিযুক্ত নয়। আবদুল্লাহ ইবনে হোজাইফার (রা.) জামাতের ঘটনাকে কীভাবে বিচার করবেন।

মক্কা শরিফের এক ঘটনা বিষয়ক লিফলেট ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। এটা যে দেখবেন, সে আরো একশোজনকে দেবেন। কাজটি করলে এক সপ্তাহের মধ্যে সুসংবাদ পাবেন, অবজ্ঞা করলে ক্ষতি হবে ইত্যাদি। আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে আমার এক আত্মীয় এ রকম একশোটি লিফলেট ফটোকপি করে দিয়েছিলেন আমায় বিলি করতে। সাথে বলে দিয়েছেন, আমি যেন একশোটি ফটোকপি করে দিই। সবগুলো কাগজ খালের জলে ভাসিয়ে দিয়েছি, কিছুই হয়নি। এতো বছর পরেও একই লেখা ফেসবুকে, ম্যাসেঞ্জারে আসে। এতোদিনে স্বপ্নের বিষয়বস্তু আর ঘটনা একটুও বদলায়নি।

কোন বিষয়ে না বুঝে পোস্ট দেয়া কিংবা ম্যাসেঞ্জারে ফরওয়ার্ড করা অনুচিত। এতে ধার্মিকতা প্রকাশ পায় না, প্রকাশ পায় অজ্ঞতা। নিজেদের ধার্মিকতা প্রকাশের নামে অজ্ঞতা প্রদর্শনে অন্যে বিব্রত হয়। চকবাজারের ঘটনায় এই ধার্মিকতা প্রদর্শনের চেষ্টায় আপনার জন্য আমরা কেন বিব্রত হবো?

লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত