প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় চকবাজার অগ্নিকাণ্ড

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজধানীর চকবাজার অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ওয়াহিদ ম্যানশন। ঘটনার সময় ওই ভবনের তৃতীয় তলার বারান্দায় বসেছিলেন ঢাকা সিটি কলেজের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম সজিব। তার চোখের সামনেই আগুন লাগার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আগুন লাগার পর পর নিজের পরিবারের সদস্যদের ও মালিকের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে বের করে নিয়ে আসেন। বাসাটি পুরো ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলেও তারা সকলে নিরাপদে বের হতে পেরেছিলেন বলে জানান তিনি।

গত ২০ তারিখ রাত ১০ টা ৩৮ মিনিটে চকবাজার চুড়িহাট্টা জামে মসজিদ সংলগ্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের হিসেব অনুযায়, এই অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন ৬৭ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাঁচটি ভবন।

আগুনের সূত্রপাত

আগুন কিভাবে সূত্রপাত হয় এবং তার ও মালিকের পরিবারের সদস্যদের কিভাবে নিরাপদে বের করে নিয়ে আসেন তা বিস্তারিত জানিয়েছেন রাকিবুল ইসলাম সজিব। তিনি বলেন, ‘যখন ঘটনা ঘটে তখন আমি ওয়াহিদ ম্যানশনের তৃতীয় তলার বারান্দায় ছিলাম। চেয়ার নিয়ে বসে মোবাইল চালাচ্ছিলাম। রাস্তায় তখন জ্যাম ছিল। বাসার নিচে একটি পিকআপ ভ্যান আসে। ওটাতে সিলিন্ডার ছিল। সিলিন্ডারগুলো সম্ভবত পাশের হোটেলে সাপ্লাই দেওয়ার জন্য আনা হয়েছিল। হঠাৎ েএকটা বিকট আওয়াজ হয়। বাইরে তাকিয়ে দেখি, রাস্তা থেকে কিছু একটা উপরে উঠে এসেছে। আর নিচের রাস্তাটা পুরা আগুনের ময়দান হয়ে আছে। আগুন ছাড়া তখন চোখের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। পুরো বাড়ি বিকট আওয়াজে কাঁপছিল। আমার রুমে একটা টিভি ছিল। সেটা আওয়াজই জাস্ট ফেটে গেছে। গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুন লাগছে এটা ঠিক আছে কিন্তু খুব দ্রুত আগুন ছড়াইছে কেমিক্যাল থেকে।’

ভবনে কেমিক্যালের গোডাউন

ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউন; দোতলায় পারফিউম এর গোডাউন, রিফিল করার কাচামাল; তৃতীয় তলায় চার ইউনিটের মধ্যে তিনটিতে ফ্যামিলি ও একটিতে পারফিউমের গোডাউন; চতুর্থ তলায় কসমেটিক্স ও পারিফিউমের গোডাউন ছিল বলে জানিয়েছেন তৃতীয় তলার রাকিবুল ইসলাম সজিব। তার ভাষ্য, আমাদের বিল্ডিং এ পারফিউম এর গোডাউন ছিল। দোতালায় পারফিউম, তিনতলায় এক ইউনিটে, আন্ডারগ্রাউন্ডে বড় বড় ড্রাম ছিল কেমিক্যালের, আবার প্লাস্টিকের দানাও ছিল।চতুর্থ তলাতেও পারফিউম আর কসমেটিকসের গোডাউন ছিল। কেমিক্যালের কারণে আগুনটা দ্রুত ছড়ায় গেছে। উল্টা পাশের কর্ণারের দোকানটায় কেমিক্যাল ছিল। ক্যামিকেলের কারণে যারা জ্যামে আটকে ছিল তারা সামনে পিছে কোথায় যেতে পারেনি। ওখানে আগুনে পুড়ছে।

যেভাবে নিজের পরিবারের সদস্য ও অন্যদের বাঁচালেন

‘আমি আগুন দেখার সাথে সাথে বুঝতে পারি এটা ভয়াবহ। কেমিক্যাল যে আশপাশে আছে সেটাতো জানতাম। আমি দ্রুত বারান্দা থেকে সরে গিয়ে আম্মুকে বলি যে দ্রুত বের হতে হবে।বাসায় আমার আম্মু, ছোট বোন, চাচা ছিল। আম্মু বলল, বাবা ভুমিকম্প হইছে কি? আমি বললাম না আগুন। আমি বাসার কাউকে সময় দিই না। জুতা পড়ারও সময় পায়নি। সবাইকে নিয়ে আমি যখন বাসার গেটে আসি তখন পুরা বাড়ির বিদ্যুৎ চলে যায়। মোবাইলের লাইট দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তাদের নিয়ে নিচে নামি। সাথে সাথে বাড়ির যত লোক ছিল তারাও নিচে নেমে আসে। নিচ তলায় এসে আগুন দেখার পর সবাই বলছিল যে বাইরে যাওয়া যাবে না। এখানেই থাকি। বাইরের পরিস্থিতি দেখার জন্য আমি আর ড্রাইভার আঙ্কেল দুজন গেটে আসি। গেটে এসে দেখি শুধু বাম পাশটায় আগুন নেই। তারপর আমি এসে সবাইকে বলি যে, এখানে থাকা যাবে না বের হয়ে যেতে হবে। কারণ আমরা এখানে থাকলে ধোঁয়া আর গ্যাসেই মারা যাবো। তখন আমি একে একে সবাইকে বের করে নিয়ে আসি। বাড়িওলার মা ছিল তৃতীয় তলায়।উনাকে আমার চাচা ও ড্রাইভার আঙ্কেল উঠিয়ে নিয়ে আসে। আমিও সাথে সাথে বের হয়ে আসি। এরপর যখন ফিরে আসি তখন সব শেষ। আমাদের পাঁচ রুমের ইউনিট ছিল। আমার রুমের খাট ও ওয়াড্রপ বাদে বাসার সব পুড়ে গেছে।

তিনি জানান, ঘটনার পর তারা উর্দু রোডে মামার বাসায় উঠেছেন। সেখান থেকে ক্লাস ও বাবা অফিস করছেন। আগুনে তার সব সার্টিফিকেট পুড়ে গেছে।

ওয়াহিদ ম্যানসনের বর্তমান মালিক দুজন। ওয়াহিদের দুই ছেলে সোহেল ও হাসান। তাদের বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। ঘটনার দিন একজন মালিক হাসান বাড়িতে ছিলেন না। তিনি ও তার পরিবার বেড়াতে গিয়েছিলেন। আর অপর মালিক সোহেলের বাসাতে তার স্ত্রী ছিলেন না। তবে বাসায় ছিলেন, উনার মেয়ে, মা ও কাজের লোক। তাদের সবাইকে নিরাপদে বাইরে নামিয়ে আনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সজিব।

সজিব বলেন, ‘এই বাড়ির বাড়িওয়ালা দুই ভাই। তৃতীয় তলা একজনের আন্ডারে ছিল ও চতুর্থ তলা আরেকজনের আন্ডারে ছিল। তখন একজন বাড়িওয়ালা ছিল। অন্যজন বাইরে ঘুরতে গিয়েছেন। মূল মালিক ওয়াহিদ উনার নামে বাড়ি। উনি মারা গেছেন। এখন তার দুই ছেলে এখানে থাকে।

মধ্যরাতে গোডাউনে আসত কেমিক্যাল

‘বিল্ডিংয়ে কেমিক্যালগুলো আসত রাত ১২টার পর। বড় বড় কার্গোতে করে এগুলো নিয়ে আসা হতো। আন্ডারগ্রাউন্ড বস্তায় করে কেমিক্যাল এনে রাখা হতো, অনেকটা সিমেন্টের বস্তার মতো। ড্রামও ছিল। আর তৃতীয় তলায় পারফিউমগুলো আনা হতো কার্টুনে করে। এগুলোর কাঁচামালও ছিল। দুই তলায় পারফিউম ও র ম্যাটেরিয়াল গুলো ছিল।’

গত ৮ মাস আগে সজিবরা বাসায় উঠার পর পাঁচমাস তৃতীয় তলার একটি ইউনিট ফাঁকা ছিল। এরপর একটি গোডাউন ভাড়া দেওয়া হয় বলে জানান সজিব। মালিকের ভাষ্য, কেমিক্যাল আর মানুষ একসঙ্গে থাকবে, এটা পুরান ঢাকার বৈশিষ্ট

অগ্নিকাণ্ডের কয়েকদিন আগে সজিবের বাবা মালিক হাজী সোহেলকে বলেছিল, হয় পুরো বাড়িতে ফ্যামিলি অথবা গোডাউন দুটো থেকে একটা ভাড়া দেওয়ার জন্য। তখন মালিক হাজী সোহেল সজিবের বাবাকে বলেন,

‘কেমিক্যাল মানুষ সব একসঙ্গে মিলে থাকবে, এটা পুরান ঢাকার বৈশিষ্ট্য। এগুলো বলে লাভ হবে না।’ বলছিলেন রাকিবুল ইসলাম সজিব।

সর্বাধিক পঠিত