প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চট্টগ্রামে স্বপ্নযাত্রা শুরু আজ

ডেস্ক রিপোর্ট : ১১ বছর আগে চট্টগ্রামে এসে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৭ সালের ৫ই ডিসেম্বর এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কাজে হাত দেন তিনি। তখন একধাপ বাড়িয়ে তিনি স্বপ্ন দেখান- ওয়ান সিটি, টু টাউনের মডেলে চট্টগ্রাম হবে সাংহাই।

যে স্বপ্ন অর্থনীতির বড় দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাও দেখেনি আজও। দেখেনি সার্কভুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোও। আর সেই স্বপ্নযাত্রা বাস্তবে শুরু করতে যাচ্ছেন দেশের স্বপ্নসারথী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই।

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম কর্ণফুলী নদীর তলদেশে এই টানেল খননের কাজ উদ্বোধন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে আসছেন আজ রোববার। এ নিয়ে টানেল নির্মাণ এলাকায় চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

বিশেষ করে নদীর তলদেশে সুড়ঙ্গ খননে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) প্রস্তুতি নিয়ে চলছে কর্মযজ্ঞ।

কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই যন্ত্রটির বোর্ডের সুইচ টিপে নদীর তলদেশের সুড়ঙ্গ পথের খনন কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন। এরপর থেকে এই মেশিনে পুরোদমে শুরু হবে খনন কাজ।

একই সঙ্গে তিনি চট্টগ্রাম মহানগরীর লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটিরও উদ্বোধন করবেন। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, টিবিএম মেশিনে খনন কাজ উদ্বোধন উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সেতু সচিব ও সেতু ভবনের ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীরা সার্বিক প্রস্তুতি কাজ মনিটরিং করছেন।

তিনি বলেন, নকশা অনুযায়ী টানেলের প্রবেশ পথ হবে এয়ারপোর্ট থেকে কর্ণফুলী নদীর দুই কিলোমিটার ভাটির দিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজের সামনে। তারপর আড়াই কিলোমিটার মাটির তলদেশ দিয়ে চার লেনের সড়ক যাবে।

মূল টানেল হবে দুইটি টিউবের ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার এপ্রোচ রোড এবং ৭২৭ মিটার ওভারব্রিজ আনোয়ারা উপজেলাকে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে যুক্ত করবে। যেখানে গড়ে উঠবে আরেকটি শহর।
তিনি বলেন, তলদেশে মাটি খুঁড়ে টিউব ঢোকানোর জন্য চীন থেকে আনা ৯৪ মিটার দীর্ঘ ও ২২ হাজার টন ওজনের বোরিং মেশিন দিয়ে কাজ চলছে। একটি টিউব দিয়ে গাড়ি শহরপ্রান্ত থেকে প্রবেশ করবে, আরেকটি টিউব দিয়ে ওপার থেকে শহরের দিকে আসবে।
টানেলের প্রতিটি টিউব চওড়ায় হবে ৩৫ ফুট, উচ্চতায় প্রায় ১৬ ফুট। একটি টিউবে বসানো হবে দুটি স্কেল। এর ওপর দিয়ে দুই লেনে গাড়ি চলাচল করবে। পাশে থাকবে একটি সার্ভিস টিউব। মাঝে ফাঁকা থাকবে ১১ মিটার। যেকোনো বড় গাড়ি দ্রুত চলতে পারবে এই টানেল দিয়ে।

যেভাবে খনন করবে টিবিএম: প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, সামনের ধারালো কাটার দিয়ে মাটি কাটতে কাটতে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে টিবিএম মেশিন। আর পেছন দিক দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কংক্রিটের সেগমেন্ট ঢুকে চারদিকে গোলাকারের শক্ত দেয়াল তৈরি করবে।

হাজারো কর্মবীরের ঘামে কংক্রিটের সেগমেন্টগুলো একটি রেলট্রাক দিয়ে ঢুকবে। ৮ ভাগে ভাগ হয়ে রিং আকারে একটির সঙ্গে অন্যটি লেগে যাবে। প্রতি ৮টি সেগমেন্টে দুই মিটারের একটি রিং তৈরি হবে। এভাবে ২০ হাজার সেগমেন্ট বসলেই পুরো আড়াই কিলোমিটার টানেল তৈরি হয়ে যাবে। প্রতিদিন ৪-৫ মিটার করে টানেল তৈরির কাজ এগুবে।

তিনি জানান, যে যজ্ঞ এরইমধ্যে শুরু হয়েছে তা হচ্ছে চট্টগ্রামের নেভাল একাডেমির পাশে। এখান থেকে টানেলের প্রবেশ পথ। যেখানে টিবিএম মাটির ১২ মিটার নিচে থেকে খোদাই শুরু করেছে। ধীরে ধীরে এটি আরো গভীরে যাচ্ছে। এরপর কিছুদূর সামনেই কর্ণফুলী নদী। নদীর তলদেশে যাওয়ার পর মাটির উপরিভাগ থেকে প্রায় ৪৩ মিটার অর্থাৎ ১৪০ ফুট গভীরে খোদাই করে সড়ক নিয়ে যাবে।
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেন সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত রয়েছে চায়না কমিউনিকেশন কন্সট্রাকশন কোমপানি লিমিটেড (সিসিসিসি)।

সিসিসিসি প্রকৌশলীরা জানান, টানেল নির্মাণের মূল কাজ নদীর তলদেশে। টিবিএম দিয়ে নিখুঁতভাবে সার্বক্ষণিক কমিপউটারাইজ পদ্ধতিতে এগিয়ে যাবে সে কাজ। চীনের জিয়াংসু প্রদেশের জেংজিয়ান শহরে টানেল সেগমেন্ট কাস্টিং প্ল্যান্টে সেগমেন্ট তৈরি করে আনা হচ্ছে। এরমধ্যে দুই হাজার সেগমেন্ট এসে গেছে। যেগুলো পতেঙ্গা পাড়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

সিসিসিসি জানায়, টিবিএমের সামনে কাটার মেশিন যখন মাটি কাটবে তখন সব মাটি ও পাথর একটি পাইপের মাধ্যমে আলাদা একটি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে চলে যাবে।

স্বপ্ন নির্মাণ যাদের হাতে: কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ইতিমধ্যেই যুক্ত হয়েছেন দেশি-বিদেশি এক হাজার ২০০ মানুষ, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর মেধায় রচিত হচ্ছে বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস। এখানে রাত-দিন কাজ করছেন অন্তত ৮০০ নিয়মিত শ্রমিক। তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩০০ চীনা শ্রমিক। এর বাইরে প্রতিদিন ৩০০ শ্রমিক দৈনিক হিসেবে কাজ করছেন। প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করছেন কমপক্ষে ৪০ জন সেতু প্রকৌশলী। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ২৫ জন। প্রতিদিন তিন শিফটে অবিরত কাজ করছেন তারা।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী শাহ ইমতিয়াজ জানান, টিবিএম মেশিন পরিচালনা করবে কয়েকটি টিম। এরমধ্যে একটি টিম কাটার মেশিন পরিচালনা করবে। একটি টিম সেগমেন্ট বসানো নিয়ন্ত্রণ করবে। আরেকটি টিম সেগমেন্টগুলো রেলট্রাকে আনা মনিটরিং করবে। অন্য টিম সেগমেন্ট ঠিকমতো লেগেছে কিনা বা তার পজিশনিং ঠিক হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখবে। টিবিএমের ভেতরেই এভাবে বিভিন্ন ইলেকট্রিক্যাল এবং মেকানিক্যাল টিম একযোগে কাজ করবে।

প্রকৌশলীরা আরো জানান, শুরুতে মাটি থেকে ২৪ মিটার খনন করা হয়েছে। সামনে এগুনোর পর যা বাড়তে থাকবে। টিউবের ভেতরের আকার ১০ দশমিক ৮ মিটার। বাইরের আকার হবে ১১ দশমিক ৮ মিটার। এভাবে প্রথম যাত্রায় দুই লেনের একটি টিউব সড়ক হবে। সেটি শেষ হলে টিবিএম আনোয়ারার প্রান্ত থেকে নদীর তলদেশে ঢুকে আরেকটি দুই লেনের সড়ক খোদাই করে পতেঙ্গা অংশে বের হবে। এভাবে দুটি টিউবে চার লেনের সড়ক পথ হবে এই টানেলে।

যেভাবে টানেলের পথে বাংলাদেশ: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন জানান, ২০০৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে এক জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় গেলে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।

তিনি ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে প্রস্তাবটি প্রকল্প আকারে উত্থাপন করা হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্ট চূড়ান্ত হওয়ার পর স্থান নির্বাচন নিয়ে কেটে যায় আরো দুই বছর।

২০১৪ সালের শেষদিকে এসে কর্ণফুলীর মোহনায় টানেল নির্মাণে একমত হন নগরবিদ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরামর্শক ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে চীনা কোমপানি চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোমপানির (সিসিসিসি) সঙ্গে টানেল নির্মাণে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। ২০১৬ সালের ১৪ই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যৌথভাবে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পসহ মোট ৬টি প্রকল্পের ভিত্তিফলক উদ্বোধন করেন।

এরপর ৩৮৩ একর ভূমির মধ্যে ২৩২ একর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোমপানি লিমিটেডকে হস্তান্তর করা হয়। ২০১৭ সালের ৫ই ডিসেম্বর থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় গণনা শুরু হয়। পাঁচ বছরের মধ্যে টানেল নির্মাণের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।

তিনি জানান, টানেল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৮ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এরই মধ্যে চীন অর্থায়ন করছে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বাকি টাকা বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দিচ্ছে। ২০২২ সাল নাগাদ টানেল নির্মাণ শেষ হলে কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে শুরু হবে গাড়ি চলাচল। বিশ্ব দেখবে সাংহাইয়ের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউন মডেলের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম।
প্রকল্প সংশিষ্টরা জানান, টানেল দিয়ে বছরে প্রায় ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করবে। চালুর তিন বছর পর ওই সংখ্যা দাঁড়াবে ৭৬ লাখে। চালুর প্রথম বছরে চলাচল করা গাড়ির প্রায় ৫১ শতাংশ হবে কন্টেইনারবাহী ট্রেইলর এবং বিভিন্ন ধরনের ট্রাক ও ভ্যান। বাকি ৪৯ শতাংশের মধ্যে ১৩ লাখ বাস, মিনিবাস ও মাইক্রোবাস এবং ১২ লাখ কার, জিপ ও বিভিন্ন ছোট গাড়ি।

বঙ্গবন্ধুর নামে টানেলের নামকরণের প্রস্তাব: চলতি বছরের ২১শে জানুয়ারি মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশের টানেলটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণের প্রস্তাব দেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ওই প্রস্তাব সমর্থন করেন।

বঙ্গবন্ধুর নামে কর্ণফুলী টানেলের নামকরণের প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে উপমন্ত্রী নওফেল বলেন, চট্টগ্রামে সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য বড় কোনো স্থাপনা নেই। এটি বাংলাদেশের শুধু নয়, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নদীর তলদেশে প্রথম টানেল। তাই দেশের প্রথম টানেলটি বঙ্গবন্ধুর নামে নামকরণ করা যেতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত