প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চুড়িহাট্টার বাতাসে এখনও রাসায়নিকের ঝাঁঝালো গন্ধ

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় আগুন কেড়ে নিয়েছে ৬৭টি তাজা প্রাণ। গত বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে সংঘটিত ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের তিন দিন পর শনিবারও এলাকার বাতাসে পাওয়া যাচ্ছে রাসায়নিকের ঝাঁঝালো গন্ধ।
আগুনের ঘটনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনের দ্বিতীয় তলার গোডাউনে মজুত ছিল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হাজার হাজার বডি স্প্রে ও রুম স্প্রের বোতল। আগুনে এসব বোতল বিস্ফোরিত হয়ে বৃষ্টির মতো চারদিকে ছিটে ছিটে পড়ে। শনিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ঘটনাস্থলের চারপাশে অসংখ্য স্প্রে’র বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভবনের দ্বিতীয় তলা ও তৃতীয় তলায় দেখা গেছে, বিস্ফোরিত অসংখ্য স্প্রে’র বোতলের ধ্বংসাবশেষ।
স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় থাকা বডি স্প্রে’র গোডাউনে ছিটকে যায়। এতে আগুনের ভয়াবহতা অনেকাংশে বেড়ে যায়। তবে ভবনে থাকা কেমিক্যাল ও রাসায়নিক থেকে আগুন লাগার বিষয়টি মানতে নারাজ কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় বাসিন্দা সিয়াম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনে বডি স্প্রে’র গোডাউন ছিল। আগুনের ঘটনায় সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটেছে। কারণ, বডি স্প্রে’র বোতলের ভেতরে গ্যাস ও লিকুইড কেমিক্যাল থাকে। সেগুলোর গায়ে আগুন থেকে দূরে রাখতে একটি নির্দেশনাও দেওয়া থাকে।’

আশরাফ উদ্দিন স্বাধীন বলেন, ‘তীব্র এই ঘ্রাণ এখনও বাতাসে ভাসছে। এতে চোখে কিছুটা জ্বালা-পোড়াও করছে।’
তবে কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, কেমিক্যাল নয়, সব কিছুর জন্য দায়ী গ্যাস সিলিন্ডার। আগুনটা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে ছড়িয়েছে। আর এখানে যেসব কেমিক্যালের গোডাউন আছে, সেখানে কোনও দাহ্য পদার্থ নেই। তবে ওয়াহেদ ম্যানশনে থাকা বডি স্প্রে’র গোডাউনের কারণে আগুনের ভয়াবহতা বেড়েছে বলে তারা স্বীকার করেন।

দুই বছর আগে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের আন্ডারগ্রাউন্ডটি কেমিক্যাল মজুতের জন্য ভাড়া নেন ব্যবসায়ী মো. আবজাল। সেখানে আয়রন অক্সাইড, রেড, ব্লু, ইয়েলো কালার অক্সাইড, রেড, ব্লু, ইয়েলো পিগম্যান্টসহ বিভিন্ন রংয়ের কেমিক্যাল মজুদ করেন তিনি।

তবে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তিনি দাবি করেন, ‘আমার গোডাউনে কোনও দাহ্য পদার্থ বা কেমিক্যাল নেই। যা আছে সব রঙের কাজে ব্যবহার করা হয়। যদি দাহ্য পদার্থ থাকতো তবে আগুনে তো সবগুলোর বিস্ফোরণ ঘটতো। কিন্তু সেগুলোতে আগুন ধরেনি।’

মো. আবজাল বলেন, ‘তবে ভবনের দ্বিতীয় তলায় প্রচুর পরিমাণে বডি স্প্রে এবং রুম স্প্রে মজুদ ছিল। যখন রাস্তায় গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে, তখন একটি সিলিন্ডার ওই স্প্রের গোডাউনে গিয়ে পড়ে। এতেই আগুনের ভয়াবহতা বাড়ে।’ তিনি দাবি করেন, কেমিক্যাল নয়, সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণেই এত ক্ষতি হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চুড়িহাট্টা এলাকায় আগুন লাগতে এর সহযোগী সব ধরনের উপকরণ মজুদ ছিল। গ্যাস সিলিন্ডার, কেমিক্যাল, দাহ্য পদার্থ, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বডি স্প্রে’র বিশাল গোডাউন, যানজটে আটকে থাকা মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের পেট্রোল, ঘটনাস্থলের পাশে থাকা দুটি রেস্টুরেন্ট ও সেখানে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার। সব মিলিয়ে যে কোনোভাবে আগুন সংঘটিত হয়েছে এবং আশপাশের এসব উপকরণের কারণে সেটি শক্তিশালী রূপ ধারণ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলা যাবে।’
এদিকে, শনিবার দুপুরে চুড়িহাট্টার বেশ কিছু স্থানীয় কেমিক্যাল ব্যবসায়ী গ্যাস সিলিন্ডার বন্ধের দাবিতে স্নোগান দেন। তাদের দাবি, কেমিক্যাল থেকে সব ধরনের ব্যবহৃত পণ্য তৈরি হয়। কেমিক্যাল দুর্ঘটনার জন্য দায়ী নয়। গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনার কারণ। দেশ থেকে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করা হোক। তবে স্থানীয়দের মধ্যে এর ভিন্নমতও রয়েছে। অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কেমিক্যাল গোডাউন থাকতে দেওয়া হবে না। এগুলো দ্রুত অপসারণ করতে হবে। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

হাজী মুসলিম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কেমিক্যাল থেকে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। এই দুর্ঘটনার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার দায়ী। পুরান ঢাকায় গ্যাস লাইনে কোনও গ্যাস আসে না, তাই সবাই সিলিন্ডার ব্যবহার করেন।’ তিনি বলেন, সিলিন্ডারগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিন্মমানের। তাই গ্যাস সিলিন্ডার বন্ধ করা দরকার।

সর্বাধিক পঠিত