প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘এই পথে আলো জ্বেলে’

বিভুরঞ্জন সরকার : আনিসুল হকের প্রতি আমার দুর্বলতা অনেকদিনের। তার গদ্য কার্টুন ভালো লাগতো। তার ঝরঝরে গদ্য পড়ে তাকে উপন্যাস লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছিলাম আমি। আজ অনেকের কাছে এটা অবিশ্বাস্য মনে হবে। কিন্তু সত্য যে আমার প্ররোচনায় আনিস প্রথম উপন্যাস লেখায় হাত দিয়েছিলেন। ‘অন্ধকারের একশ বছর’। শফিক রেহমান সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘মৌচাকের ঢিল’-ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিলো। পরে বই হিসেবে বের হয়। তারপর আনিসুল হক একের পর এক অনেক উপন্যাস লিখেছেন। তিনি এখন দেশের একজন অতি জনপ্রিয় লেখক। তার খ্যাতি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। তার বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ আরো কিছু পুরস্কারও পেয়েছেন। সবচেয়ে বেশি যেটা পেয়েছেন সেটা হলো পাঠকপ্রিয়তা। প্রতি বছর আমি আনিসুল হকের নতুন বইয়ের অপেক্ষায় থাকি। সংগ্রহ করি। পড়ি। আনিসুল হকের লেখা পড়তে ভালো লাগে। তার লেখা পড়তে গিয়ে আমি উপন্যাসের শিল্পরূপ, নান্দনিকতা ইত্যাদি বিচার করতে বসি না। পড়ি আর বিস্মিত হয়ে ভাবি, আনিস কীভাবে এতো সহজ করে সবকিছু তুলে ধরেন। পাঠককে কতো সহজে তিনি বিষয়ের ভেতরে নিয়ে যান। আনিসুল হকের এবারের নতুন উপন্যাস ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ হাতে পেয়ে প্রবল আগ্রহেই পড়তে শুরু করি এবং পড়া শেষে একই রকম বিস্ময় অনুভব করি। এটা তো শুধু উপন্যাস নয়। এটা তো বাঙালির জাতীয় জাগরণের এক বিশেষ কালপর্বের ইতিহাস। হ্যাঁ, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের যে দীর্ঘ ধারাবাহিক রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম, অসংখ্য মানুষের অসামান্য আত্মদান, অনেক নেতার মধ্য থেকে একজন শেখ মুজিবের মাথা তুলে দাঁড়ানো, বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার কঠিন প্রত্যয়ের ইতিহাসকে উপজীব্য করে আনিসও লিখছেন উপন্যাস। এর আগে এই সিরিজে তিনি লিখেছেন, ‘যারা ভোর এনেছিল’, ‘উষার দুয়ারে’, ‘আলো-আঁধারের যাত্রী’। এবার বের হলো ‘এই পথে আলো জ্বেলে’। আগামীতে এই সিরিজের শেষ খ- লিখবেন, সেটাও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। ইতিহাস বলতে আমরা যেটা বুঝি আনিসুল হকের উপন্যাস ঠিক তা হয়। ইতিহাসকে তিনি এতো সহজভাবে নানা চরিত্র ও ঘটনার মধ্য দিয়ে পাঠকের সামনে হাজির করেছেন যা সব লেখকের পক্ষে সম্ভব হয় না। তার ভাষা প্রাঞ্জল, বর্ণনা চমৎকার। পড়তে গিয়ে মনে হয় যে, একজন শিল্পী যেন তুলির আঁচড়ে এঁকেছেন একটি মনোহর দৃশ্য। একবার পড়তে শুরু করুন। শেষ না করে উঠতে পারবেন না। তবে পাঠকদের আনিস এটাও জানিয়ে রেখেছেন যে, ইতিহাস হিসেবে নয়, ‘এটিকে উপন্যাস হিসেবে পড়তে হবে’। ইচ্ছে হচ্ছে উপন্যাস থেকে পাতার পর পাতা উদ্ধৃত করি। কিন্তু না। আপনারা নিজেরা বইটি পড়ুন এবং বই পাঠের স্বাদ এবং মজা উপভোগ করুন। আমি কেবল শুরুর দিকের দুটি অংশ তুলে ধরে আমার লোভ সংবরণ করছি।
৪৭ পৃষ্ঠা থেকে :
‘ স্যার, চিঠি কি আপনার আব্বায় লিখছেন?’
নির্জন সেলের বারান্দায় বসে আছেন শেখ মুজিব। বর্ষাকালের মেঘলা সকালে। আজকের আকাশটা খুবই বিষণœ। মেঘগুলো নেমে এসেছে অনেক নিচে, জলভারানত; তা যেন মন খারাপের ছায়া ছড়িয়ে দিতে চাইছে সমস্ত কারাগারজুড়েই।
যে প্রশ্ন করছে তার বয়স ২৫ কিংবা ৩৫; তার সামনের দাঁত দুটো একটু উঁচু, সবসময় বের হয়ে থাকে বলে একটুখানি হাসি হাসি ভাব লেগেই আছে মুখে। এই মেঘলা সকালে তার হাসিমুখটাতেও একটা গোপন বিষাদ ছড়ানো। কয়েদির পোশাক পরা যুবকটির দিকে তাকিয়ে চোখের চশমাটা অকারণেই একবার খুলে আবার পরে নিয়ে মুজিব বললেন, ‘হ্যাঁ। তুমি বুঝলা কেমনে?’ ‘স্যার, দেখলাম লেখা আছে ‘বাবা খোকা’, আব্বা ছাড়া আপনাকে এই কথা আর কে লিখতে পারে! ’…
পৃষ্ঠা ৫২ থেকে :
‘বাদলাঘাসের দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবলেন আবারও,আগাছার সঙ্গে পারা মুশকিল। মশিউর রহমান সাহেবের নতুন আবিষ্কার, পূর্ব পাকিস্তানে গোলমাল সৃষ্টির জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ টাকা-পয়সা দিয়েছে। আরে পাকিস্তানে তো আমেরিকার দালালরাই ক্ষমতায়। আইয়ুব খানকে ক্ষমতায় বসানোই হয়েছে আমেরিকার স্বার্থ পাহারা দেয়ার জন্য। সোহরাওয়ার্দী সাহেব যদি পাকিস্তানের মাটিতে আমেরিকান সেনাদের ঘাঁটির অনুমতি দিতেন, তাহলে তো তিনিই প্রধানমন্ত্রী থাকতেন। ইস্কান্দার মির্জা তাকে অপসারণ করতেন না।
পায়রার বাচ্চাটা আদর করছে মোরগটা। পশুপাখিরা কখনো বেইমানি করে না। মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করে।’…
প্রথমা থেকে প্রকাশিত ২৩২ পৃষ্ঠার উপন্যাসটির মূল্য ৪৬০ টাকা। সব্যসাচী হাজরার করা দৃষ্টিকাড়া প্রচ্ছদের বইটির ছাপা-বাঁধাই ভালো।
আনিসুল হকের জন্য অনেক শুভ কামনা।
লেখক : গ্রুপ যগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত