প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মন্তব্য নয়, পুরান ঢাকাকে রক্ষায় মমতাময়ীর কঠোরতাও চাই

আশীষ কুমার দে : আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে অমর ভাষাশহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা নিবেদন শুরুর ঘণ্টা দেড়েক আগে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড, প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে নতুন করে দেশবাসীকে জানানোর কিছু নেই। হৃদয়বিদারক ওই ঘটনায় দগ্ধ হয়ে এখনও যাঁরা বাঁচার জন্য লড়াই করছেন, তাঁদের দেখতে শনিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর অগ্নিট্রাজেডির পরও আহতদের দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি, নিহত পরিবারগুলোকে সহায়তাও দিয়েছিলেন। এমনকি ওই ঘটনায় বাবা-মা হারানো তিন যুবতীকে নিজের মেয়ের মর্যাদা দিয়ে বিয়ের ব্যবস্থাও করেছিলেন। একজন সরকারপ্রধান হিসেবে, একজন মা হিসেবে এটা তাঁর মমত্ববোধেরই বহি:প্রকাশ। শেখ হাসিনা অতীতে তিন মেয়াদে ১৫ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন বিষয়ে এমন মমত্ববোধের পরিচয় অসংখ্যবার দিয়েছেন।

শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চকবাজারে অগ্নিকা-ের ঘটনায় দগ্ধ ব্যক্তিদের দেখতে যান প্রধানমন্ত্রী। পরে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনার পরে রাসায়নিকের গোডাউন সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কেরানীগঞ্জে তাদের জন্য জায়গাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা পুরান ঢাকা থেকে সরতে রাজি হননি। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। (সূত্র: সমকাল অনলাইন, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। এর আগে চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই তিনি উদ্ধার তৎপরতাসহ যাবতীয় বিষয়ের ওপর নিবীড় পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়ে। ব্যাপক হতাহতের ঘটনায় ওইদিন তিনি বিনিদ্ররাত কাটিয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সব চেয়ে বড় এই বিয়োগান্ত ঘটনা নিয়ে ইতোমধ্যে কাঁদা ছুড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। মন্ত্রিসভার একজন সদস্যও এমন অনাকাঙ্খিত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত নিয়ে যতো বিতর্কই হোক না কেনো, একটি বিষয়ে সবাই একমত। তা হলো- বিভিন্ন গুদামে থাকা দাহ্য রাসায়নিক ও বিভিন্ন কারখানার কাঁচামালের কারণেই মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, ঘিঞ্জি অলিগলিতে ভরা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে এবং বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।

নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা পুরান ঢাকা থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট সব কটি সরকারি দপ্তর। নিজস্ব উদ্যোগে কোনো ধরনের অভিযান পরিচালনা করেনি বিস্ফোরক পরিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস। পুরান ঢাকার রাসায়নিক ব্যবসার ছাড়পত্র বন্ধ রেখেই দায়িত্ব শেষ করেছে এই চার সরকারি দপ্তর। কিন্তু গুদামে মজুদ রাখা অতি দাহ্য রাসায়নিক সরানোর দিকে মনোযোগ দেয়নি কেউ। তারা দায় চাপাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওপর। আর রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের চাপে ধরাশায়ী সিটি করপোরেশন। (সূত্র: কালের কন্ঠ, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়টি জানলেও কালের কন্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত ভয়ংকর খবরটি এতোদিন আমজনতার জানা ছিল না। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে ডিএসসিসি গঠিত হলেও রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের চাপের কারণে এ প্রতিষ্ঠানটি কাজ করতে পারেনি। অথচ স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা মেয়র ক্ষমতাসীন দল থেকেই নির্বাচিত।

জনগণের দেয়া করের টাকায় পরিচালিত সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা যদি এমন হয়, তাহলে বাাঁচার উপায় কী? পাকা ভবনসহ পুরান ঢাকার আবাসিক-বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো যতোই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠুক না কেনো, সেগুলোকে তো রাতারাতি ধ্বংস করা যাবে না। সেখানে বসবাসরত আমজনতাকেও আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা যাবে না। সবই রক্ষা করতে হবে। ‘সাপও মারতে হবে, কিন্তু লাঠিও ভাঙবে না’। তবে সর্বাগ্রে দরকার সাধারণ মানুষের প্রাণরক্ষা করা। এজন্য এ মুহূর্তে জরুরি কাজ হলো- সেখানকার ৮০০ রাসায়নিকের গুদাম, প্লাস্টিক কারখানা ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থের স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ।

দীর্ঘদিন যাবত আমার এক পরম সুহৃদ সপরিবারে পুরান ঢাকায় বসবাস করেন; যিনি সিটিজেন্স রাইট্স মুভমেন্ট নামের বহুল পরিচিত একটি সামাজিক সংগঠনের কর্ণধার। বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি পাগলামী (!) করে থাকেন। যেমন হাতিরঝিলের বিজিএমইএর অবৈধ ভবন উচ্ছেদ, মুঠোফোনের কলরেট কমানো, ব্যাংকলুটেরাদের গ্রেপ্তার ইত্যাদি দাবিতে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, গোলটেবিল বৈঠক করে থাকেন। তুসার রেহমান নামের এই ভদ্রলোক নিমতলী ট্রাজেডির পরও পুরান ঢাকার রাসায়নিকের গুদাম, প্লাস্টিক কারখানা ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থের স্থাপনা অপসারণের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই একটি কথা বলেন। তা হলো- প্রধানমন্ত্রী সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলে কোনো জাতীয় সমস্যার সমাধান হয় না, অন্যায়ের প্রতিকার হয় না। এসব কারণে অনেকে তাঁকে পাগলও বলে থাকেন।

এবার আমিও এই কথিত পাগলের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছি, অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর মিছিল থামাতে প্রধানমন্ত্রীকেই হস্তক্ষেপ করতে হবে। পুরান ঢাকাকে, পুরান ঢাকার আমজনতাকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে রাসায়নিক ও প্লাস্টিকজাত দ্রব্যের গুদাম ও কারখানাসহ সকল প্রকার দাহ্য পদার্থের স্থাপনা এখান থেকে উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যতোটা প্রয়োজন ততোটাই কঠোর হতে হবে। আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা- জননিরাপত্তার স্বার্থে, রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধের বহি:প্রকাশ ঘটাতে তিনি সে কাজটি করবেন।

সর্বাধিক পঠিত