প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চকবাজার ট্রাজেডি, কয়লা দেহ আর অঙ্গার মন

কাকন রেজা

কী বলবো চকবাজার ট্রাজেডি নিয়ে! বলবো, দুর্ঘটনা, অবহেলা, না হত্যা! দৈনিক মানবজমিন লিখেছে, ‘দুর্ঘটনা, না হত্যা?’ আমরা কী লিখবো? নিমতলীর ঘটনা, তাজরিন ফ্যাশন নিয়েও তো কতো লেখা হলো, কী হয়েছে? মামলা চলেছে, চলছে। চকবাজার ট্রাজেডি, হ্যাঁ, ট্রাজেডি বলা হচ্ছে, আসলে এসব তো ট্রাজেডিই। ট্রাজেডির কোনো শেষ নেই। দুঃখগাঁথার কোনো পরিণতি হয় না।

জনবহুল একটি জায়গা। যেখানে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার রাস্তা নেই। পুরান ঢাকার এমন গলি রয়েছে যেখানে রিকশাও ঢোকে না। এসব জায়গাতে গাদাগাদি করে মানুষ বাস করে। কেন করে, পুরান ঢাকার আয়েশি ভবনে বাস করার সঙ্গতি নেই দেখেই করে। ঘিঞ্জি দালানগুলোতে মেস বানিয়ে থাকেন দোকান কর্মচারী, ভ্যানচালক, হকারসহ স্বল্প আয়ের মানুষগুলো। আর থাকেন গ্রাম থেকে বড় মানুষ হওয়ার স্বপ্নে ঢাকায় পড়তে আসা মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের সন্তানরা। তারা থাকবে কোথায়, তাদের তো সঙ্গতি নেই ঝকঝকে বাসা ভাড়া নেয়ার। তাই কম টাকায় পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি দালানই তাদের ভরসা। কিন্তু তাদের সেই ‘ভরসা’কে ভরসা দেয়ার তো কেউ নেই।

একটা দালানে মানুষ থাকেন, সেই দালানেই রয়েছে হরেক রকম কারখানা। এর মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক ও প্রসাধনী সামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য প্রস্তুতের কারখানা। এসব পণ্য উৎপাদনের জন্য যে কাঁচামাল ব্যবহার হয়, তার সবই দাহ্য পদার্থ। সুতরাং সেখানে লোকজন মূলত সুপ্ত আগ্নেয়গিরির ওপরই বাস করেন। অপেক্ষা শুধু বিস্ফোরণের। আর চকবাজারে সেই বিস্ফোরণটাই হয়েছে।

এনটিভি খবরে বলেছে, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ থেকেই অগ্নিকা-। আবার কোনো কোনো মাধ্যম বলছে, গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণেই আগুনের ‘সূচনা’। খবরে ভাষার অলংকার হিসেবে ‘সূচনা’ শব্দটি ব্যবহার করেন অনেকেই। অথচ ‘সূচনা’ মূলত একটি ‘শুভ’ বাচক শব্দ। ধ্বংসাত্মক বিষয়ের সাথে ‘সূচনা’র ব্যবহার খুব একটা সুখশ্রাব্য নয়। তেমনি ঘনবসতিতে ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বা সঞ্চালন ব্যবস্থাও স্বস্তির ব্যাপার নয়। যদি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণেই অগ্নিকা- ঘটে, তার দায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ এড়াতে পারে না। এড়াতে পারে না সিটি করপোরেশনও। পারেন না যারা দাহ্য পদার্থ ব্যবহার ও কারখানা তৈরির অনুমতি দেন তারাও, অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিকরা। যদি বাণিজ্যিক এলাকা হয় বা কোনো দালান কারখানার জন্য ব্যবহার করা হয়, সে দালানে মানুষ বসবাসের জন্য ভাড়া দেয়াও সম্ভবত আইনের মধ্যে পড়ে না। এটা দেখভালের দায়িত্ব যে দপ্তরের, সে দপ্তরও দায়ের বাইরে নয়, থাকা উচিতও নয়। যখন এই লেখা লিখছি, তখন একাশিটি পুড়ে যাওয়া লাশ উদ্ধারের খবর দিয়েছে গণমাধ্যম। এই যে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভয়ংকর মৃত্যু, তার জন্য কী শোক বা সান্ত¡নাই যথেষ্ট? নাকি ক্ষতিপূরণের নামে কিছু অর্থ দিয়ে আত্মতৃপ্তির অসম্ভব চেষ্টাই সব কিছু? মানুষের মূল্য কী কয়েক লাখ টাকা? নিমতলী বা তাজরিনের ক্ষতিপূরণ কী সব ক্ষতির রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে? দেয়নি। ঘটে যাওয়া চকবাজার ট্রাজেডিই তার প্রমাণ।

আমাদের সামাজিক জীবন ক্রমেই ট্রাজিক চেহারা নিচ্ছে। ভেঙে পড়ছে সামাজিক নিরাপত্তা। সড়কে ‘মৃত্যুর মিছিল’ তাই মনে করিয়ে দেয়। ধর্ষণের ‘অশ্লীল উৎসব’ তেমনটাই ভাবিয়ে তুলে। মাদকের থাবা তারুণ্যকে থমকে দেয়। ঘর থেকে বেরোনাইটা যেন ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বেডরুমে কলেজ অধ্যক্ষার হত্যাও জানান দেয় অনিরাপদ হয়ে উঠেছে বেডরুমও।

চকবাজার ট্রাজেডিতে ফিরে আসি। এই যে ধ্বংস, এই যে তাজা প্রাণ পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া, এর জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা অবশ্যই সম্ভব। দায়িত্বশীলরা চাইলেই তা পারেন। ‘চাওয়া’টাই এখানে বড় ব্যাপার। তবে ‘ইচ্ছা’ আর ‘সদিচ্ছা’র মধ্যে পার্থক্যই অনেক কিছুর নির্ধারক হয়ে উঠে, উঠতে পারে। অনেকে মনে করেন, কিছুদিন গেলেই সব ভুলে যাবে মানুষ। মানুষ কী আসলেই সব ভুলে যায়, যায় না। মানুষের শরীর পুড়ে কয়লা হয়, আর মন পুড়ে হয় দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গার। আর সে অঙ্গার ধিকিধিকি জ্বলতেই থাকে। মানুষ নিজেই হয়ে উঠে একেকজন বিক্ষুব্ধ আগ্নেয়গিরি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত