প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বেদনার বিষাদসিন্ধু আর কতবার?

যায়যায়দিন :  একদিন আগেও রিকশা-গাড়ি আর মানুষে সরগরম ছিল পুরান ঢাকার এই গলি। মুহূর্তের আগুনে পুড়ে চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড় এখন ধ্বংসস্তূপ। চারাদিকে শোকের মাতম। এ যেন মৃতু্যপুরীতে বেদনার বিষাদসিন্ধু। বুধবার রাতের ওই অগ্নিকান্ডে অন্তত ৭৮ জন পুড়ে লাশ হয়েছেন, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়েছিল ঢাকা মেডিকেলের পরিবেশ। বৃহস্পতিবার দিনভর ধ্বংসস্তূপ আর হাসপাতালে অনেকে ছুটাছুটি করছিলেন নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে। প্রত্যক্ষদর্শীরা শিউরে উঠছেন ভয়াল সেই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে। বয়োবৃদ্ধ বাবাকে একরকম জোর করেই ব্যবসা থেকে সরিয়ে এনেছিলেন মাসুদ রানা ও মাহবুবুর রহমান রাজু; বাবা মোহাম্মদ শাহবুলস্নাহও নিশ্চিন্তে মনোনিবেশ করেছিলেন ধর্মচিন্তায়। স্বাবলম্বী হতে মাসুদ রানা মোবাইল এক্সেসরিজের ব্যবসা শুরু করলে পরে তাতে যোগ দেন তার মেজ ভাই রাজু। দুই ভাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন পরিবারের সবটুকু ভার। দুই মাস আগে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন রাজু। রানার ৪ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে, তার নাম মোহাম্মদ। চাঁদনীঘাটের কে বি রুদ্র রোডে রানা-রাজুদের বাসা। সেখান থেকে কিছু দূরেই চুড়িহাট্টায় তাদের দোকান এম আর টেলিকম। বুধবার রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডিতে আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বের হতে পারেননি রানা-রাজু। বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে তাদের লাশ পান স্বজনরা। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ খলিলুলস্নাহ বলেন, কাল যে রাস্তা দিয়ে দুই ভাই হাসতে হাসতে দোকানে গিয়েছিল, আজকে সে পথ দিয়ে আসবে দুই ভাইয়ের মৃতদেহ। এটা সহ্য করা যায় না। রানা-রাজুর পৈতৃক ভিটা নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলার ৬ নম্বর নাটেশ্বর ইউনিয়নের দক্ষিণ গোশকামতা গ্রামে। ১৯৭৬ সালে ব্যবসার সূত্রে সপরিবারে চাঁদনীঘাটে থাকতে শুরু করেন শাহবুলস্নাহ। ৩৫ বছর বয়সী রানা বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ থেকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এসএসসির পর পড়াশোনা না চালিয়ে রাজুও যোগ দেন ভাইয়ের সঙ্গে। শাহবুলস্নাহ বলেন, ‘আঁর দুই হোলায় বলত, আব্বা কেন কাজ করবেন? আমরা থাকতে আপনার কিসের অভাব? আপনি তাবলিগ করতে চান, চলে যান। যা টাকাপয়সা লাগে, আমরা দেব। আব্বা, আপনেই আমাদের বড় সম্পদ। আপনে না থাকলে আমরা তো সব হারিয়ে ফেলব।’ এখন দুই ছেলের পোড়া লাশ নিয়ে শাহবুলস্নাহর আহাজারি, ‘আমার দুই ছেলেকে আমি হারিয়ে ফেললাম। নিজের হাতে কেমন করে দুই ছেলের লাশ আমি কবরে নামাব!’ অগ্নিকান্ডের মিনিট কয়েক আগেই ছেলেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চলে এসেছিলেন তিনি। সে কথা মনে করে শাহবুলস্নাহ বলেন, মাত্র মিনিট কয়েক আগে আমি চলে এসেছিলাম। না হলে আমিও তো আমার দুই ছেলের সঙ্গে…।’ সদ্য সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়া এই বাবা বলেন, আমি আমার দুই সোনার টুকরারে হারায়া ফেললাম।

 

আমার দুই ছেলেই তো পরিবারের রোজগারের প্রধান অবলম্বন। দুই ছেলেকে হারিয়ে তার একমাত্র ভরসা এখন ছোট ছেলে খলিলুর রহমান মিরাজ। আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া মাসুদ রানার শ্যালক তাফসিল হোসেন বলেন, দুলাভাইয়ের মতো মানুষ হয় না। প্রথম পরিচয়েই মানুষকে তিনি বড় আপন করে নিতে পারতেন। তিনি কারো কাছ থেকে সাহায্য নিতেন না। কিন্তু সবাইকে সহযোগিতা করতেন।’ ব্যবসার কাজে চুড়িহাট্টায় \হগিয়েছিলেন তারা চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার আহমেদ গোছোয়ানি বাড়ির পলিথিন ব্যবসায়ী ঈসমাইল হাজী ও তার ছেলে সিদ্দিক বুধবার রাতে চুড়িহাট্টায় গিয়েছিলেন পস্নাস্টিকের কাঁচামাল সংগ্রহের কাজে। কিন্তু আগুনে পুড়ে লাশ হয়ে তাদের ঠাঁই হয়েছিল ঢাকা মেডিকেলের মর্গে আরও অনেক লাশের ভিড়ে। বৃহস্পতিবার সকালে তাদের মরদেহ শনাক্ত করেন জামাতা শহীদ মিয়া। শহীদ বলেন, বাড়ি থেকে রাতে ফোন আসে, শ্বশুর আর সম্মন্ধীর মোবাইল বন্ধ। তারা পুরান ঢাকায় পলিথিনের তাগাদা করতে গিয়েছিল। আমরা জানতাম, তারা চকবাজারেই যায়। সেই চকবাজার থেকেই তারা চলে গেল একেবারে। সকালে গিয়ে আমি নিজে লাশ শনাক্ত করেছি। ওয়াহেদ মঞ্জিল থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন বুলবুল প্রথম যে ভবনে আগুন লাগে, সেই ওয়াহেদ মঞ্জিলের দোকানপাট ও গুদামে থাকা ক্রেতা-বিক্রেতাদের অনেকেই বের হওয়ার সুযোগ পাননি। তবে প্রাণে বেঁচে গেছেন ওই ভবনের চতুর্থ তলার বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ; বেঁচে গেছে তার পরিবারের ১১ সদস্যও। বুলবুল বলেন, অগ্নিকান্ডের ঘটনার সময় তিনি ও তার পরিবারের তিন সদস্য ছিলেন ভবনের বাইরে। আগুন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে বাকি সাত জন দ্রম্নত নেমে আসেন। কিন্তু ধোঁয়ায় তাদের তিনজন সংজ্ঞা হারান। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তারা বাড়ি ফিরে যান।

 

আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল তা স্পষ্ট না হলেও আশপাশের ভবনে উচ্চমাত্রার রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের মজুদের কারণেই চকবাজারের অগ্নিকান্ড বিভৎস রূপ নেয় বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। চারতলা ওয়াহেদ মঞ্জিলের দ্বিতীয় তলাতেও পস্নাস্টিক সামগ্রী তৈরির উপকরণ এবং প্রসাধনীর গুদাম ছিল। বুলবুল বলেন, পাঁচ বছর ধরে এই বাড়িতে থাকি। কিন্তু কখনো জানতাম না, নিচতলায় গোডাউনে কী আছে। সবসময় তালাবন্ধ দেখতাম। বাড়িওয়ালাও কখনো এসব নিয়ে বলতেন না। বিভীষিকাময় সেই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বুলবুল আহমেদ বলেন, ‘যে যেভাবে পারছি, দৌড়াইছি। চারপাশ থেকে কানে একটাই শব্দ ছিল- আগুন আগুন…।’ দাওয়াত থেকে ফেরা হলো না রোহানের ২১ বছর বয়সী তানজিন হাসান রোহান অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি গিয়েছিলেন দাওয়াত খেতে। তার চাচা আগামসি লেনের বাসিন্দ রফিক বলেন, ‘ও গেল দাওয়াতে। তারপর ওই এলাকা দিয়ে বাসায় ফিরছিল। আমার ভাতিজা লাশ হয়ে এলো।’ বাবার ছবি নিয়ে \হঘুরছেন নাসরিন পুরান ঢাকার ২৬ নম্বর আজগর লেনের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বাবুল অগ্নিকান্ডের পর থেকেই নিখোঁজ। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তার মেয়ে নাসরিন আক্তার বাবার ছবি নিয়ে ঘুরছিলেন নন্দ কুমার দত্ত রোডে। শুক্রবার সকালে তিনি বলেন, ‘বাবা রাত ১০টায় বাসা থেকে বের হন। এর আগে তার এক বন্ধুকে ফোন করে জানান- তারা একসাথে দোকানে চা খাবেন। বাবা বাসা থেকে নামার কিছুক্ষণ পর আগুন লাগার কথা জানাতে পারি। তখন থেকে বাবার মোবাইল বন্ধ পাচ্ছি।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও জয়নালের সন্ধান পাননি তার মেয়ে। ভবন থেকে বের হতেই পুড়ে অঙ্গার মাহি বিকট বিস্ফোরণের শব্দে ভবন থেকে বের হয়ে এসেছিলেন ওয়াসি উদ্দিন মাহি। নন্দ কুমার দত্ত রোডের আগুন তখন ছড়িয়ে পড়েছে গলিতেও। তার ফুপু তানজিলা ইসলাম ইতি বলেন, ‘সেন্ট্রাল রোড থেকে দাদির বাসায় এসেছিল মাহি। শব্দে শুনে বের হয়ে দেখতে গিয়েছিল। তারপর সে আর বাসায় ফিরতে পারেনি।’ ২২ বছর বয়সী মাহি তার বাবার সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা দেখাশোনা করতেন বলে জানান ইতি। বাবা আসলো না বাবাকে বলেছিলাম, তাড়াতাড়ি বাসায় আইসো। কিন্তু বাবা আর আসলো না- এ কথাগুলো বললেন ফারিহা তাসনিম। তিনি চকবাজারে আগুনের ঘটনায় নিখোঁজ ব্যবসায়ী মো. ফয়সালের মেয়ে।

 

শুক্রবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ডিএনএ স্যাম্পল দেয়ার পর একথা বলেন তিনি। ফারিহা তাসনিম বলেন, ‘আমরা দুই বোন (ফারিহা তাসনিম ও ফাহিমা তানজিম) এবং আমাদের মা ফাতেমা আক্তার। পুলিশের অপরাধ বিভাগ- সিআইডিকে ডিএনএ স্যাম্পল দিয়েছি। স্যাম্পল হিসেবে আমাদের দুই বোনের মুখের লালা আর মায়ের রক্ত নেয়া হয়েছে।’ নিখোঁজ ফয়সালের ভাগ্নে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘২/৩ দিন পর আমাদেরকে চকবাজার থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়ির ১০টা বিল্ডিং- এর পরে আগুন লাগে। রাত ১০টার দিকে আমরা তখন টিভি দেখছিলাম। ভূমিকম্প হলে খাট যেভাবে নড়ে ওঠে, সেভাবে নড়ছিল। ঝড় হলে যেমন শব্দ হয়- সেরকম শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছিল। এ সময় বিদু্যৎ বন্ধ হয়ে যায়। বারান্দায় গিয়ে দেখি, ৭/৮ তলা উঁচুতে আগুন উঠে গেছে। তখন দৌড়ে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করি।’ তিনি বলেন, ‘দুদিন ধরে মামাকে (ফয়সাল) পাই না। ধারণা করছি, তিনি আর বেঁচে নেই।’

উৎসঃ যায়যায়দিন

সর্বাধিক পঠিত