প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আগুনের উৎস নিয়ে বিতর্ক

ডেস্ক রিপোর্ট : পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় গত ২০ ফেব্রুয়ারির রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কতজন মারা গেছেন সে সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য জানা যায়নি। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেছেন, তারা ৬৭টি মৃতদেহ পেয়েছেন। এ সংখ্যা বাড়তে পারে। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি কীভাবে ঘটল সবাই এখন সে বিষয়টি জানার চেষ্টা করছেন।

ঘটনার সময় আশপাশে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় এমন একাধিক ব্যক্তি এবং উদ্ধার কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের সঙ্গে দুর্ঘটনার বিষয়ে কথা বললে তারা একেক জনে একেক ধরনের তথ্য দেন।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেছেন, চুড়িহাট্টা মোড়ে অগ্নিকাণ্ডের ঠিক আগ মুহূর্তে বিস্ফোরণের বিকট একটি শব্দ শুনেছিলেন তারা। এর পরে তারা দেখতে পান শুধু আগুন আর আগুন। যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তারা বলেন, ঘটনার সময় ওই এলাকায় ছিল প্রচণ্ড যানজট। এ সময় একটি প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়। তার পাশেই ছিল সিলিন্ডারবাহী এক পিকআপ ভ্যান। মুহূর্তের মধ্যে পিকআপ ভ্যানটিরও কয়েকটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয় এবং গাড়িটি বিস্ফোরণের সময় ৮-১০ফুট উপরের দিকে উঠে যায়।

এ সময় পাশের ট্রান্সমিটারটির বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে ওই এলাকা অন্ধকার নেমে আসে। ঠিক একই সময় সিলিন্ডার এবং ট্রান্সমিটার বিস্ফোরণের আগুন পাশের ওয়াহেদ ম্যানশনে ছড়িয়ে পড়ে। কেননা তখন ওয়াহিদ ম্যানশনের একাধিক ফ্লোরে ছিল কেমিক্যাল জাতীয় দাহ্য পদার্থ। এরমধ্যে ছিল ফারফিউম জাতীয় কেমিক্যাল, ফ্লাস্টিকের র’ ম্যাটারিয়ালস (দানা)। এগুলো খুবই দাহ্য পদার্থ হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে ভবনে আগুন দ্রুত ভয়াবহ আকারে ছড়াতে এক মিনিটেরও কম সময় লাগে। বিস্ফোরণের সময় যেহেতু বিদ্যুৎ চলে যায় এবং অন্ধকার নেমে, আর আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পরে তাই রাস্তায় যানজটে আটকে থাকা মানুষও কোনো দিকে যেতে পারেনি। তারা সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

স্থানীয় যুবক মো. আশিক উদ্দিনের দাবি, অগ্নিকা- শুরু হওয়ার সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে ২৫-৩০ গজ দূরে নন্দকুমার সড়কে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বিস্ফোরণের বিকট শব্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকিয়ে দেখেন, মোড়ের হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে আগুন ধরে যাওয়া একটি পিকআপ আট-দশ ফুট ওপর থেকে নিচে পড়ছে। এরপরই সেই আগুন পাশে ছড়িয়ে যায়।

রহমান নামে এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে থাকা পিকআপে সুগন্ধির বোতল ছিল। সেখান থেকে সুগন্ধির বোতল নামিয়ে ওয়াহেদ ম্যানশনের উল্টো পাশের ভবনে ঢোকানো হচ্ছিল। পিকআপটিতে আগুন লাগার পর সুগন্ধির বোতল বিস্ফোরিত হতে থাকে।

তবে আগুনের সূত্রপাত কি কারণে তা জানার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পরই জানা যাবে আগুন লাগার এবং দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার আসল কারণ।

যদিও শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন গত বৃহস্পতিবার রাতে জানিয়েছেন, চকবাজার এলাকায় অগ্নিকা-ের ঘটনাটি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ঘটেছে। এই ঘটনার সঙ্গে কেমিক্যালের গোডাউনের কোনো সম্পর্ক নেই। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সেখানে যা ঘটেছে তার সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। সেখানে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে দুর্ভাগ্যবশত একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে আগুন লাগে। এতে ট্রান্সফরমারটিও বিস্ফোরিত হয়ে পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। তবে সেখানে কেমিক্যালের কোনো গোডাউন নেই, পারফিউম ও কসমেটিক সামগ্রীর গোডাউন আছে। কেমিক্যালের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক নেই। তবে শিল্পমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ফায়ার সার্ভিস ও ডিপিডিসি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান বলেছেন, চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনে ভস্মীভূত ওয়াহিদ ম্যানশনে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। তিনি বলেন, ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। এ ছাড়া আরও অন্যান্য কেমিক্যাল ছিল। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে।

তিনি আরও বলেন, পারফিউমের বোতলে রিফিল করা হতো এখানে। সেই বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমার মতো কাজ করেছে। কেমিক্যালের কারণে আগুন এভাবে ছড়িয়েছে, না হলে কখনোই আগুন এভাবে ছড়ায় না। আমরা দেখেছি এখানে যে জিনিসগুলো আছে সেগুলো অবশ্যই কেমিক্যাল। ওয়াহিদ ম্যানশনে কেমিক্যাল ছিল না- শিল্পমন্ত্রী কথাটা কোন আঙ্গিকে বলেছেন এটা আমার জানা নেই।

শিল্পমন্ত্রীর এমন বক্তেব্যেও পর ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান জানিয়েছেন, চুড়িহাট্টা মোড়ের আগুনের ঘটনায় কোনো ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়নি। ঘটনার পর ডিপিডিসির পক্ষ থেকে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শনিবারের মধ্যে (আজ) কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে।

বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম বলেছেন, আমরা ঘটনাস্থল থেকে অনেক ক্লু পেয়েছি। ধারণা করা হচ্ছে তিনটি কারণে আগুন লাগতে পারে। কারণগুলো হচ্ছে-ট্রান্সফরমার, গ্যাস সিলিন্ডার অথবা কেমিক্যাল বিস্ফোরণ। গতকাল পুরান ঢাকার চকবাজারে আগুন লাগার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আগুন লাগার কারণ জানতে এরই মধ্যে বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

জানা গেছে, চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর একাধিক সংস্থার পক্ষ থেকে কমিটি করা হয়েছে। বেশির ভাগ সংস্থাই বলছে সাত দিনের মধ্যে কমিটি রিপোর্ট দেবে। এসব কমিটির মধ্য রয়েছে- ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) গঠিত তদন্ত কমিটি, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কমিটি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি এবং ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) কমিটি।

উৎসঃ খোলা কাগজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত