প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের দেওয়াল ঘেষে দেশের প্রধান রাসায়নিক বাজার
তরল রাসায়নিক বিস্ফোরিত হলে উড়ে যাবে মিটফোর্ড হাসপাতাল, বাবুবাজার সেতু, আর্মেনিয়ান চার্চ!

আসিফুজ্জামান পৃথিল : রাজধানীর মিটফোর্ড রোডের শেষমাথায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের শেষ অংশে গেলেই নাকে তীব্র সুগন্ধ ধাক্কা মারবে। এই গন্ধের উৎপত্তিস্থল ড্রাম ড্রাম আতর, স্ফটিক এবং তরল অবস্থায় থাকা রাসায়নিক। একটু সামনে এগুলেই সুউচ্চ মিটফোর্ড টাওয়ার। এখানে বিশাল বিশাল বোতলে অতিদাহ্য আতর আর ড্রামে সুগন্ধী রাখা। একটু বামে আরমানিটোলার দিকে ঘুরতেই দেখা যাবে রাস্তায় অবহেলায় পড়ে আছে সারি সারি ড্রাম আর বস্তা। একটু আগ্রহ নিয়ে এই ড্রাম আর বস্তার গায়ের লেবেল পড়লে পিলে চমকে উঠে। এই বস্তা আর ড্রামে রয়েছে ট্রাই নাইট্রো টলুইন, শুকনো নাইট্রেট, লিটার লিটার ফরমালডিহাইড আর ইথানল। এগুলো এই পৃথিবীর ভয়ংকরতম বিস্ফোরক!

ড্রাম আর বস্তার গায়ে বিপজ্জনক দাহ্য বস্তুর সংকেত আঁকা রয়েছে। তবে সেটি শুধু আঁকাই রয়েছে। যে শ্রমিকরা এগুলো ট্রাক থেকে নামান বা ট্রাকে উঠান, কিংবা পরিবহণ করেন এই বিষয়ে তাদের নূন্যতম শিক্ষা বা প্রশিক্ষণও নেই। তারা এই সংকেতের মর্মার্থও জানিন না। হুক ব্যবহার করে বস্তা তোলার কারণে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে সুগন্ধী রাসায়নিক! এই রঙিন রাসায়নিক কারণে এলাকার ড্রেনের পানিও রঙিন! সাবেক সাবিস্তান সিনেমাহলের স্থানে এখন গড়ে উঠেছে সারি সারি গুদামঘর। একপাশে আয়ুর্বেদিক ফার্মেসির (এপি) কারখানা। এসব গুদামের মধ্যে একটি বেশ বড় আকারের গুদামের ব্যবস্থাপক হযরত আলি। তিনি কোনভাবেই জানেন না এই রাসায়নিকগুলো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি মন্তব্য করেছেন তার গুদামে কোন বিস্ফোরক নেই। তবে তিনি নিজের গুদামে থাকা রাসায়নিকের নাম নিতে গিয়ে ইথানল, ফরমালডিহাইড, টলুইন আর নাইট্রেটের নাম নেন! তার মতে এগুলো কৃষি রাসায়নিক। এগুলোর সঙ্গে বিস্ফোরকের কোন সম্পর্ক নেই। একটি ধাতুর তৈরী ইথানলের ড্রাম থেকে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে কোন দাহ্য রাসায়নিক নেই। এখানে থাকা রাসায়নিকের মধ্যে কয়েকটন টলুইন, নাইট্রেট আর কয়েক হাজার লিটার ফরমালডিহাইড আর ইথানল রয়েছে। এগুলো তো ডিব্বা আর ঢোপে (বড় আকারের বস্তা) থাকে। ঢোপের ভিতরে থাকে ছোট ছোট বস্তা। এখানে কিছুই হবে না। আগুনও লাগবে না।’

হযরত আলীর মতোই অধিকাংশ শ্রমিক আর গুদাম কর্মী জানেনই না এসব রাসায়নিক সৃষ্ঠ ঝুঁকির কথা। তাদের সে প্রশিক্ষণও নেই। তবে ব্যবসায়ীরা বিষয়টি জানেন না এমন নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তিনি এই এলাকায় ব্যবসা করলেও এই এলাকায় থাকেন না। কারণ কখন কি হয়ে যায় বলা যায় না। নিজের প্রতিষ্ঠানের অফিস করেছেন খানিকটা দূরে মিটফোর্ড টাওয়ারে। তিনি জানিয়েছেন তার পণ্যের ইন্স্যুরেন্স করা আছে। এ কারণে তার দুশ্চিন্তা কম। এই ব্যবসায়ী স্বীকার করে নিয়েছেন, তিনি বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে যে অনুমোদন নিয়েছেন তার চেয়ে বেশিই পণ্য রাখেন। কারণ পণ্য মজুদ না করলে তার সরবরাহ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যেটা তিনি চাননা। তবে তার দাবি তিনি অগ্নি নির্বাপনের ব্যবস্থা নিয়েছেন। তার ৮ হাজার বর্গফুটের গুদামে একটি ফায়ার এক্সটিংগুইসার আছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি। তবে এটিতে কবে সর্বশেষ গ্যাস ভরা হয়েছে সেটি তিনি বলতে পারেন নি।

মিটফোর্ড টাওয়ারের আরেক কৃষি রাসায়নিক ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াহেদ। তিনি নিজে রসায়নের ছাত্র এবং তার কেমিস্ট লাইসেন্স রয়েছেন। তিনি বলেন, তার গুদামে তিনি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা গ্রহণ করেছেন এবং সেই গুদাম মিটফোর্ডেও নয়। ওই ব্যবসায়ি জানান, তিনি তার শ্রমিক কর্মচারিদের রাসায়নিক বস্তু সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। তবে সব ব্যবসায়ী ওয়াহেদের মতো সচেতন নন। ওয়াহেদ স্বীকার করেছেন, অধিকাংশ গুদামই কোনভাবেই নিরাপত্তা বিধমালা মেনে চলে না। কারণ এতে ব্যয় হয় বেশি, মুনাফা কমে।

নিমতলির পর চুড়িহাট্টা ট্রাজেডির পর টনক নড়েছে অনেক স্থানীয় বাসিন্দার। জুতা তৈরী করে এমন এক প্রতিষ্ঠানের সেলসে কাজ করেন নিখিল চন্দ্র রায়। সম্প্রতি তিনি তার স্ত্রী এবং কন্যাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন। তিনি উঠেছেন নিজের প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি, মিটফোর্ডেই। তবে চুড়িহাট্টার পর তিনি স্ত্রী আর শিশু সন্তানকে কাছে রাখতে চাইছেন না। তিনি এখন তাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে চান। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার পেশাগত কারণে এখানে থাকতে হচ্ছে। প্রচ- ঝুঁকি আছে জানার পরেও। কিন্তু অন্যদের বিশেষত আমার শিশু সন্তানকে নিয়ে এই ঝুঁকি নিতে পারি না। এ কারণে তাদের গ্রামে পাঠিয়ে দেবো ভাবছি।’ যে সব শ্রমিক রাসায়নিক দ্রব্যের কারখানায় কাজ করেন, তারা নানান স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু তারা এর কারণ জানেন না। প্রায়শই মিটফোর্ড হাসপাতালে তাঁদের ভিড় লেগে থাকে। এই হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আশিফ জানিয়েছেন, রাসায়নিকযুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার কারণে তাদের এসব সমস্যা হচ্ছে। ফুঁসফুসের সমস্যা, খাদ্য নালীর সমস্যায় শ্রমিকদের প্রায় সকলেই ভোগেন। অনেকেই আক্রান্ত হন ক্যান্সার এবং কিডনিজনিত রোগে। আর চর্মরোগ এই শ্রমিকদের জন্য খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এমন শ্রমিক খুঁজে পাওয়া দুস্কর যাদের চর্মরোগ নেই। সম্পাদনা : ইকবাল খান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত