প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাঙালি মুসলমানের আসাম প্রেম

রবিউল আলম : আমার ছোট ফুফাতো ভাই যিনি আসামে থাকেন, আমার বড় ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ৩০ নভেম্বর ঢাকায় আসেন। ১৯৮৬ সালেও একবার এসেছিলো। আমি মাঝে মাঝে আসামে বেড়াতে যাই, অনেক আদর আপ্যায়ন করেন। ভাইদের কাছে পেয়ে কিছুটা হলেও শোক থেকে বিরত ছিলাম। ভাইদের নিয়ে বাংলাদেশের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প ঘুরে দেখানো হয়। পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু সেতু, ফ্লাইওভার, হাতিরঝিল, নৌ ওয়াটার বাস, জাতীয় সংসদ ভবন, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৩২নং বাড়ি আরো অনেক স্থান। মোট কথা আমার পক্ষে পুরো বাংলাদেশকে দেখাতে পারলে ভালো হতো। আমি যখন আসাম ঘুরে দেখেছি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আসাম, উল্লেখ করার মতো বিশে^র বৃহৎ কাজীরঙ্গা ন্যাচারাল পার্ক। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে আমার ভাই হতবাক। ১৯৮৬ সালের বাংলাদেশ এবং ২০১৭ সালের বাংলাদেশকে মিলাতে পারছেন না। কিছুটা লজ্জা পেয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানোর মতো বলেন, আসামে আপনাকে কিছু না দেখাতে পারলেও ভারতের তুলনা হয় না, আর একবার গেলে আপনাকে বোম্বে, দিল্লি, আগ্রার তাজমহল দেখাবো। আমি চেয়ে আছি আমার ভাইয়ের মুখের দিকে। এ কেমন কথা, ভারত বিশে^র উল্লেখযোগ্য দেশ, আমরা সবাই জানি। ভারত দেখলে বিশে^র রূপ দেখা যায়। ভারতের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করার মতো বোকামি আমার হয়নি। আমি অবাক হয়েছি একজন মুসলিম বাঙালি হয়েও ভারতপ্রেম কীভাবে তাকে গ্রাস করেছে। জন্মস্থানের প্রেম কতোভাবে মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। আমি আমার ভাইকে একবারও বলিনি আসাম সম্পর্কে। আমার জন্মও ভারতের আসাম রাজ্যে, আমি ভারতের আসাম রাজ্যের নাগরিক হতে পারি, সেই দেশের আইন মোতাবেক ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত অবস্থানকারীরা সেই দেশের এনআরসি পাবেন। আমাদের যেহেতু কাগজপত্র, দোকানের লাইসেন্স, জন্মগত সার্টিফিকেট আছে, তবুও আমার মনে হয়েছে কে চাইবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হতে। বাংলাদেশ আমার পূর্ব পুরুষদের। আমিও ৫৩ বছর এ দেশে বসবাস করছি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছি। বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির নাগরিক হয়ে আমি সম্মানিত। বাঙালি যেখানেই থাকবে, কর্ম ও প্রেম ভালোবাসা দিয়ে সকলকে জয় করে নেবে। কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলাম, তুমি আমাকে বোম্বে, দিল্লি দেখাতে চাইলে কেন, আমি তো তোমাদের দেখতে যাই। বংশের একমাত্র জীবিত ফুফুকে দেখতে যাই আসাম। বোম্বে, দিল্লি আমার কাছে বড় বিষয় নয়, বাংলাদেশকে দেখে তোমার কী মনে হয়েছে? ভাই আরেকবার লজ্জা পেয়ে কাচুমাচু করে বললো, দাদা সব কিছু আছে ভারতে, মনের স্বাধীনতা নেই। আসামের জনগণ এতো ভালোবাসা, এতো সম্মান দিয়েছে, আসাম ছাড়া আর কিছু ভাবতেও পারছি না। আসাম আমাদের রক্তে-মাংসে মিশে আছে। এতো বড় ভারতের আসাম রাজ্যের উন্নয়ন আর বাংলাদেশের উন্নয়ন মিলাতে পারছিলাম না। আপনাদের জীবন মান, আর আমাদের জীবন মান মিলাতে পারছিলাম না। আমার ভাবনার অন্তরে ভেসে উঠলো। আসামের নওগাঁ থেকে কাজীরঙ্গা বেড়াতে গিয়েছিলাম বোনের বাড়ি ৩৫০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে, আত্মীয় বলে কথা। কিছু একটা নিতে হয়। মিষ্টির দোকানের দোকানিকে অর্ডার দেয়া হলো ১০টি গোল্লা দেয়ার জন্য। দোকানি পাতলা একটা পলিথিনের ভেতরে ১০টি গোল্লা দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ১০টি গোল্লা ক্রয়ের অপরাধে এতো বড় ক্রেতা দেখে। পাঠক ভেবে দেখুন, আমাদের দেশে কী এটা চিন্তা করা যায়? তার ওপর আমার ভাই ৫০ কোটি টাকার মালিক হবে কম করে হলেও। আমাদের দেশের একজন পিয়নও ১০টি গোল্লা নিয়ে কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাবে না। ভারতের নাগরিকরা অতিরিক্ত ব্যয় থেকে বিরত থাকে। আমরা অতিরিক্ত ব্যয় ধার-কর্জ করে হলেও করি। দাদা আপনাদের দেশের উন্নয়ন দেখে অবাক হয়েছি। বোম্বে, দিল্লি, আগ্রা ছাড়া আর কিই বা দেখাতে পারি- বলে একটু সান্ত¡না পেলাম এই আর কী। একজন বাঙালি মুসলমানের ভারত (আসাম) প্রেম দেখে আমিও অবাক হয়েছি।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত