প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বরিশালে আওয়ামী লীগ নেতার হত্যায় ফেঁসে যাচ্ছেন উপজেলা চেয়ারম্যান

হীরা: জেলার চাঞ্চল্যকর উজিরপুর উপজেলার জল্লা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টু হত্যা মামলায় এবার ফেঁসে যেতে পারেন ওই উপজেলার বহুল বির্তকিত উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবাল।

হত্যাকান্ডের প্রায় সাড়ে চার মাস পর আদালতের বিচারকের কাছে লিখিত ভাবে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন হয়রানীর উদ্দেশ্যে ওই মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে থাকা ছাত্রলীগের দুই নেতা। নিহত চেয়ারম্যান নান্টুর সাথে উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবালের মধ্যে কোটি টাকা মূল্যের দুটি কষ্টি পাথরের মূর্তি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যান নান্টুকে খুন করা হতে পারে, এমন লিখিত জবানবন্দি দেয়ার পর পুরো বরিশাল জুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

লিখিত জবানবন্দিতে হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত জেলহাজতে থাকা জল্লা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মামুন শাহ ও ছাত্রলীগ নেতা কাওসার সেরনিয়াবাত গ্রেফতার হওয়ার পরে আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছিলো তা প্রত্যাহার চেয়ে নতুন করে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবালের উপস্থিতিতে পুলিশের বিরুদ্ধে নির্মমভাবে শারিরিক নির্যাতনেরও অভিযোগ করা হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি নতুন জবানবন্দি দেয়ার পর নান্টু হত্যার তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে।

মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যান নান্টু হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় জেল হাজতে থাকা এজাহারভুক্ত ছয় আসামি গত বছরের ৮ নভেম্বর একই আদালতে তাদের দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের জন্য পৃথকভাবে লিখিত আবেদন করেছেন। আদালতের বিচারক মো. এনায়েত উল্লাহ্ আসামিদের আবেদনপত্রগুলো আমলে নিয়ে শুনানির তারিখ ধার্য রাখেন। আদালতে আবেদনকারীরা হলেন-জেল হাজতে থাকা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছাত্রলীগ নেতা শাকিল ইসলাম রাব্বি, কাওসার সেরনিয়াবাত, আব্দুল কুদ্দুস, দীপক বালা, মামুন শাহ্ ও হাদিরুল ইসলাম হাদি। এরা সকলেই আবেদনপত্রে আদালতে নিজেদের দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি অনিচ্ছাকৃত দাবী করে পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

তারা পুলিশের বিরুদ্ধে তাদের ছয়জনকে চারদিন আটকে রেখে অমানুষিকভাবে শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছে বলেও বিচারককে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। এছাড়া পুলিশ তাদের প্রত্যেককে ক্রসফায়ার ও পরিবারের সদস্যদের আটক করে নির্যাতনের ভয়ভীতি দেখিয়ে আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে বলেও উল্লেখ করেন।

লিখিত জবানবন্দিতে এজাহারভুক্ত আসামি কাওসার সেরনিয়াবাদ বিচারককে জানিয়েছেন, উপজেলার জল্লা এলাকার বরিয়ালির বাসিন্দা জনৈক সান্টু ও উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবালের সাথে খুন হওয়া চেয়ারম্যান নান্টুর দুইটি কষ্টি পাথরের মূর্তি নিয়ে বিরোধ চলে আসছিলো। পরে এ বিষয়ে সান্টুর কাছে জানতে চাইলে সান্টু তাকে জানায় মুর্তি দুইটি ইকবাল চেয়ারম্যানের কাছে আছে কিন্তু নান্টু চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ইকবাল ভাই মুর্তি নিয়ে এখন অস্বীকার করছে।

মামুন শাহ তার জাবনবন্দিতে উল্লেখ করেন, নান্টু খুন হওয়ার কিছুদিন পূর্বে বরিয়ালি গ্রামের বাসিন্দা সান্টু ও উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবালের সাথে নিহত চেয়ারম্যান নান্টুর বিরোধ চলে আসছে। নান্টুর সহযোগি কুলের বাজারের বাসিন্দা লাবাই বাড়ৈর মাধ্যমে কষ্টি পাথরের মূর্তি ইকবালকে দেয়া হয়েছে। ইকবাল সেই মুর্তি আত্মসাত করে মুর্তি নেয়ার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। এনিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিলো।

আসামি দীপক বালা তার লিখিত জবানবন্দিতে বলেন, চেয়ারম্যান নান্টু হত্যার ঘটনায় তিনি কিছুই জানেনা কিন্তু নান্টু মাদক ব্যবসায় জড়িত এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও বক্তব্য তিনি ইউটিউবে প্রকাশ করেছেন। এ কারনে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। পরে উজিরপুর মডেল থানার ওসি শিশির কুমার পালের উপস্থিতিতে উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবাল তার সাথে সাক্ষাত করে তাকে (দীপক) মামলা থেকে রেহাই দেয়ার প্রলোভন দেখায়। চেয়ারম্যান ইকবাল তাকে রাব্বি, টিটু, শেখর চৌধুরী, কাওসার সেরনিয়াবাত, মিরাজ সেরনিয়াবাত, হাদি, মামুন শাহ্ এই নামগুলো মুখস্ত করিয়ে বলেন নান্টুর হত্যার বিষয়ে কেউ জিজ্ঞেস করলে এই নামগুলো বলবি। স্বাক্ষর চাইলে স্বাক্ষর করবি। তোর কোন ভয় নাই। তোর জন্য যা কিছু করা দরকার আমি করবো। এ কথা বলে চেয়ারম্যান ইকবাল দীপক বালাকে নগদ তিন হাজার টাকা এবং একটি লুঙ্গি ও গেঞ্জি কিনে দেয়।

আসামি শাকিল ইসলাম রাব্বি আবেদনে উল্লেখ করেন, হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উজিরপুর মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) হেলাল উদ্দিনসহ একদল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গত বছরের ৪ নভেম্বর ঢাকায় তার ছাত্রলীগের কার্যালয় থেকে তাকেসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করে। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানেই তাদের সকলের হাতে পিস্তল, ইয়াবা ও সাদা লবন জাতীয় প্যাকেট দিয়ে ভিডিও করে। এমনকি তার (রাব্বি) অফিসের সিসি ক্যামেরা, মনিটর, প্রাইভেটকারের চাবি, নিজের চিকিৎসার কাগজপত্র, নগদ অর্থ, ট্যাব ও মোবাইলসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র নিয়ে যায়। যা সেখানকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে। পরে পুলিশ তাকে নিয়ে যায় রাজধানীর মিন্টু রোডের ডিবি অফিসে। সেখানে পুলিশ তার হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ও চোখ মুখ বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করে হাতিরঝিলে নিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়।

আসামি শাকিল ইসলাম রাব্বি আবেদনে আরও উল্লেখ করেন, তাকে বরিশালে এনে একটি রুমে আটকে রেখে নগ্ন করে ইলেকট্রিক শর্টসহ নির্মম শারিরিক নির্যাতন চালায়। তখন উজিরপুর মডেল থানার ওসি শিশির কুমার পাল তাকে (রাব্বি) বলে, নান্টু ইয়াবা ব্যবসা করে সে দৃশ্য কেন ইন্টারনেটে ছেড়ে দিলি, নান্টু ভিজিএফএর চাল চুরি করেছে এনিয়ে কেন মানববন্ধন করেছিস। এটাই তোর অপরাধ। এখন আমরা যেভাবে বলবো সেভাবেই স্বীকারোক্তি দিবি। অন্যথায় রিমান্ডে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানের নামে নান্টু যেখানে মারা গেছে সেখানেই তোকে ক্রসফায়ার দেবো। আর তোর পরিবারের সবাইকে গ্রেফতার করে তোর মতো অবস্থা করবো।

এদিকে আদালতে আসামিদের দাখিলকৃত আবেদনপত্রগুলোর মাধ্যমে চেয়ারম্যান নান্টু হত্যাকান্ডের ঘটনা তদন্তে নতুন করে মোড় নিয়েছে। বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে হত্যার পিছনের মূলরহস্য। ফেঁসে যাচ্ছেন উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবাল। যিনি জল্লার ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বিশ্বজিৎ হালদার নান্টু হত্যার মাত্র একঘন্টার মধ্যেই গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন হত্যার সাথে কারা জড়িত। এতো অল্পসময়ের মধ্যে তিনি কিভাবে নিশ্চিত হয়েছিলেন চেয়ারম্যান নান্টুকে কারা হত্যা করেছিলো আর তিনিই বা কিভাবে জানলেন এমন প্রশ্নের উত্তর আজও সবার কাছে রয়েছে অজানা।

আসামিদের নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উজিরপুর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) হেলাল উদ্দিন বলেন, মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান। ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পেলেই চার্জশীট প্রদান করা হবে।
উজিরপুর উপজেলার একাধিক জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা বলেন, পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সঠিকভাবে তদন্ত করলেই নান্টু হত্যার প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। আর যারা অতি উৎসাহী হয়ে তাৎক্ষনিক অন্যকে দোষারোপ করে মিডিয়ায় বক্তব্য প্রদান, পুলিশ হেফাজতে আসামিকে নাম মুখস্ত করানোর দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের কি স্বার্থ রয়েছে তা বের করা সম্ভব হবে।

আওয়ামী লীগ নেতারা আরও বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবালের বিরুদ্ধে সংগঠন বিরোধী কার্যকলাপ, দুর্নীতি, খুন, অস্ত্র ও ইয়াবা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, ডাকাতিসহ নানা অপর্কমের অভিযোগ এনে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ফলশ্রুতিতে আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা মনোনয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্তক্রমে কেন্দ্রের কাছে পাঠানো তালিকা থেকে বাদ পরেছেন বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবাল। ফলে এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে নয়টার দিকে অজ্ঞাতনামা দুইজন দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলযোগে এসে উপজেলার জল্লা ইউনিয়নের কারফা বাজারের নিজ কাপড়ের দোকানে বসে থাকা ইউপি চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুকে গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় পরেরদিন ২২ সেপ্টেম্বর রাতে নিহত ইউপি চেয়ারম্যানের বাবা শুখলাল হালদার বাদি হয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ৩২ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে আরও আটজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে উজিরপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারভুক্ত ২০ আসামি বর্তমানে বরিশাল জেল হাজতে রয়েছেন। এছাড়া এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাতে মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম নামের এক যুবক পুলিশের কথিত বন্ধুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। ওইসময় পুলিশের দাবি ছিলো নিহত যুবক ইউপি চেয়ারম্যান নান্টুকে গুলি করে হত্যাকারী।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত